বেদান্ত দর্শনে মায়াবাদ 🔥 | শঙ্করাচার্যের অজ্ঞান তত্ত্ব বিস্তারিত আলোচনা | 8 টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় | Exam Special Notes
বেদান্ত দর্শনে মায়াবাদ
ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে বেদান্ত দর্শন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীর তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয়। বেদান্ত দর্শনের বিভিন্ন শাখার মধ্যে শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত বেদান্ত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অদ্বৈত বেদান্তের মূল ভিত্তি হল ব্রহ্মতত্ত্ব, জীবতত্ত্ব, জগতের স্বরূপ এবং মায়াতত্ত্ব। এর মধ্যে মায়াবাদ হল শঙ্করাচার্যের দর্শনের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ।
বেদান্ত দর্শনে মায়াবাদ বিষয়টি XI শ্রেণির দর্শন, B.A. Philosophy (Major/Minor), বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন পাঠ্যক্রম, NET, SET, PSC, School Service, College Service এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরীক্ষায় প্রায়ই শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ, অজ্ঞান তত্ত্ব, ব্রহ্ম ও জগতের সম্পর্ক, মায়ার স্বরূপ এবং মায়ার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রশ্ন আসে।
শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত বেদান্তের মূল বক্তব্য হল— “ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা, জীব ও ব্রহ্ম অভিন্ন।” তাঁর মতে, একমাত্র ব্রহ্মই হল পারমার্থিক সত্য। কিন্তু মানুষ অজ্ঞান বা অবিদ্যার কারণে ব্রহ্মের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে না এবং জগতকে ব্রহ্ম থেকে পৃথক বলে মনে করে। এই অজ্ঞান বা অবিদ্যার শক্তিকেই শঙ্করাচার্য মায়া নামে অভিহিত করেছেন।
শঙ্করাচার্যের মতে, মায়া কোনো সম্পূর্ণ সত্য নয় এবং সম্পূর্ণ মিথ্যাও নয়। মায়া হল অনির্বচনীয় অর্থাৎ যাকে সত্য বা মিথ্যা কোনো একটি দ্বারা সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। মায়ার কারণেই এক অদ্বিতীয় ব্রহ্মের মধ্যে বহুত্বের প্রকাশ দেখা যায় এবং জীব, জগৎ ও ঈশ্বরের ভিন্নতা অনুভূত হয়।
এই আলোচনায় বেদান্ত দর্শনের মায়াবাদ বা অজ্ঞান তত্ত্ব বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এখানে মায়ার সংজ্ঞা, মায়ার প্রকৃতি, মায়ার কারণ, মায়ার বৈশিষ্ট্য, অবিদ্যা ও জ্ঞানের সম্পর্ক এবং শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত দর্শনে মায়ার গুরুত্ব সহজ ভাষায় আলোচনা করা হয়েছে।
শঙ্করাচার্যের মতে, মায়া হল ব্রহ্মের আশ্রিত এক বিশেষ শক্তি, যার মাধ্যমে নাম ও রূপের জগতের প্রকাশ ঘটে। যেমন অন্ধকারে দড়িকে সাপ বলে ভুল মনে হয়, তেমনি অজ্ঞানের কারণে মানুষ ব্রহ্মকে না জেনে জগতের পৃথক অস্তিত্ব অনুভব করে। জ্ঞান লাভের মাধ্যমে এই ভ্রম দূর হলে ব্রহ্মের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি হয়।
মায়াবাদের মাধ্যমে শঙ্করাচার্য ব্যাখ্যা করেছেন যে, জগৎ সম্পূর্ণ অসত্য নয়; বরং এটি ব্যবহারিক স্তরে সত্য। কিন্তু পারমার্থিক দৃষ্টিতে একমাত্র ব্রহ্মই সত্য। তাই জগতের সত্যতা ব্রহ্মের ওপর নির্ভরশীল এবং মায়ার কারণে জগতের বহুত্ব প্রকাশিত হয়।
এই আলোচনায় আরও দেখানো হয়েছে যে, শঙ্করাচার্যের মতে অজ্ঞান বা অবিদ্যা হল মানুষের বন্ধনের মূল কারণ। অবিদ্যার কারণে জীব নিজেকে শরীর, মন ও ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে যুক্ত মনে করে। কিন্তু ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করলে এই অবিদ্যার নাশ হয় এবং জীব নিজের প্রকৃত ব্রহ্মস্বরূপ উপলব্ধি করে মোক্ষ লাভ করে।
বেদান্ত দর্শনে মায়াবাদ শুধু একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, এটি জীবনের দুঃখ, বন্ধন এবং মুক্তির ব্যাখ্যার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। শঙ্করাচার্যের মতে, মায়া অতিক্রম করার একমাত্র উপায় হল আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান। জ্ঞান লাভের মাধ্যমে জীব বুঝতে পারে যে, তার প্রকৃত স্বরূপ ব্রহ্মের সঙ্গে অভিন্ন।
অদ্বৈত বেদান্তের মায়াবাদ ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মতবাদ হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও রামানুজ, মাধ্ব প্রমুখ দার্শনিক শঙ্করের মায়াবাদের সমালোচনা করেছেন, তবুও ব্রহ্ম ও জগতের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ একটি গভীর ও প্রভাবশালী দার্শনিক মতবাদ।
এই লেখায় বেদান্ত দর্শনে মায়াবাদের সংজ্ঞা, শঙ্করাচার্যের অজ্ঞান তত্ত্ব, মায়ার বৈশিষ্ট্য, মায়া ও ব্রহ্মের সম্পর্ক, মায়া ও জগতের সম্পর্ক, অবিদ্যার ভূমিকা এবং মুক্তির ক্ষেত্রে জ্ঞানের গুরুত্ব পরীক্ষাভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা হয়েছে।
আপনি যদি **বেদান্ত দর্শনে মায়াবাদ, শঙ্করাচার্যের মায়া তত্ত্ব, অজ্ঞান বা অবিদ্যা তত্ত্ব, Advaita Vedanta Maya Theory, Indian Philosophy, Vedanta Philosophy অথবা B.A. Philosophy-এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে সহজ, নির্ভুল ও পরীক্ষাভিত্তিক নোট খুঁজে থাকেন, তাহলে এই আলোচনা আপনার জন্য অত্যন্ত উপযোগী হবে।
এই আলোচনার শেষে গুরুত্বপূর্ণ MCQ, SAQ, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর, পরীক্ষায় বারবার আসা প্রশ্ন এবং সাজেশন সংযোজিত রয়েছে, যা XI শ্রেণি, B.A. Philosophy (Major/Minor), NET, SET, PSC, School Service, College Service এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিকে আরও কার্যকর ও সফল করে তুলবে।
শঙ্করাচার্যের অজ্ঞান তত্ত্ব বিস্তারিত আলোচনা
ভারতীয় দর্শনের আলোচনায় মানুষের বন্ধন ও মুক্তির সমস্যাকে কেন্দ্র করে বেদান্ত দর্শনের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই বেদান্ত দর্শনের মধ্যে আচার্য শঙ্করের অদ্বৈত বেদান্ত একটি সুসংবদ্ধ ও গভীর দার্শনিক মতবাদ। শঙ্করাচার্যের মতে, মানুষের সমস্ত দুঃখ, সীমাবদ্ধতা এবং সংসার বন্ধনের মূল কারণ হল অজ্ঞান বা অবিদ্যা। তাই অদ্বৈত বেদান্তে অজ্ঞান তত্ত্ব একটি কেন্দ্রীয় ও অপরিহার্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
শঙ্করাচার্যের দর্শনের মূল বক্তব্য হল— ব্রহ্মই একমাত্র পরম সত্য এবং জীবের প্রকৃত স্বরূপ ব্রহ্মের সঙ্গে অভিন্ন। কিন্তু জীব এই সত্য উপলব্ধি করতে পারে না, কারণ তার মধ্যে অজ্ঞান বা অবিদ্যা বর্তমান। এই অজ্ঞানতার কারণেই মানুষ নিজের আত্মস্বরূপকে না জেনে শরীর, মন ও ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখে এবং জগতের বহুত্বকে চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করে।
শঙ্করাচার্যের অজ্ঞান তত্ত্ব বেদান্ত দর্শনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। কারণ এই তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন— কেন জীব ব্রহ্মকে ভুলে যায়, কেন জগতের বৈচিত্র্য অনুভূত হয় এবং কীভাবে জ্ঞান লাভের মাধ্যমে মানুষের মুক্তি সম্ভব হয়। এই কারণে XI শ্রেণির দর্শন, B.A. Philosophy (Major/Minor), NET, SET, PSC, School Service, College Service সহ বিভিন্ন পরীক্ষায় অজ্ঞান তত্ত্ব থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে।
শঙ্করাচার্যের মতে, অজ্ঞান হল এমন একটি শক্তি যা ব্রহ্মের প্রকৃত স্বরূপকে আচ্ছাদিত করে রাখে। ব্রহ্ম সর্বদা প্রকাশমান হলেও অজ্ঞানতার কারণে জীব সেই সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে না। যেমন সূর্য সবসময় আলো দেয়, কিন্তু মেঘের কারণে আমাদের কাছে সূর্য আচ্ছন্ন বলে মনে হয়; তেমনি অজ্ঞানতার কারণে ব্রহ্মের প্রকৃত স্বরূপ জীবের কাছে প্রকাশিত হয় না।
অজ্ঞান তত্ত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এটি জ্ঞান-বিরোধী। যেখানে ব্রহ্মজ্ঞান প্রকাশিত হয়, সেখানে অজ্ঞান দূর হয়ে যায়। শঙ্করাচার্যের মতে, অজ্ঞান কোনো স্থায়ী বাস্তব সত্তা নয়, কারণ জ্ঞান দ্বারা এর বিনাশ সম্ভব। আবার একে সম্পূর্ণ অবাস্তবও বলা যায় না, কারণ অজ্ঞান থাকাকালীন জীবের অভিজ্ঞতায় এর কার্যকারিতা দেখা যায়।
এই কারণে শঙ্করাচার্য অজ্ঞানকে অনির্বচনীয় বলেছেন। অর্থাৎ অজ্ঞানকে সম্পূর্ণ সত্য বা সম্পূর্ণ মিথ্যা— কোনো একটি বিশেষণে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি এমন একটি মধ্যবর্তী অবস্থা, যা অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও চূড়ান্ত জ্ঞানের দৃষ্টিতে এর কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই।
শঙ্করাচার্যের মতে, অজ্ঞান-এর দুটি প্রধান শক্তি রয়েছে— আবরণ শক্তি ও বিক্ষেপ শক্তি। আবরণ শক্তির কাজ হল ব্রহ্মের প্রকৃত স্বরূপকে ঢেকে রাখা। আর বিক্ষেপ শক্তির কাজ হল সেই অজ্ঞানের ওপর নাম-রূপযুক্ত জগতের প্রকাশ ঘটানো। এই দুই শক্তির কারণেই জীব ব্রহ্মকে না জেনে জগতের ভিন্নতা অনুভব করে।
অজ্ঞান ও মায়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। শঙ্করাচার্যের মতে, সমষ্টিগত স্তরে অজ্ঞানকে মায়া বলা হয় এবং ব্যক্তিগত স্তরে একে অবিদ্যা বলা হয়। মায়ার মাধ্যমে সমগ্র জগতের প্রকাশ ঘটে এবং অবিদ্যার মাধ্যমে ব্যক্তিগত জীবের ভ্রম সৃষ্টি হয়।
শঙ্করাচার্যের অজ্ঞান তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল অধ্যাস বা আরোপবাদ। তাঁর মতে, অজ্ঞানতার কারণে মানুষ এক বস্তুর ওপর অন্য বস্তুর ধর্ম আরোপ করে। যেমন— দড়ির ওপর সাপের ধর্ম আরোপ করে তাকে সাপ মনে করা হয়। একইভাবে আত্মার ওপর দেহ, মন ও ইন্দ্রিয়ের ধর্ম আরোপ করে মানুষ নিজেকে সীমাবদ্ধ জীব বলে মনে করে।

অজ্ঞান দূর করার একমাত্র উপায় হল আত্মজ্ঞান। শঙ্করাচার্যের মতে, কর্ম বা বাহ্যিক উপাসনার মাধ্যমে অজ্ঞান সম্পূর্ণ দূর করা যায় না। শুধুমাত্র ব্রহ্মের প্রকৃত জ্ঞান লাভের মাধ্যমেই অবিদ্যার বিনাশ হয়। যখন জীব উপলব্ধি করে “আমি ব্রহ্ম”, তখন তার সমস্ত বন্ধন দূর হয় এবং মোক্ষ লাভ হয়।
শঙ্করাচার্যের অজ্ঞান তত্ত্বে মুক্তির ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, মুক্তি কোনো নতুন কিছু অর্জন নয়; বরং অজ্ঞান দূর হওয়ার মাধ্যমে জীবের নিজের প্রকৃত স্বরূপের উপলব্ধি। অর্থাৎ জীব সবসময়ই ব্রহ্মস্বরূপ ছিল, কিন্তু অজ্ঞানতার কারণে তা উপলব্ধি করতে পারেনি।
তবে শঙ্করাচার্যের অজ্ঞান তত্ত্বের বিরুদ্ধে পরবর্তী অনেক দার্শনিক আপত্তি করেছেন। বিশেষ করে রামানুজ প্রশ্ন তুলেছেন যে, যদি ব্রহ্ম একমাত্র সত্য হন, তাহলে অজ্ঞান কোথায় অবস্থান করে এবং কীভাবে তা ব্রহ্মকে আচ্ছন্ন করতে পারে? কারণ ব্রহ্ম যদি শুদ্ধ জ্ঞানস্বরূপ হন, তাহলে তাঁর মধ্যে অজ্ঞান থাকার বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত নয়।
তবুও ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে শঙ্করাচার্যের অজ্ঞান তত্ত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি মানুষের অভিজ্ঞ জগৎ, আত্মপরিচয়, বন্ধন এবং মুক্তির বিষয়কে একটি সুসংবদ্ধ দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
সুতরাং বলা যায়, শঙ্করাচার্যের অজ্ঞান তত্ত্ব হল অদ্বৈত বেদান্তের অন্যতম ভিত্তি। অজ্ঞান জীবকে ব্রহ্ম থেকে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি দেয়, আর ব্রহ্মজ্ঞান সেই ভেদবুদ্ধির অবসান ঘটিয়ে জীবকে মোক্ষের পথে নিয়ে যায়।
আপনি যদি **শঙ্করাচার্যের অজ্ঞান তত্ত্ব, অবিদ্যা তত্ত্ব, মায়াবাদ, অধ্যাসবাদ, Advaita Vedanta Avidya Theory, Vedanta Philosophy, Indian Philosophy অথবা B.A. Philosophy-এর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সহজ ও পরীক্ষাভিত্তিক নোট খুঁজে থাকেন, তাহলে এই আলোচনা আপনার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী হবে।
এই আলোচনার শেষে MCQ, SAQ, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর, পরীক্ষায় বারবার আসা প্রশ্ন এবং সাজেশন সংযোজিত রয়েছে, যা XI শ্রেণি, B.A. Philosophy (Major/Minor), NET, SET, PSC, School Service, College Service এবং অন্যান্য পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে।
প্রশ্ন : মায়া বা অজ্ঞান সম্পর্কে আচার্য শংকরের মতবাদ
উত্তর : উপনিষদের বিভিন্ন গ্রন্থে জগত সম্পর্কে দুটি পরস্পর বিরোধী উক্তি লক্ষ্য করা যায়। তার মধ্যে কোনো কোনো উপনিষদে ব্রহ্মকেই একমাত্র সত্য এবং জগতকে মিথ্যা বলা হয়েছে। আবার অনেক উপনিষদ গ্রন্থে ব্রহ্মকে জগতের স্রষ্টারূপে উল্লেখ করে সৃষ্ট জগতকেও সত্য বলা হয়েছে। কিন্তু শংকরাচার্য তার অদ্বৈতবাদের জগৎ সম্পর্কিত উক্ত দুটি পরস্পরবিরোধী মতের মধ্যে সমন্বয় সাধন করার চেষ্টা করেছেন। বেদ, উপনিষদের বিভিন্ন জায়গায় জগতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ‘মায়া’ কথাটির উল্লেখ আছে। ঋকবেদে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘ইন্দ্র মায়াভিঃ পুরুরুপ ঈয়েতে’ অর্থাৎ মায়ার দ্বারা এক ইন্দ্র বহুরূপে (জগতরূপে) প্রকাশিত হন।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘ মায়াম্ তু প্রকৃতিম্ বিদ্যাৎ, মায়িনম্ তু মহেশ্বরম্’ অর্থাৎ এই প্রকৃতি হচ্ছে মায়া এবং মায়া উপহিত ব্রহ্ম বা ঈশ্বর হচ্ছেন মায়াধীশ। আচার্য শঙ্কর উপনিষদ থেকে ‘মায়া’ কথাটি গ্রহণ করে ব্রহ্ম ও জগতের সম্বন্ধ ব্যাখ্যা করেছেন।
আচার্য শংকরের মতে ব্রহ্মের সাথে জগতের সম্পর্ক নিয়ে কোনো প্রশ্ন হতে পারে না। কারণ,এক ব্রহ্ম ভিন্ন আর কোনকিছুই সত্য নয়। ব্রহ্ম যদি শুদ্ধ চৈতন্য বা আত্মা হয়, তাহলে ন্যায়গতভাবে, ব্রহ্মের সাথে অনাত্ম জগতের কোনো সম্বন্ধ বন্ধন থাকতে পারেনা। সম্বন্ধ মাত্রই দুটি ভিন্ন বিষয়কে সম্বন্ধ করে। ব্রহ্মের সাথে জগতের সম্পর্ক উল্লেখ করলে জগৎ ও ব্রহ্মকে দুটি ভিন্ন সত্তা বলতে হয়; কিন্তু অদ্বৈতমতে জগৎ ব্রহ্ম স্বতন্ত্র নয়, জগৎ ও ব্রহ্মের মধ্যে অনন্যত্ব সম্বন্ধ আছে।
জগতকে ব্রহ্মভিন্ন বললে তাদের মধ্যে আর কোনো সম্বন্ধই থাকতে পারে না। অসীম ব্রহ্মকে অসীম জগতের কারণ বলা যায় না। কারণ ও কার্য দুটি স্বতন্ত্র ঘটনা হওয়ায় কার্য যেমন কারণের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও খন্ডিত হয়, কারণও তেমনি কার্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও খন্ডিত হবে। এরূপ ক্ষেত্রে কারনরুপ ব্রহ্ম কার্যরূপ জগতে দ্বারা খন্ডিত হবে। কিন্তু অদ্বৈতমতে ব্রহ্ম বিভু বা সর্বব্যাপী। ব্রহ্মকে জগৎ স্রষ্টারূপে ক্রিয়াশীল কর্তাও বলা যাবে না, কেননা ক্রিয়া মাত্রই অভবের সূচক। কোনো না কোনো না পাওয়ার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য লাভের জন্যই কর্ম সাধিত হয়। কিন্তু ব্রহ্ম নিষ্কাম, ব্রহ্মের কোনো কামনা নেই। আবার এমনও বলা যাবে না যে, ব্রহ্ম তাঁর লীলাখেলার জন্য জগৎ রচনা করে নিজেকে প্রকাশ করেন; কারণ সসীম জগৎ অসীম ব্রহ্মের প্রকাশক হতে পারেন না। জগতকে ব্রহ্মের পরিণামও বলা যায় না, কারণ সেক্ষেত্রে প্রশ্ন দেখা দেবে – জগৎ কি সমগ্র ব্রহ্মের পরিণাম অথবা অংশের পরিণাম? জগৎ সমগ্র ব্রহ্মের পরিণাম হলে জগতের ন্যায় ব্রহ্ম ও সীমিত হয়। আবার জগৎ ব্রহ্মের আংশিক পরিণাম হলে ব্রহ্মকে সাংশ বলতে হয়। কিন্তু প্রথমত ব্রহ্মের কোনো সীমা নেই এবং দ্বিতীয়ত ব্রহ্ম অংশবিশিষ্ট নয়।
যার জন্য আচার্য শঙ্কর বলেন, জগৎ ব্রহ্মের বিবর্তক। আমরা জানি বিবর্তবাদ অনুসারে কারণ প্রকৃতই কার্যে পরিণত হয় না – কারণের বিবর্ত হলো কার্য। কারণ কার্যরূপে প্রতিভাত হয়,কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কার্যে পরিণত হয় না। আচার্য শঙ্কর ব্রহ্ম বিবর্তবাদী।
শংকরের মতে, ‘মায়া’ নামে এক ভ্রমসৃষ্টিকারী শক্তি আছে, মায়া উপহিত ব্রহ্ম অর্থাৎ ঈশ্বর মায়া উপাধি উপহিত হয়ে জগতরুপে প্রকাশিত হন। আর বদ্ধ জীব তার অজ্ঞান বা অবিদ্যাবশত এক ব্রহ্মের পরিবর্তে জগতের নানত্বকে সত্য বলে মনে করে। শঙ্কর মায়াকে ‘অবিদ্যা’ বা ‘অজ্ঞান’ ও বলেছেন। ঈশ্বরের দিক থেকে যা মায়া, জীবের দিক থেকে তাই অবিদ্যা বা অজ্ঞান। মায়া ঈশ্বরের শক্তি-স্বরূপ, যাকে ঈশ্বরের থেকে পৃথক করা যায় না, তবে, মায়াবী ঈশ্বর তাঁর মায়াজালে আবদ্ধ হন না।
জাদুকরের জাদু শক্তি ন্যায় ঈশ্বরের মায়া শক্তি কেবল অজ্ঞ ব্যক্তিকে প্রতারিত করে। ভ্রম উৎপাদনকারী জাদু শক্তির দ্বারা জাদুকর যেমন মিথ্যা বস্তু সৃষ্টি করে এবং সেই জাদুতে মুগ্ধ দর্শকবৃন্দ প্রতারিত হয়ে মিথ্যা বস্তুকে সত্য বলে মনে করে। কিন্তু মায়াধীশ ঈশ্বরের কাছে মায়ারসৃষ্ট জগৎ সত্য নয় এবং যিনি ব্রহ্মবিদ তিনিও জানেন যে জগত প্রপঞ্চ মিথ্যা – নির্গুণ নির্বিশেষ ব্রহ্মই সত্য। বদ্ধ জীবের কাছে জগৎ আছে, জগৎ স্রষ্টা ঈশ্বর আছেন। ব্রহ্ম জ্ঞানীর কাছে মায়াময় জগত নেই, মায়াবী ঈশ্বর নেই – আছে কেবল নির্গুণ অসঙ্গ ব্রহ্ম। এভাবে আচার্য শংকর মায়ার ব্যাখ্যা করে উপনিষদের দুটি পরস্পর বিরোধী উক্তির মধ্যে সঙ্গতি সাধনের চেষ্টা করেছেন। ব্রহ্মজ্ঞানীর নিকট নির্গুণ ব্রহ্ময় কেবল সত্য। বদ্ধ জীবের নিকট ব্রহ্ম সত্য এবং মায়াধীশ ঈশ্বর সৃষ্ট জগৎ ও সত্য।
সদানন্দ যোগীন্দ্র তার ‘বেদান্তসার’ নামক গ্রন্থে শঙ্করের মায়া বা অজ্ঞানের স্বরূপ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘সদসদ্ভ্যাম্ অনির্বচনীয়ম্ ত্রিগুণাত্মকম্ জ্ঞানবিরোধী ভাবরুপম্ যদকিঞ্চিদিতি’। অর্থাৎ মায়া হল সৎ অসৎ বিলক্ষণ অনির্বচনীয় ত্রিগুণবিশিষ্ট, জ্ঞান বিরোধী কিন্তু ভাবরুপ অর্থাৎ একটা কিছু নিছক শূন্য নয়। এই বৈশিষ্ট্যের প্রতিটি এখন আমরা বিস্তারিতভাবে জানবো।
১) মায়া ‘সদসদ্ভ্যাম্ অনির্বচনীয়’ : শঙ্করের মতে মায়া বা অবিদ্যা বা অজ্ঞান সৎ নয়, অসৎ নয়, সদসদ নয়, আবার সদসদ ভিন্নও নয়। মায়া সদসদ বিলক্ষণ অনির্বচ্য। যা অবাধিত কেবল তাই সত্য। ব্রহ্মের সত্তা কখনো বাধিত হয় না। তাই ব্রহ্ম সত্য। মায়াসৃষ্ট বা অজ্ঞানসৃষ্ট জগত ব্রহ্ম জ্ঞানের দ্বারা বাধিত হয়। মায়াময় জগত তাই ব্রহ্মের ন্যায় অবাধিত সত্য নয়। আবার মায়া সৃষ্ট বা অজ্ঞান সৃষ্ট জগত প্রপঞ্চবদ্ধ জীবের কাছে প্রতিভাত হয়। কাজেই জগত আকাশ কুসুমের ন্যায় অসৎ নয়। যা ব্রহ্মের ন্যায় সৎ নয়, আবার আকাশ কুসুমের ন্যায় অসৎ নয়, শংকর তাকেই ‘মিথ্যা’ বা ‘মায়া’ বলেছেন। এই অর্থের জগৎ মিথ্যা বা মায়া। মায়ার দুটি শক্তির কথা বেদান্ত দর্শনের স্বীকার করা হয়েছে। এগুলি হল- আবরণ শক্তি ও বিক্ষেপ শক্তি। আবরণ শক্তির দ্বারা মায়া সত্যের স্বরূপকে আবৃত করে এবং বিক্ষেপ শক্তির দ্বারা মায়া সত্যের স্থলে মিথ্যাকে প্রকাশিত করে। মায়ার আবরণ শক্তির দ্বারা এক ব্রহ্ম আবৃত হয়; মায়ার বিক্ষেপ শক্তির দ্বারা এক ব্রহ্মের পরিবর্তে জগত-প্রপঞ্চ প্রতিভাত হয়।
মায়া উপাধির দ্বারা উপহিত ব্রহ্মই ঈশ্বর। আর অবিদ্যা বা অজ্ঞান উপাধি দ্বারা সীমিত ব্রহ্মই হচ্ছে জীব। অর্থাৎ মায়ার সঙ্গে যুক্ত ঈশ্বর, অবিদ্যা বা অজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত জীব। ঈশ্বরের মায়া শক্তি থেকে যেমন জগতের উৎপত্তি, তেমনই আবার জীবাশ্রিত অবিদ্যা বা অজ্ঞান থেকেও জগতের উৎপত্তি। বদ্ধ জীব যেমন অবিদ্যা বা অজ্ঞানবশত রজ্জুতে সর্পের সৃষ্টি করে, তেমনি ওই অজ্ঞানবশত এক ব্রহ্মস্থলে জগত ভ্রম উৎপন্ন করে। রজ্জুর অজ্ঞানের জন্য ব্রহ্মস্থলে জগত ভ্রম হয়। মায়ার ন্যায় অবিদ্যা বা অজ্ঞানেরও দুটি শক্তি আছে- আবরণ ও বিক্ষেপ শক্তি। আবরণ শক্তির দ্বারা অধিষ্ঠান আবৃত হয়, আর বিক্ষেপ শক্তির দ্বারা অধিষ্ঠানস্থলে এক মিথ্যা বস্তু প্রতিভাত হয়। রজ্জুর অজ্ঞান প্রথমত আবরণ শক্তির দ্বারা রজ্জুকে আবৃত করে এবং দ্বিতীয়ত বিক্ষেপ শক্তির দ্বারা রজ্জুর স্থলে সর্পের বিক্ষেপ হয় অর্থাৎ সর্প প্রতিভাত হয়। তেমন এই জীবাশ্রীত অজ্ঞান প্রথমত ব্রহ্মকে আবৃত করে এবং দ্বিতীয় ব্রহ্মস্থলে জগতের বিক্ষেপ ঘটায়।
তবে অবিদ্যাকে ‘জীবাশ্রিত ‘ বলার মধ্যে কিছু দোষ এবং আচার্য শংকর সম্ভবত আক্ষরিক অর্থে অবিদ্যাকে ‘জীবাশ্রীত ‘ বলেন নি। শঙ্করের মতে, জীবই ব্রহ্ম – ‘জীবঃ ব্রহ্মৈব নাপরঃ’। জীব ব্রহ্ম যদি স্বরূপত অভিন্ন হয়, তাহলে জীবের ব্রহ্ম অতিরিক্তভাবে অস্তিত্ব স্বীকার করা যায় না, এবং সেক্ষেত্রে ‘জীবাশ্রিত অবিদ্যা’ থেকেও জগতের উৎপত্তি হতে পারে না। তাছাড়া জীবাশ্রিত অবিদ্যা থেকে জগতের উৎপত্তি হলে, প্রত্যেক জীবের জগৎ ভিন্ন ভিন্ন হবে; কিন্তু বাস্তবত সকল জীবের কাছে জগৎ একইভাবে প্রতিভাত। এজন্য জগতের উৎপত্তির কারণ স্বরূপ, জীবাশ্রিত অবিদ্যার পরিবর্তে এক সাধারণ অবিদ্যার স্বীকার করতে হয়। জীবাশ্রিত অবিদ্যা হচ্ছে তুলাবিদ্যা, আর সাধারণ অবিদ্যা হচ্ছে মূলাবিদ্যা। এই সাধারন অবিদ্যা অর্থাৎ মুলাবিদ্যাকেই শঙ্কর ঈশ্বরের ‘মায়াশক্তি’ বলেছেন। কাজেই জীবাশ্রিত অবিদ্যার পরিবর্তে ব্রহ্মাশ্রিত মায়াকেই জগতের কারনরূপে গণ্য করা অধিকতর যুক্তিযুক্ত।
২) মায়া ত্রিগুণাত্মক: সাংখ্য দার্শনিকদের ত্রিগুনা প্রকৃতি ন্যায় মায়া জড়াত্মক, সক্রিয় ও পরিণামী। উপনিষদে ও মায়াকে ‘ত্রিগুনাত্মক প্রকৃতি’ বলা হয়েছে- ‘মায়াম্ তু প্রকৃতিম্ বিদ্যাৎ’ । সাংখ্যের প্রকৃতি থেকে যেমন জগতের উৎপত্তি মায়া থেকেও তেমনি জগতের উৎপত্তি। পার্থক্য হল – সাংখ্যমতে জগৎ প্রকৃতির পরিণাম এবং পরিণামী জগতের পশ্চাতে মূল প্রকৃতির সৎ বস্তু। সাংখ্য দ্বৈতবাদী। সাংখ্য মতে জগতের মূল তত্ত্ব দুটি-পুরুষ (আত্মা) ও প্রকৃতি(জড়)। অদ্বৈতবাদী শংকরের মতে, প্রকৃতিসম মায়ার কোনো স্বতন্ত্র সত্তা নেই। ব্রহ্মই একমাত্র সদ্বস্তু এবং মায়া এক শক্তি ভিন্ন অন্য কিছু নয়।
৩)মায়া জ্ঞানবিরোধী: মায়ার প্রভাবে বদ্ধ জীব তার অজ্ঞানবশত মায়া সৃষ্ট জগতকেই সত্য মনে করে। মায়া – উপহিত ব্রহ্ম অর্থাৎ ঈশ্বর, মায়াশক্তি দ্বারা বহু বিচিত্র জগৎ রচনা করেন এবং অজ্ঞান বা অবিদ্যাবশত বদ্ধ জীব সেই জগতকে সত্য বলে মনে করে। কাজেই, বদ্ধ জীবের কাছে মায়া জ্ঞান বিরোধী। মায়া সত্যের স্বরূপ আবৃত করে মিথ্যাকে প্রকাশিত করে, ব্রহ্মের স্বরূপ আবৃত করে জগৎ-প্রপঞ্চকের প্রকাশিত করে। যতক্ষণ মায়ার প্রভাব ততক্ষণই জগতের অস্তিত্ব। ব্রহ্ম জ্ঞানে মায়া তিরোহিত হয়, অবিদ্যার নাশ হলে এবং জগত ও মরীচিকার ন্যায় বিলীন হবে। ব্রহ্মজ্ঞানীর কাছে মায়াময় জগত নেই, মায়াধীশ ঈশ্বরও নেই, আছে কেবল নির্গুণ অসঙ্গ ব্রহ্ম।
৪) মায়া ভাবরূপ : মায়া কেবল অভাবের সূচক নয়, ভাবেরও সূচক; মায়া কেবল অজ্ঞান-সূচক নয় জ্ঞানসূচকও বটে। মায়া শক্তির বা অজ্ঞানের যে দুটি দিক আছে তার একটি অভাবাত্মক হলেও অন্যটি ভাবাত্মক। মায়ার বা অজ্ঞানের দুটি দিক হলো – আবরণ ও বিক্ষেপ। প্রথমটি অভাবাত্মক, দ্বিতীয়টি ভাবাত্মক। মায়া সৎ অধিষ্ঠান ব্রহ্মকে আবৃত করে। এটা অভাবাত্মক দিক। আবার মায়া সৎ অধিষ্ঠানে (ব্রহ্মস্থলে) মিথ্যা জগতকে আরোপ(বিক্ষেপ) করে। এটা ভাবাত্মক দিক। আবরণের দিক থেকে মায়া ‘জ্ঞানাভাব’। বিক্ষেপের দিক থেকে মায়া ‘ মিথ্যাজ্ঞান’। কাজেই মায়া যুগপৎ জ্ঞানভাব ও মিথ্যাজ্ঞান। ‘ মিথ্যাজ্ঞান’ জ্ঞানের অভাব নয়। মিথ্যাজ্ঞান হল- এক বস্তুর স্থলে অন্য বস্তুর জ্ঞান- ব্রহ্মের স্থলে জগতের জ্ঞান।
৫) মায়া যদকিঞ্চিত: মায়া সদসদবিলক্ষণ অনির্বচনীয় হলেও মায়া নিছক শূন্য নয়, মায়া ‘ একটাকিছু ‘ অর্থাৎ ‘যদকিঞ্চিৎ ‘। মায়াময় জগত ব্রহ্মের বিবর্তন হলেও তা নিছক শূন্য নয় তা একটা কিছু। মায়াময় জগত প্রপঞ্চের পারমার্থিক সত্তা না থাকলেও তার ব্যবহারিক সত্তা আছে। উপনিষদে মায়াকে ‘ অঘটন-ঘটন পটিয়সী – শক্তি বলা হয়েছে। এই অঘটন-ঘটন পটিয়সী – শক্তি দ্বারা সৃষ্ট জগত মিথ্যা হলেও তা ‘ একটাকিছু ‘। ‘ মিথ্যা ‘, ‘ অলীক ‘ থেকে ভিন্ন। ‘ অলীক ‘ কোনকিছুই নয়, কিন্তু ‘ মিথ্যা ‘ একটা কিছু।
মায়ার স্বরূপ লক্ষণে ‘ ইতি ‘ অর্থে (যদকিঞ্চিদিতি) ‘ ইত্যাদি ‘ অর্থাৎ মায়ার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলি নিম্নরূপ –
৬) মায়া জ্ঞান – নিরাস্য : জ্ঞানের উদয় হলে মায়ার নিরাশ হয়, অর্থাৎ মায়ার আর কার্যকারিতা থাকে না। জ্ঞানের উদয় হলে মায়া অন্তর্হিত হয়, বিদ্যার আবির্ভাব হলে অবিদ্যার নাশ হয়। অধিষ্ঠানের জ্ঞান হলে মায়ার আর কোন কার্যকারিতা থাকে না। অধিষ্ঠান রজ্জুর জ্ঞান হলে সর্পভ্রম অন্তর্হিত হয়। ব্রহ্ম জ্ঞানে জগৎ – প্রপঞ্চ অন্তর্হিত হয়।
৭) মায়া অনাদি কিন্তু অন্তবিশিষ্ট : মায়ার উৎপত্তিকাল নির্ণয় করা যায় না। মায়া তাই অনাদি। ব্রহ্ম জ্ঞানে মায়া অন্তর্হিত হয়, অজ্ঞান বা অবিদ্যার নাশ হয়। মায়া তাই অন্তবিশিষ্ট।
৮) ব্রহ্মই মায়ার আশ্রয় ও বিষয় : মায়া শক্তি নিরালম্ব থাকতে পারে না। আবার তা অলীক বস্তুকেও আশ্রয় করে থাকতে পারে না। যা অলীক তা কোনো কিছুর আশ্রয় নয়। ব্রহ্মই একমাত্র সৎ। বোম্বাই মায়ায় কাজে এই ব্রহ্মই মায়ার আশ্রয় ও বিষয়। ব্রহ্ম মায়ার আশ্রয় হলেও মায়া শক্তির দ্বারা তিনি কিছু মাত্র প্রভাবিত হন না। জাদুকর যেমন তার মায়াজালে নিজে আবদ্ধ হন না, অমানিশার কৃষ্ণবর্ণ যেমন বর্ণহীন আকাশকে স্পর্শ করে না, তেমনই ব্রহ্মকেও মায়া স্পর্শ করতে পারে না। ব্রহ্মা মায়ার আশ্রয় ও বিষয় হলেও মায়া শক্তির দ্বারা অপরিনামী ব্রহ্মের কোনো পরিবর্তন হয়না। বদ্ধ জীবই কেবল মায়া শক্তির প্রভাবে ব্রহ্মের বিবর্ত জগতকে সত্য বলে মনে করে, জাদুকরের মায়াজালে যেমন দর্শকবৃন্দ প্রতারিত হয়ে একটু মুদ্রার স্থলে দশটি মুদ্রাকে সত্য বলে মনে করে ।।

উপসংহার : সুতরাং বলা যায়, শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে একটি গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ হলেও এর বিরুদ্ধে বহু দার্শনিক আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে মায়ার অস্তিত্ব, আশ্রয়, ব্রহ্মের সঙ্গে সম্পর্ক এবং জগতের বাস্তবতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবুও ব্রহ্ম ও জগতের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে শঙ্করের মায়াবাদ ভারতীয় দর্শনে এক অনন্য দার্শনিক অবদান হিসেবে স্বীকৃত।
উপরের আলোচনা থেকে নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ MCQ & SAQ প্রশ্ন ও উত্তরগুলি নিচে উপস্থাপন করা হলো। পরীক্ষার প্রস্তুতিকে আরও সহজ ও কার্যকর করার জন্য এগুলি বিশেষভাবে সহায়ক হবে।
MCQ প্রশ্নাবলি : বেদান্ত দর্শনে মায়াবাদ 🔥 | শঙ্করাচার্যের অজ্ঞান তত্ত্ব বিস্তারিত আলোচনা | Exam Special Notes
১) আচার্য শংকর কোন দর্শনের প্রবক্তা ছিলেন?
(ক) দ্বৈতবাদ
(খ) বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ
(গ) অদ্বৈতবাদ
(ঘ) সাংখ্যবাদ
🔵 উত্তর: (গ) অদ্বৈতবাদ
২) শংকরাচার্যের মতে একমাত্র পরম সত্য কী?
(ক) জগৎ
(খ) জীব
(গ) ব্রহ্ম
(ঘ) ঈশ্বর
🔵 উত্তর: (গ) ব্রহ্ম
৩) শংকরাচার্যের মতে জগতের প্রকৃতি কী?
(ক) সম্পূর্ণ সত্য
(খ) সম্পূর্ণ অসৎ
(গ) মায়াময়
(ঘ) নিত্য
🔵 উত্তর: (গ) মায়াময়
৪) শংকরাচার্য মায়া ধারণাটি কোথা থেকে গ্রহণ করেছিলেন?
(ক) চার্বাক দর্শন
(খ) উপনিষদ
(গ) বৌদ্ধ দর্শন
(ঘ) ন্যায় দর্শন
🔵 উত্তর: (খ) উপনিষদ
৫) ‘ইন্দ্র মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে’ উক্তিটি কোন বেদে পাওয়া যায়?
(ক) সামবেদ
(খ) যজুর্বেদ
(গ) ঋগ্বেদ
(ঘ) অথর্ববেদ
🔵 উত্তর: (গ) ঋগ্বেদ
৬) ‘মায়াম্ তু প্রকৃতিম্ বিদ্যাৎ, মায়িনম্ তু মহেশ্বরম্’ উক্তিটি কোন উপনিষদে পাওয়া যায়?
(ক) ঈশ উপনিষদ
(খ) কেন উপনিষদ
(গ) শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ
(ঘ) কঠ উপনিষদ
🔵 উত্তর: (গ) শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ
৭) শংকরাচার্যের মতে মায়ার অপর নাম কী?
(ক) ধর্ম
(খ) অবিদ্যা বা অজ্ঞান
(গ) কর্ম
(ঘ) আত্মা
🔵 উত্তর: (খ) অবিদ্যা বা অজ্ঞান
৮) শংকরাচার্যের মতে জগৎ ব্রহ্মের কী?
(ক) পরিণাম
(খ) বিবর্ত
(গ) স্বতন্ত্র সত্তা
(ঘ) নিত্য রূপ
🔵 উত্তর: (খ) বিবর্ত
৯) বিবর্তবাদ অনুযায়ী কারণের কী ঘটে?
(ক) কারণ ধ্বংস হয়
(খ) কারণ কার্যে প্রকৃত পরিণত হয়
(গ) কারণ কার্যের মতো প্রতিভাত হয়, কিন্তু পরিবর্তিত হয় না
(ঘ) কারণ ও কার্য পৃথক থাকে
🔵 উত্তর: (গ) কারণ কার্যের মতো প্রতিভাত হয়, কিন্তু পরিবর্তিত হয় না
১০) শংকরাচার্যের মতে মায়ার দুটি শক্তি কী কী?
(ক) জ্ঞান ও কর্ম
(খ) আবরণ ও বিক্ষেপ
(গ) সৃষ্টি ও পালন
(ঘ) সুখ ও দুঃখ
🔵 উত্তর: (খ) আবরণ ও বিক্ষেপ
১১) মায়ার কোন শক্তি সত্যকে আবৃত করে?
(ক) বিক্ষেপ শক্তি
(খ) আবরণ শক্তি
(গ) জ্ঞান শক্তি
(ঘ) কর্ম শক্তি
🔵 উত্তর: (খ) আবরণ শক্তি
১২) মায়ার কোন শক্তি মিথ্যাকে প্রকাশ করে?
(ক) আবরণ শক্তি
(খ) জ্ঞান শক্তি
(গ) বিক্ষেপ শক্তি
(ঘ) চৈতন্য শক্তি
🔵 উত্তর: (গ) বিক্ষেপ শক্তি
১৩) সদানন্দ যোগীন্দ্র কোন গ্রন্থে মায়ার স্বরূপ আলোচনা করেছেন?
(ক) ব্রহ্মসূত্র
(খ) বেদান্তসার
(গ) উপনিষদ
(ঘ) গীতা ভাষ্য
🔵 উত্তর: (খ) বেদান্তসার
১৪) মায়া সম্পর্কে সদানন্দ যোগীন্দ্রের মতে মায়া কেমন?
(ক) সম্পূর্ণ সত্য
(খ) সম্পূর্ণ অসৎ
(গ) সদসদ বিলক্ষণ অনির্বচনীয়
(ঘ) নিত্য বস্তু
🔵 উত্তর: (গ) সদসদ বিলক্ষণ অনির্বচনীয়
১৫) শংকরাচার্যের মতে মায়া কয়টি গুণের সমন্বিত?
(ক) দ্বিগুণাত্মক
(খ) ত্রিগুণাত্মক
(গ) পঞ্চগুণাত্মক
(ঘ) গুণহীন
🔵 উত্তর: (খ) ত্রিগুণাত্মক
১৬) শংকরাচার্যের মতে মায়া কী দ্বারা নাশ হয়?
(ক) কর্ম দ্বারা
(খ) ভক্তি দ্বারা
(গ) ব্রহ্মজ্ঞান দ্বারা
(ঘ) যজ্ঞ দ্বারা
🔵 উত্তর: (গ) ব্রহ্মজ্ঞান দ্বারা
১৭) রজ্জুতে সর্প ভ্রমের উদাহরণটি কোন ধারণা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়?
(ক) কর্মবাদ
(খ) মায়াবাদ
(গ) দ্বৈতবাদ
(ঘ) ভক্তিবাদ
🔵 উত্তর: (খ) মায়াবাদ
১৮) শংকরাচার্যের মতে মায়া কী ধরনের?
(ক) অনাদি কিন্তু অন্তবিশিষ্ট
(খ) সাদি ও অনন্ত
(গ) নিত্য ও অপরিবর্তনীয়
(ঘ) সম্পূর্ণ অসৎ
🔵 উত্তর: (ক) অনাদি কিন্তু অন্তবিশিষ্ট
১৯) শংকরাচার্যের মতে মায়ার আশ্রয় ও বিষয় কে?
(ক) জীব
(খ) জগৎ
(গ) ব্রহ্ম
(ঘ) মন
🔵 উত্তর: (গ) ব্রহ্ম
২০) ব্রহ্মজ্ঞানীর কাছে কী একমাত্র সত্য বলে স্বীকৃত?
(ক) জগত
(খ) মায়া
(গ) নির্গুণ ব্রহ্ম
(ঘ) ঈশ্বরের সৃষ্টি
🔵 উত্তর: (গ) নির্গুণ ব্রহ্ম
SAQ প্রশ্নাবলি : বেদান্ত দর্শনে মায়াবাদ 🔥 | শঙ্করাচার্যের অজ্ঞান তত্ত্ব বিস্তারিত আলোচনা | Exam Special Notes
১) আচার্য শংকরের মায়াবাদ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: আচার্য শংকরের মতে, ব্রহ্মই একমাত্র পরম সত্য। মায়ার প্রভাবে এক ব্রহ্ম বহুরূপী জগৎ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। এই জগতের পারমার্থিক সত্যতা নেই, তাই এই মতবাদকে মায়াবাদ বলা হয়।
২) উপনিষদের জগত সম্পর্কিত পরস্পরবিরোধী মত বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: কোনো কোনো উপনিষদে ব্রহ্মকে একমাত্র সত্য এবং জগতকে মিথ্যা বলা হয়েছে। আবার অন্য কিছু উপনিষদে ব্রহ্মকে জগতের স্রষ্টা এবং জগতকে সত্য বলা হয়েছে। এই দুটি মতের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেন শংকরাচার্য।
৩) শংকরাচার্যের মতে ব্রহ্ম ও জগতের সম্পর্ক কেমন?
উত্তর: শংকরাচার্যের মতে, ব্রহ্ম ও জগতের মধ্যে বিবর্ত সম্পর্ক রয়েছে। জগৎ ব্রহ্ম থেকে পৃথক কোনো সত্য সত্তা নয়; মায়ার কারণে ব্রহ্মই জগৎরূপে প্রতীয়মান হয়।
৪) শংকরাচার্যের মতে জগৎকে ব্রহ্মের পরিণাম বলা যায় না কেন?
উত্তর: জগৎকে ব্রহ্মের পরিণাম বললে ব্রহ্মের পরিবর্তন স্বীকার করতে হয়। কিন্তু ব্রহ্ম অপরিবর্তনীয়, অসীম ও অংশহীন। তাই জগৎ ব্রহ্মের প্রকৃত পরিণাম নয়।
৫) বিবর্তবাদ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: বিবর্তবাদ অনুসারে কারণ প্রকৃতপক্ষে কার্যে পরিণত হয় না, কিন্তু কোনো বিশেষ কারণে কার্যরূপে প্রতীয়মান হয়। যেমন—রজ্জুতে সর্পের ভ্রম।
৬) শংকরাচার্যের মতে মায়া ও অবিদ্যার মধ্যে সম্পর্ক কী?
উত্তর: ঈশ্বরের দিক থেকে মায়া এবং জীবের দিক থেকে অবিদ্যা বা অজ্ঞান একই শক্তির দুটি দিক। মায়া ঈশ্বরের শক্তি, আর অবিদ্যা জীবের অজ্ঞানের কারণ।
৭) মায়া ঈশ্বরের শক্তি—ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: শংকরাচার্যের মতে মায়া ঈশ্বরের একটি অদ্ভুত শক্তি যার মাধ্যমে জগতের প্রকাশ ঘটে। তবে ঈশ্বর মায়ার দ্বারা আবদ্ধ হন না, যেমন জাদুকর নিজের জাদুতে আবদ্ধ হন না।
৮) শংকরাচার্যের মতে মায়ার দুটি শক্তি কী কী?
উত্তর: শংকরাচার্যের মতে মায়ার দুটি শক্তি হল—
১) আবরণ শক্তি
২) বিক্ষেপ শক্তি।
৯) আবরণ শক্তি বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: মায়ার যে শক্তি ব্রহ্মের প্রকৃত স্বরূপকে আবৃত করে রাখে তাকে আবরণ শক্তি বলে। এর ফলে জীব ব্রহ্মকে জানতে পারে না।
১০) বিক্ষেপ শক্তি বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: মায়ার যে শক্তি ব্রহ্মের স্থলে মিথ্যা জগতের প্রকাশ ঘটায় তাকে বিক্ষেপ শক্তি বলে।
১১) মায়াকে ‘সদসদ্বিলক্ষণ অনির্বচনীয়’ বলা হয় কেন?
উত্তর: মায়া ব্রহ্মের মতো সত্য নয়, আবার আকাশকুসুমের মতো অসৎও নয়। তাই মায়াকে সৎ ও অসৎ উভয় থেকে পৃথক এবং অনির্বচনীয় বলা হয়।
১২) মায়া ত্রিগুণাত্মক বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: মায়া সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ—এই তিন গুণের সমন্বয়ে গঠিত। সাংখ্যের প্রকৃতির মতো মায়ার মধ্যেও এই তিন গুণ বিদ্যমান।
১৩) মায়াকে জ্ঞানবিরোধী বলা হয় কেন?
উত্তর: মায়া সত্য ব্রহ্মকে আচ্ছন্ন করে জীবের মধ্যে অজ্ঞানের সৃষ্টি করে। ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হলে মায়ার নাশ হয়, তাই মায়াকে জ্ঞানবিরোধী বলা হয়।
১৪) মায়া ভাবরূপ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: মায়া শুধু জ্ঞানের অভাব নয়, এটি একটি কার্যকর শক্তি। মায়া ব্রহ্মকে আবৃত করে এবং তার স্থলে জগতের প্রকাশ ঘটায়।
১৫) মায়া ‘যদকিঞ্চিৎ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: মায়া সম্পূর্ণ শূন্য বা অলীক নয়। এর একটি ব্যবহারিক অস্তিত্ব আছে, তাই একে ‘যদকিঞ্চিৎ’ বা ‘একটি কিছু’ বলা হয়।
১৬) মায়া অনাদি কিন্তু অন্তবিশিষ্ট—ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: মায়ার উৎপত্তি কখন হয়েছে তা জানা যায় না, তাই এটি অনাদি। কিন্তু ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হলে মায়ার নাশ হয়, তাই এটি অন্তবিশিষ্ট।
১৭) ব্রহ্মকে মায়ার আশ্রয় ও বিষয় বলা হয় কেন?
উত্তর: মায়া কোনো অলীক বস্তুর ওপর নির্ভর করতে পারে না। ব্রহ্মই একমাত্র সত্য সত্তা, তাই ব্রহ্মই মায়ার আশ্রয় ও বিষয়।
১৮) রজ্জু-সর্প দৃষ্টান্তের মাধ্যমে শংকর কী বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: অন্ধকারে রজ্জুকে সর্প মনে হওয়া যেমন ভ্রম, তেমনি অজ্ঞানের কারণে জীব ব্রহ্মের স্থলে জগতকে সত্য বলে মনে করে।
১৯) ব্রহ্মজ্ঞানীর কাছে মায়ার অবস্থান কেমন?
উত্তর: ব্রহ্মজ্ঞানীর কাছে মায়ার কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তিনি কেবল নির্গুণ, নির্বিশেষ ব্রহ্মকেই একমাত্র সত্য হিসেবে উপলব্ধি করেন।
২০) শংকরাচার্যের মায়াবাদের বিরুদ্ধে প্রধান আপত্তিগুলি কী কী?
উত্তর: শংকরাচার্যের মায়াবাদের বিরুদ্ধে প্রধান আপত্তি হল—
১) মায়ার আশ্রয় কী, তা স্পষ্ট নয়।
২) মায়া যদি সত্য হয় তবে অদ্বৈতবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৩) মায়া যদি অসৎ হয় তবে জগতের ব্যাখ্যা সম্ভব নয়।
তবুও ব্রহ্ম ও জগতের সম্পর্ক ব্যাখ্যায় মায়াবাদ ভারতীয় দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে।
সহযোগী কিছু পাঠ্য বই
১. ভারতীয় দর্শন-প্রদ্যোত কুমার মন্ডল – প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স , কলকাতা
২. ভারতীয় দর্শন – সমরেন্দ্র ভট্টাচার্য-বুক সিন্ডিকেট প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা
ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে বেদান্ত দর্শন একটি অত্যন্ত গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ দর্শনশাস্ত্র। বেদান্ত দর্শনের বিভিন্ন মতবাদের মধ্যে শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত বেদান্ত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অদ্বৈত বেদান্তের মূল ভিত্তিগুলির মধ্যে মায়াবাদ বা অজ্ঞান তত্ত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ও পরীক্ষাভিত্তিক বিষয়। ব্রহ্ম, জীব এবং জগতের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে শঙ্করাচার্য মায়ার ধারণাকে ব্যবহার করেছেন। তাই বেদান্ত দর্শনে মায়াবাদ, শঙ্করাচার্যের অজ্ঞান তত্ত্ব, মায়ার স্বরূপ, মায়ার শক্তি এবং জগতের সঙ্গে মায়ার সম্পর্ক সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা দর্শনের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
বিশেষ করে XI শ্রেণির দর্শন, B.A. Philosophy (Major/Minor), NET, SET, PSC, School Service, College Service এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ, অজ্ঞান তত্ত্ব, ব্রহ্ম ও জগতের সম্পর্ক, মায়ার বৈশিষ্ট্য, আবরণ ও বিক্ষেপ শক্তি থেকে নিয়মিত প্রশ্ন আসে। তাই পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণে **ISP Gurukul-এর Website (www.ispgurukul.com)**-এ “বেদান্ত দর্শনে মায়াবাদ 🔥 | শঙ্করাচার্যের অজ্ঞান তত্ত্ব বিস্তারিত আলোচনা | Exam Special Notes” বিষয়টি সহজ ভাষায়, যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা এবং পরীক্ষার উপযোগী পদ্ধতিতে আলোচনা করা হয়েছে।
আচার্য শঙ্করের অদ্বৈত বেদান্তের মূল বক্তব্য হলো— “ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা, জীব ও ব্রহ্ম অভিন্ন।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি ব্রহ্মই একমাত্র সত্য হয়, তাহলে এই বহুরূপী জগতের অস্তিত্ব কীভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে? এই সমস্যার সমাধানের জন্য শঙ্করাচার্য মায়াবাদ বা অজ্ঞান তত্ত্বের প্রবর্তন করেন।
শঙ্করাচার্যের মতে, মায়া হলো এমন এক অদ্ভুত শক্তি যার মাধ্যমে এক অদ্বিতীয় ব্রহ্ম বহুরূপী জগত হিসেবে প্রকাশিত হয়। মায়ার প্রভাবে অজ্ঞ জীব ব্রহ্মের পরিবর্তে জগতের বৈচিত্র্যকে সত্য বলে মনে করে। কিন্তু ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করলে এই ভ্রম দূর হয় এবং উপলব্ধি হয় যে নির্গুণ, নির্বিশেষ ব্রহ্মই একমাত্র পরম সত্য।
অদ্বৈত বেদান্তে মায়াকে অবিদ্যা বা অজ্ঞান নামেও অভিহিত করা হয়েছে। ঈশ্বরের দৃষ্টিতে এটি মায়া, আর জীবের দৃষ্টিতে এটি অবিদ্যা। এই অজ্ঞানই জীবকে তার প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞ রাখে এবং ব্রহ্মের স্থলে জগতের ভ্রম সৃষ্টি করে।
শঙ্করাচার্যের মতে, জগৎ ব্রহ্মের প্রকৃত পরিণাম নয়, বরং ব্রহ্মের বিবর্ত। অর্থাৎ ব্রহ্মের কোনো প্রকৃত পরিবর্তন হয় না, শুধুমাত্র মায়ার কারণে ব্রহ্ম জগতরূপে প্রতিভাত হয়। যেমন অন্ধকারে রজ্জুকে সর্প বলে ভুল হয়, তেমনই অজ্ঞানের কারণে ব্রহ্মের স্থলে জগতের ভ্রম সৃষ্টি হয়।
এই আলোচনায় মায়ার প্রকৃতি, মায়ার অনির্বচনীয়তা, মায়ার ত্রিগুণাত্মক স্বরূপ, মায়ার জ্ঞানবিরোধী বৈশিষ্ট্য, মায়ার ভাবরূপ, মায়ার আবরণ শক্তি ও বিক্ষেপ শক্তি, মায়ার আশ্রয় ও বিষয়, অজ্ঞান এবং ব্রহ্মজ্ঞানের সম্পর্ক বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
শঙ্করাচার্যের মতে মায়া সৎও নয়, অসৎও নয়। কারণ মায়া ব্রহ্মের মতো চিরস্থায়ী সত্য নয়, আবার আকাশ-কুসুমের মতো সম্পূর্ণ অসৎও নয়। তাই মায়াকে বলা হয় “সদসদবিলক্ষণ অনির্বচনীয়”। মায়ার কারণে জগতের ব্যবহারিক অস্তিত্ব থাকলেও পারমার্থিক সত্য একমাত্র ব্রহ্ম।
এছাড়াও এই লেখায় আলোচনা করা হয়েছে মায়ার দুটি প্রধান শক্তি— আবরণ শক্তি এবং বিক্ষেপ শক্তি। আবরণ শক্তির দ্বারা মায়া ব্রহ্মের প্রকৃত স্বরূপকে আচ্ছন্ন করে এবং বিক্ষেপ শক্তির দ্বারা ব্রহ্মের স্থলে জগতের প্রকাশ ঘটায়। এই দুই শক্তির মাধ্যমেই অজ্ঞান জীবের মধ্যে জগতের ভ্রম সৃষ্টি হয়।
এই আলোচনায় আরও তুলে ধরা হয়েছে যে, মায়া অনাদি হলেও অন্তবিশিষ্ট। অর্থাৎ মায়ার কোনো আরম্ভ নেই, কিন্তু ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হলে এর অবসান ঘটে। জ্ঞান উদয় হলে যেমন রজ্জু-সর্প ভ্রম দূর হয়, তেমনই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হলে মায়ার প্রভাব নষ্ট হয়।
শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ ভারতীয় দর্শনে এক অসাধারণ দার্শনিক অবদান হলেও এর বিরুদ্ধে পরবর্তী দার্শনিকরা বিভিন্ন আপত্তি উত্থাপন করেছেন। বিশেষ করে মায়ার অস্তিত্ব, আশ্রয়, জগতের বাস্তবতা এবং ব্রহ্মের সঙ্গে মায়ার সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে। তবুও ব্রহ্ম ও জগতের সম্পর্ক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে শঙ্করের মায়াবাদ ভারতীয় দর্শনের একটি অনন্য তত্ত্ব হিসেবে স্বীকৃত।
এই লেখায় বেদান্ত দর্শনে মায়াবাদ, শঙ্করাচার্যের অজ্ঞান তত্ত্ব, Advaita Vedanta Maya Theory, Shankaracharya Philosophy, Brahman and Maya Relationship, Indian Philosophy সম্পর্কে পরীক্ষার উপযোগী বিশদ আলোচনা করা হয়েছে।
যারা XI শ্রেণির দর্শন, B.A. Philosophy (Major/Minor), NET, SET, PSC, School Service, College Service এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদের জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরীক্ষায় বারবার “শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ ব্যাখ্যা কর”, “অজ্ঞান তত্ত্ব আলোচনা কর”, “মায়ার স্বরূপ ব্যাখ্যা কর”, “আবরণ ও বিক্ষেপ শক্তি কী?”—এই ধরনের প্রশ্ন আসে।
তাই উপরোক্ত লিখিত আলোচনার পাশাপাশি Video-টি মনোযোগ সহকারে দেখলে শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ, অজ্ঞান তত্ত্ব, ব্রহ্ম-জগত সম্পর্ক, মায়ার বৈশিষ্ট্য এবং অদ্বৈত বেদান্তের মূল ধারণা সম্পর্কে সহজ, স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হবে।
আশা করা যায়, এই Video শিক্ষার্থীদের দর্শন অধ্যয়নকে আরও সহজ, আকর্ষণীয় এবং পরীক্ষামুখী করে তুলবে। এই আলোচনার শেষে গুরুত্বপূর্ণ MCQ, SAQ, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর, পরীক্ষায় বারবার আসা প্রশ্ন এবং সাজেশন সংযোজিত রয়েছে, যা XI শ্রেণি, B.A. Philosophy (Major/Minor), NET, SET, PSC, School Service, College Service এবং অন্যান্য পরীক্ষার প্রস্তুতিকে আরও কার্যকর ও সফল করে তুলবে।
