যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ

যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ 🔥 | অষ্টাঙ্গ যোগের 8 টি অঙ্গ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা | Yoga Philosophy Notes

যোগ দর্শনের 8 টি অঙ্গ

যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ : ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে যোগ দর্শন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পরীক্ষাভিত্তিক দর্শন। যোগ দর্শনের মূল উদ্দেশ্য হলো চিত্তের বৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করা। মহর্ষি পতঞ্জলি রচিত যোগসূত্র-এ যোগ সাধনার যে সুসংবদ্ধ পদ্ধতি আলোচনা করা হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগের অষ্টাঙ্গ বা যোগের আটটি অঙ্গ (Ashtanga Yoga)। যোগ দর্শনের এই অষ্টাঙ্গ যোগ অধ্যায়টি দর্শনের শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচ্য বিষয়।

যোগ দর্শন এর মতে, মানুষের মনকে শুদ্ধ, নিয়ন্ত্রিত এবং একাগ্র করার জন্য আটটি ধাপে যোগ সাধনার কথা বলা হয়েছে। এই আটটি ধাপ বা অঙ্গের সমষ্টিকেই বলা হয় অষ্টাঙ্গ যোগ। এই আটটি অঙ্গ হলো— যম (Yama), নিয়ম (Niyama), আসন (Asana), প্রাণায়াম (Pranayama), প্রত্যাহার (Pratyahara), ধারণা (Dharana), ধ্যান (Dhyana) এবং সমাধি (Samadhi)। এই আটটি অঙ্গের মাধ্যমে একজন সাধক ধীরে ধীরে বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে আত্মোপলব্ধির সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পারেন।

এই বিষয়টি XI শ্রেণির দর্শন, B.A. Philosophy (Major/Minor), বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন পাঠ্যক্রম এবং NET, SET, PSC, School Service, College Service সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষায় প্রায়ই যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ যোগের সংজ্ঞা, আটটি অঙ্গের নাম, প্রতিটি অঙ্গের বৈশিষ্ট্য, গুরুত্ব এবং সমাধির ধারণা থেকে প্রশ্ন আসে। তাই যোগ দর্শনের ৮টি অঙ্গ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা একজন দর্শনের শিক্ষার্থীর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

যোগ দর্শনে অষ্টাঙ্গ যোগ বলতে বোঝায় এমন একটি সাধন পদ্ধতি, যার মাধ্যমে মানুষের নৈতিক জীবন, শারীরিক নিয়ন্ত্রণ, মানসিক একাগ্রতা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধিত হয়। পতঞ্জলি যোগ দর্শনে বলেছেন, যোগ হলো “চিত্তবৃত্তি নিরোধ” অর্থাৎ মনের বিভিন্ন পরিবর্তন বা বৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা। আর এই চিত্ত নিয়ন্ত্রণের জন্য অষ্টাঙ্গ যোগ একটি ধারাবাহিক পথ হিসেবে কাজ করে।

এই আলোচনায় যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ যোগ সম্পর্কে সহজ ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। এখানে অষ্টাঙ্গ যোগের সংজ্ঞা, উৎপত্তি, প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য এবং যোগ দর্শনে এর গুরুত্ব বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি—এই আটটি অঙ্গের পৃথক পৃথক অর্থ, সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য এবং দার্শনিক গুরুত্ব সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

এই লেখায় আরও দেখানো হয়েছে যে, যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ যোগ কীভাবে একজন মানুষের নৈতিক জীবন গঠন করে, শরীর ও মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে এবং কীভাবে ধীরে ধীরে মোক্ষ বা কৈবল্য লাভের পথ প্রস্তুত করে। বিশেষভাবে যম ও নিয়মের নৈতিক শিক্ষা, আসন ও প্রাণায়ামের শারীরিক গুরুত্ব এবং ধ্যান ও সমাধির আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

এছাড়াও এই আলোচনায় যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ যোগ এবং আধুনিক যোগ অনুশীলনের সম্পর্ক, পতঞ্জলি যোগ দর্শনে এর অবস্থান, ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে এর গুরুত্ব এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির কথা মাথায় রেখে প্রতিটি বিষয় অত্যন্ত সহজ ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে অল্প সময়ের মধ্যে যোগ দর্শনের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি সম্পূর্ণভাবে বোঝা যায়।

আপনি যদি যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ যোগ, Ashtanga Yoga, যোগের আটটি অঙ্গ, পতঞ্জলি যোগসূত্র, Yoga Philosophy, Indian Philosophy, যোগ দর্শনের নৈতিক শিক্ষা, ধ্যান ও সমাধি অথবা ভারতীয় দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে নির্ভুল, সহজ ও পরীক্ষাভিত্তিক নোট খুঁজে থাকেন, তাহলে এই লেখাটি আপনার জন্য অত্যন্ত উপযোগী হবে।

এই আলোচনার শেষে গুরুত্বপূর্ণ MCQ, SAQ, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর, পরীক্ষায় বারবার আসা প্রশ্ন এবং সাজেশন সংযোজিত রয়েছে, যা XI শ্রেণি, B.A. Philosophy (Major/Minor) এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিকে আরও কার্যকর ও সফল করে তুলবে।

অষ্টাঙ্গ যোগের বিভিন্ন অঙ্গ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা

ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ যোগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পরীক্ষাভিত্তিক আলোচ্য বিষয়। যোগ দর্শনের সাধন পদ্ধতি সঠিকভাবে বুঝতে হলে “যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি”—এই আটটি যোগাঙ্গ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। অনেক শিক্ষার্থী অষ্টাঙ্গ যোগের এই আটটি অঙ্গের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, গুরুত্ব এবং পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে বিভ্রান্ত হয়। অথচ XI শ্রেণির দর্শন, B.A. Philosophy (Major/Minor), NET, SET, PSC, School Service, College Service এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এই বিষয় থেকে নিয়মিত প্রশ্ন আসে। তাই যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ যোগ সম্পর্কে সহজ ও স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

যোগ দর্শন ভারতীয় দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আস্তিক দর্শন। মহর্ষি পতঞ্জলি যোগ দর্শনের প্রধান প্রবর্তক। তাঁর রচিত ‘যোগসূত্র’ গ্রন্থে যোগের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য, সাধন পদ্ধতি এবং মুক্তি লাভের উপায় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। যোগ দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের চিত্তকে নিয়ন্ত্রণ করে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করা। যোগ দর্শন সাংখ্য দর্শনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। সাংখ্য দর্শনের মতো যোগ দর্শনও পুরুষ ও প্রকৃতির দ্বৈত তত্ত্ব স্বীকার করে।

যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ

যোগ শাস্ত্র মতে, চিত্তবৃত্তি নিরোধই যোগ। এই যোগ সাধনা অতি দুষ্কর। অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারাই একমাত্র যোগ সম্ভব। বিবেক জ্ঞান লাভের জন্য চিত্তশুদ্ধির প্রয়োজন। এই চিত্তশুদ্ধির জন্য প্রয়োজন অষ্টাঙ্গ অনুশীলন বা যোগানুষ্ঠান। বিবেকখ্যাতি দুঃখমুক্তির ও কৈবল্য লাভের উপায় অনুসারে যে আটটি যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাদের একত্রে ‘অষ্টাঙ্গযোগ’ বা ‘অষ্টাঙ্গিক যোগ’ বলে। এই আটটি যোগাঙ্গ হল— “যমনিয়মাসন-প্রাণায়ামপ্রত্যাহারধারণাধ্যানসমাধয়োহষ্টাবঙ্গানি” [যোগসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে] অর্থাৎ ১. যম ২. নিয়ম ৩. আসন ৪. প্রাণায়াম ৫. প্রত্যাহার ৬. ধারণা ৭. ধ্যান ৮. সমাধি।

মানুষের মন সর্বদা বিভিন্ন চিন্তা, বাসনা, আবেগ ও ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণের কারণে পরিবর্তিত হতে থাকে। এই পরিবর্তনশীল মানসিক অবস্থাকেই চিত্তবৃত্তি বলা হয়। যোগ সাধনার মাধ্যমে এই চিত্তবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে মনকে স্থির ও একাগ্র করা হয়। পতঞ্জলি মনে করেন, চিত্ত যখন সমস্ত প্রকার অশান্তি ও বিক্ষেপ থেকে মুক্ত হয়, তখনই প্রকৃত জ্ঞান লাভ সম্ভব হয়। এই চিত্তশুদ্ধি ও আত্মজ্ঞান লাভের জন্যই অষ্টাঙ্গ যোগের প্রয়োজন।

অষ্টাঙ্গ যোগের আটটি অঙ্গ ধাপে ধাপে একজন সাধককে আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে নিয়ে যায়। প্রথমে যম ও নিয়মের মাধ্যমে নৈতিক চরিত্র গঠন করা হয়, এরপর আসন ও প্রাণায়ামের মাধ্যমে শরীর ও প্রাণশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। প্রত্যাহারের মাধ্যমে ইন্দ্রিয় সংযম করা হয় এবং ধারণা, ধ্যান ও সমাধির মাধ্যমে মনকে সর্বোচ্চ একাগ্রতার স্তরে উন্নীত করা হয়।

এই আটপ্রকার যোগাঙ্গ আলোচনা করা হল—

যম: মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁর ‘যোগসূত্রে’ যমের লক্ষণে বলেছেন— “অহিংসাসত্যাস্তেয়ব্রহ্মচর্য্যপরিগ্রহা যমাঃ।” অর্থাৎ অহিংসা, আস্তেয়, সত্য, ব্রহ্মচর্য এবং অপরিগ্রহ— এই পাঁচটি সাধনাকে একসঙ্গে বলা হয় যম। ‘অহিংসা’ বলতে বোঝায় কায়িক, বাচিক এবং মানসিক ক্রিয়ার দ্বারা অপরকে আঘাত না করা। ‘সত্য’ বলতে বোঝায় যথাযথ কথন ও চিন্তন এবং মিথ্যা কথন ও চিন্তন বর্জন। উদ্দেশ্য মহৎ হলেও অসত্য কথা বর্জনীয়। ‘আস্তেয়’ বলতে বোঝায় পরদ্রব্য অপহরণ। এককথায় অপরের দ্রব্য গ্রহণ না করাই হল আস্তেয়। ‘ব্রহ্মচর্য’ হল কাম-আচরণ ও কামচিন্তা থেকে বিরত থাকা। ‘অপরিগ্রহ’ হল দেহ রক্ষার বা জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত সমস্ত প্রকার ভোগ বিলাসের আকাঙ্ক্ষা বর্জন এবং অপরের দান অগ্রহণ।

যম হলো অষ্টাঙ্গ যোগের প্রথম অঙ্গ। এটি মূলত মানুষের নৈতিক ও সামাজিক জীবনের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত। যোগ দর্শনের মতে, নৈতিকভাবে শুদ্ধ জীবনযাপন না করলে চিত্ত কখনো স্থির ও একাগ্র হতে পারে না। তাই যোগ সাধনার প্রথম ধাপ হিসেবে যমকে গ্রহণ করা হয়েছে।

অহিংসার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে দয়া, প্রেম ও সহানুভূতির সৃষ্টি হয়। সত্যের মাধ্যমে মানুষের চিন্তা, কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপিত হয়। অস্তেয় মানুষকে লোভ ও অন্যায় থেকে দূরে রাখে। ব্রহ্মচর্য মানুষের ইন্দ্রিয়শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং অপরিগ্রহ মানুষের অতিরিক্ত ভোগের আকাঙ্ক্ষা দূর করে।

নিয়ম: যোগের দ্বিতীয় অঙ্গ হল নিয়ম। যোগসূত্রে বলা হয়েছে, “শৌচ-সন্তোষ-তপঃ-স্বাধ্যায়েশ্বর প্রণিধানানি নিয়মাঃ।” অর্থাৎ শৌচ, সন্তোষ, তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বরপ্রণিধানকে বলা হয় নিয়ম।

নিয়ম হলো ব্যক্তিগত জীবনকে শুদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত করার সাধনা। যম যেখানে মানুষের সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, নিয়ম সেখানে ব্যক্তিগত চরিত্র ও মানসিক অবস্থার উন্নতি ঘটায়।

নিয়ম হলো; শুদ্ধ পবিত্র আহার গ্রহণ (বাহ্য শৌচ), কুচিন্তা বর্জন ও সুচিন্তার অনুশীলন (আন্তর শৌচ) প্রভৃতি হল শৌচ। সন্তোষ হল অল্পে সন্তুষ্ট থাকা। তপঃ বা তপস্যা হল ব্রতচার অনুশীলন ও সহনশীলতার অভ্যাস। এর দ্বারা চিত্তে ধৈর্য প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধ্যায় হল মোক্ষশাস্ত্র বা ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন অর্থাৎ উপনিষদ ও ভগবদ্গীতা প্রভৃতি মোক্ষ শাস্ত্র অধ্যয়ন করতে হবে। ঈশ্বর প্রণিধান হল ঈশ্বরের নিরন্তর চিন্তা বা ধ্যান এবং ঈশ্বরের সর্ব সমর্পণ। এর দ্বারা সমাধি সিদ্ধি হয়।

নিয়মের মাধ্যমে সাধকের শরীর ও মন উভয়ই পবিত্র হয়। শৌচ মানুষের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা বৃদ্ধি করে। সন্তোষ মানসিক শান্তি প্রদান করে। তপস্যা মানুষের সহনশীলতা ও আত্মসংযম বৃদ্ধি করে। স্বাধ্যায়ের মাধ্যমে জ্ঞান বৃদ্ধি হয় এবং ঈশ্বরপ্রণিধানের মাধ্যমে সাধকের মন ঈশ্বরের প্রতি নিবদ্ধ হয়।

যোগ কী? যোগের বিভিন্ন অঙ্গগুলি ব্যাখ্যা কর। [২+১০=১২]

অথবা,অষ্টাঙ্গযোগ কী? অষ্টাঙ্গযোগ ব্যাখ্যা কর।

যোগ শাস্ত্র মতে, চিত্তবৃত্তি নিরোধই যোগ। এই যোগ সাধনা অতি দুষ্কর। অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারাই একমাত্র যোগ সম্ভব। বিবেক জ্ঞান লাভের জন্য চিত্তশুদ্ধির প্রয়োজন। এই চিত্তশুদ্ধির জন্য প্রয়োজন অষ্টাঙ্গ অনুশীলন বা যোগানুষ্ঠান। বিবেকখ্যাতি দুঃখমুক্তির ও কৈবল্য লাভের উপায় অনুসারে যে আটটি যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাদের একত্রে ‘অষ্টাঙ্গযোগ’ বা ‘অষ্টাঙ্গিক যোগ’ বলে। এই আটটি যোগাঙ্গ হল— “যমনিয়মাসন-প্রাণায়ামপ্রত্যাহারধারণাধ্যানসমাধয়োহষ্টাবঙ্গানি” [যোগসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে] অর্থাৎ ১. যম ২. নিয়ম ৩. আসন ৪. প্রাণায়াম ৫. প্রত্যাহার ৬. ধারণা ৭. ধ্যান ৮. সমাধি।

যোগ দর্শনের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের চিত্তকে নিয়ন্ত্রণ করে তার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করা। ‘যোগ’ শব্দের অর্থ হলো সংযোগ বা মিলন। তবে পতঞ্জলি যোগ দর্শনে যোগ বলতে আত্মার সঙ্গে পরম সত্যের মিলন নয়, বরং চিত্তের সমস্ত পরিবর্তন বা বৃত্তির নিরোধকে বোঝানো হয়েছে। মানুষের মন যখন বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অস্থির হয়ে ওঠে, তখন আত্মার প্রকৃত জ্ঞান আচ্ছন্ন থাকে। যোগ সাধনার মাধ্যমে এই চিত্তকে শান্ত ও নির্মল করে বিবেকজ্ঞান লাভ করা সম্ভব হয়।

মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁর যোগসূত্রে যোগকে একটি সুসংবদ্ধ সাধন পদ্ধতি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এই সাধনা ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়। প্রথমে নৈতিক জীবন গঠন, তারপর শরীর ও শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ, এরপর ইন্দ্রিয় সংযম, মনঃসংযোগ এবং শেষে সমাধির মাধ্যমে চরম জ্ঞান লাভ করা হয়। এই কারণেই অষ্টাঙ্গ যোগকে শুধু একটি ধর্মীয় সাধনা নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ জীবনপদ্ধতি বলা হয়।

এই আটপ্রকার যোগাঙ্গ আলোচনা করা হল—

যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ

অষ্টাঙ্গ যোগের আটটি অঙ্গ মানুষের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ জীবনের উন্নতির জন্য নির্ধারিত হয়েছে। এর প্রথম পাঁচটি অঙ্গকে বহিরঙ্গ সাধন এবং শেষ তিনটি অঙ্গকে অন্তরঙ্গ সাধন বলা হয়। যম ও নিয়ম মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠন করে, আসন ও প্রাণায়াম শরীর ও প্রাণশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, প্রত্যাহার ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ধারণা, ধ্যান ও সমাধি মনকে সর্বোচ্চ একাগ্রতার স্তরে নিয়ে যায়।

যম: মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁর ‘যোগসূত্রে’ যমের লক্ষণে বলেছেন— “অহিংসাসত্যাস্তেয়ব্রহ্মচর্য্যপরিগ্রহা যমাঃ।” অর্থাৎ অহিংসা, সত্য, আস্তেয়, ব্রহ্মচর্য এবং অপরিগ্রহ— এই পাঁচটি সাধনাকে একসঙ্গে বলা হয় যম। ‘অহিংসা’ বলতে বোঝায় কায়িক, বাচিক এবং মানসিক ক্রিয়ার দ্বারা অপরকে আঘাত না করা। ‘সত্য’ বলতে বোঝায় যথাযথ কথন ও চিন্তন এবং মিথ্যা কথন ও চিন্তন বর্জন। উদ্দেশ্য মহৎ হলেও অসত্য কথা বর্জনীয়। ‘আস্তেয়’ বলতে বোঝায় পরদ্রব্য অপহরণ। এককথায় অপরের দ্রব্য গ্রহণ না করাই হল আস্তেয়। ‘ব্রহ্মচর্য’ হল কাম-আচরণ ও কামচিন্তা থেকে বিরত থাকা। ‘অপরিগ্রহ’ হল দেহ রক্ষার বা জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত সমস্ত প্রকার ভোগ বিলাসের আকাঙ্ক্ষা বর্জন এবং অপরের দান অগ্রহণ।

যম হলো অষ্টাঙ্গ যোগের প্রথম ধাপ। এটি মূলত মানুষের সামাজিক ও নৈতিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। একজন যোগীর জীবনে নৈতিক শুদ্ধতা না থাকলে পরবর্তী যোগ সাধনায় অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। তাই পতঞ্জলি প্রথমেই যমের কথা বলেছেন।

অহিংসার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে দয়া, সহানুভূতি ও প্রেমের সৃষ্টি হয়। সত্যের মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের চিন্তা, কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন করতে পারে। অস্তেয় মানুষকে লোভ ও অন্যায় থেকে দূরে রাখে। ব্রহ্মচর্য ইন্দ্রিয়শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে এবং অপরিগ্রহ মানুষের অতিরিক্ত ভোগের আকাঙ্ক্ষা দূর করে।

যোগ দর্শনের দৃষ্টিতে যম শুধু সামাজিক নিয়ম নয়, এটি চিত্তশুদ্ধির প্রথম ভিত্তি। কারণ নৈতিকভাবে শুদ্ধ জীবনযাপন না করলে মন কখনো স্থির ও একাগ্র হতে পারে না।

নিয়ম: যোগের দ্বিতীয় অঙ্গ হল নিয়ম। যোগসূত্রে বলা হয়েছে, “শৌচ-সন্তোষ-তপঃ-স্বাধ্যায়েশ্বর প্রণিধানানি নিয়মাঃ।” অর্থাৎ শৌচ, সন্তোষ, তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বরপ্রণিধানকে বলা হয় নিয়ম। নির্মল সলিলে এত্যহ স্নান করা, ইত্যাদি।

নিয়ম হলো ব্যক্তিগত জীবনের শুদ্ধি ও আত্মসংযমের সাধনা। যম যেখানে সমাজের প্রতি মানুষের কর্তব্য নির্দেশ করে, নিয়ম সেখানে নিজের শরীর, মন ও আচরণকে পরিশুদ্ধ করার শিক্ষা দেয়।

নিয়ম হলো; শুদ্ধ পবিত্র আহার গ্রহণ (বাহ্য শৌচ), কুচিন্তা বর্জন ও সুচিন্তার অনুশীলন (আন্তর শৌচ) প্রভৃতি হল শৌচ। সন্তোষ হল অল্পে সন্তুষ্ট থাকা। তপঃ বা তপস্যা হল ব্রতচার অনুশীলন ও সহনশীলতার অভ্যাস। এর দ্বারা চিত্তে ধৈর্য প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধ্যায় হল মোক্ষশাস্ত্র বা ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন অর্থাৎ উপনিষদ ও ভগবদ্গীতা প্রভৃতি মোক্ষ শাস্ত্র অধ্যয়ন করতে হবে। ঈশ্বর প্রণিধান হল ঈশ্বরের নিরন্তর চিন্তা বা ধ্যান এবং ঈশ্বরের সর্ব সমর্পণ। এর দ্বারা সমাধি সিদ্ধি হয়।

নিয়মের মাধ্যমে সাধকের অভ্যন্তরীণ জীবন পরিশুদ্ধ হয়। শৌচের মাধ্যমে শরীর ও মন নির্মল হয়, সন্তোষের মাধ্যমে মানসিক শান্তি লাভ হয়, তপস্যার মাধ্যমে ইচ্ছাশক্তি বৃদ্ধি পায়, স্বাধ্যায়ের মাধ্যমে জ্ঞান বৃদ্ধি হয় এবং ঈশ্বরপ্রণিধানের মাধ্যমে আত্মসমর্পণের ভাব সৃষ্টি হয়।

যোগ দর্শনে মনে করা হয়, বাহ্যিক শুদ্ধতার পাশাপাশি অন্তরের শুদ্ধতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চিত্ত যত বেশি নির্মল হবে, তত সহজে ধ্যান ও সমাধির পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে।

আসন : যোগসূত্রে বলা হয়েছে, “স্থিরসুখম আসনম্”। সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে স্থির রেখে সুখে ও সহজভাবে বসার নাম হল ‘আসন’। আসন তৃতীয় যোগাঙ্গ। যোগ সাধনার জন্য আসন অত্যাবশ্যক। উপযুক্ত গুরুর নির্দেশানুসারে আসনকে অনুশীলন করতে হয়। আসনের দ্বারা সুস্থ ও নিরোগ দেহ লাভ করা যায়। যোগ আসন বিভিন্ন প্রকারের, যেমন— পদ্মাসন, মৎস্যাসন, ভদ্রাসন, বজ্রাসন, ধনুরাসন ইত্যাদি।

আসন হলো অষ্টাঙ্গ যোগের তৃতীয় অঙ্গ। যোগ দর্শনে আসনের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র শরীরচর্চা নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে ধ্যান করার উপযোগী শরীর তৈরি করা। মানুষের শরীর যদি অস্থির থাকে, তাহলে মনও স্থির হতে পারে না। তাই যোগসাধনার প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে আসনের গুরুত্ব অপরিসীম।

আসনের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুস্থ ও সক্রিয় থাকে। শরীরের জড়তা দূর হয়, স্নায়ুতন্ত্র নিয়ন্ত্রিত হয় এবং মন শান্ত হয়। একজন যোগ সাধকের জন্য এমন আসন প্রয়োজন যাতে সে দীর্ঘ সময় কোনো অসুবিধা ছাড়াই ধ্যান করতে পারে।

যোগ দর্শনে বিভিন্ন প্রকার আসনের উল্লেখ পাওয়া যায়। পদ্মাসন, বজ্রাসন, মৎস্যাসন, ভদ্রাসন, ধনুরাসন প্রভৃতি আসন শরীরকে স্থির ও সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। তবে পতঞ্জলি যোগ দর্শনে আসনের বাহ্যিক বৈচিত্র্যের চেয়ে শরীরের স্থিরতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রাণায়াম : যোগসূত্রে বলা হয়েছে, “তস্মিন সতি শ্বাস-প্রশ্বাসয়োর্গতিবিচ্ছেদঃ প্রাণায়ামঃ” অর্থাৎ বায়ুর শ্বাসরূপ অভ্যন্তরীণ গতি ও প্রশ্বাসরূপ বহির্গতির বিচ্ছেদই প্রাণায়াম। এককথায় শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের ক্রিয়াই হল প্রাণায়াম। এই প্রাণায়াম ত্রিবিধ যথা— পূরক, রেচক ও কুম্ভক।

প্রাণায়াম হলো অষ্টাঙ্গ যোগের চতুর্থ অঙ্গ। ‘প্রাণ’ বলতে জীবনীশক্তি এবং ‘আয়াম’ বলতে নিয়ন্ত্রণ বা বিস্তার বোঝায়। অর্থাৎ প্রাণশক্তির নিয়ন্ত্রণের বিশেষ পদ্ধতিই হলো প্রাণায়াম।

মানুষের মন ও শ্বাসের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মন যখন অশান্ত হয়, তখন শ্বাসের গতি দ্রুত হয়। আবার শ্বাস নিয়ন্ত্রিত হলে মনও ধীরে ধীরে শান্ত ও স্থির হয়। এই কারণে যোগ সাধনায় প্রাণায়ামের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

প্রাণায়ামের মাধ্যমে শরীরের অভ্যন্তরীণ শক্তির নিয়ন্ত্রণ হয় এবং মন ধ্যানের উপযোগী হয়ে ওঠে। প্রাণায়াম তিন প্রকার—

পূরক— বাইরের বায়ুকে নিয়ম অনুসারে ভিতরে গ্রহণ করা।

কুম্ভক— গ্রহণ করা বায়ুকে কিছু সময় ধরে রাখা।

রেচক— শরীরের অভ্যন্তরের বায়ুকে বাইরে ত্যাগ করা।

প্রাণায়ামের মাধ্যমে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রিত হয়, চিত্তের অস্থিরতা কমে এবং একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়। তবে যোগ দর্শনে প্রাণায়ামের উদ্দেশ্য কেবল শারীরিক উপকার নয়, বরং আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য মনকে প্রস্তুত করা।

প্রত্যাহার : যোগমতে প্রত্যাহার হল পঞ্চম যোগাঙ্গ। যোগসূত্রে বলা হয়েছে, “স্ববিষয়াসম্প্রয়োগে চিত্তস্য স্বরূপানুকার ইবেন্দ্রিয়াণাং প্রত্যাহারঃ”। অর্থাৎ স্ববিষয়ে বিযুক্ত হয়ে চিত্তের স্বরূপানুকার লাভকেই ইন্দ্রিয়সমূহের প্রত্যাহার বলা হয়। ইন্দ্রিয়সমূহকে বাহ্যবিষয় থেকে বিমুক্ত করে চিত্তের অনুগত করাই হল প্রত্যাহার।

প্রত্যাহার হলো অষ্টাঙ্গ যোগের পঞ্চম অঙ্গ এবং এটি বহিরঙ্গ সাধনার শেষ স্তর। মানুষের পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় সর্বদা বাহ্যিক বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়। চোখ দেখতে চায়, কান শুনতে চায়, জিহ্বা স্বাদ গ্রহণ করতে চায়, নাক গন্ধ গ্রহণ করতে চায় এবং ত্বক স্পর্শ অনুভব করতে চায়।

এই ইন্দ্রিয়গুলিকে বাহ্যিক বিষয় থেকে সরিয়ে মনের অধীন করাই হলো প্রত্যাহার। প্রত্যাহারের মাধ্যমে সাধক ইন্দ্রিয়ের দাস না হয়ে ইন্দ্রিয়কে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।

প্রত্যাহার ছাড়া ধ্যানের উচ্চ স্তরে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কারণ ইন্দ্রিয় যদি বাহ্যিক বিষয়ের দিকে আকৃষ্ট থাকে, তাহলে মন কখনো সম্পূর্ণ একাগ্র হতে পারে না।

ধারণা : যোগসূত্রে বলা হয়েছে, “দেশবন্ধশ্চিত্তস্য ধারণা”, অর্থাৎ চিত্তকে কোনো দেশে বদ্ধ বা সংস্থিত রাখাকেই বলে ধারণা। এককথায় ধ্যেয় বস্তুতে চিত্ত নিবেশ হল ধারণা। দেবমূর্তিতে চিত্ত নিবেশের ক্ষেত্রে ধ্যেয় বস্তুটি বাহ্য বিষয়। নাভিমূলে, নাসাগ্ৰে, জিহ্বাগ্ৰে, নাভিচক্রে চিত্ত নিবেশের ক্ষেত্রে ধ্যেয় বিষয়টি অভ্যন্তরীণ।

ধারণা হলো অষ্টাঙ্গ যোগের ষষ্ঠ অঙ্গ। প্রত্যাহারের মাধ্যমে ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণের পর চিত্তকে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে স্থির করাই ধারণা।

ধারণার ক্ষেত্রে মনকে বারবার একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে ফিরিয়ে আনতে হয়। সাধারণ মানুষের মন সর্বদা বিভিন্ন চিন্তার দ্বারা বিচ্ছিন্ন থাকে। ধারণার অনুশীলনের মাধ্যমে সেই বিক্ষিপ্ত মনকে একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়।

ধারণার বিষয় বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ উভয়ই হতে পারে। যেমন— ঈশ্বরের মূর্তি, কোনো মন্ত্র, নাভিচক্র, নাসাগ্র ইত্যাদি।

ধারণার মাধ্যমে চিত্তের একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়। এটি ধ্যানের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে কাজ করে।

ধ্যান : যোগসূত্রে বলা হয়েছে, “তত্র প্রত্যেকতানতা ধ্যানম্”, অর্থাৎ ধারণাতে জ্ঞানবৃত্তির একতানতাকে ধ্যান বলে। ধারণার পরিণতি হচ্ছে ধ্যান। ধ্যানে সাধকের চিন্তাপ্রবাহের মধ্যে কোনো ছেদ বা বিরতি থাকে না। ধারণার চিন্তাপ্রবাহ বিন্দু বিন্দু জলকণার মতো ছেদ সমন্বিত; ধ্যানের চিন্তা প্রবাহ তৈলধারার মতো ছেদ রহিত।

ধ্যান হলো অষ্টাঙ্গ যোগের সপ্তম অঙ্গ। ধারণার মাধ্যমে চিত্তকে একটি বিষয়ে স্থাপন করার পর যখন সেই চিন্তার প্রবাহ অবিচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে, তখন তাকে ধ্যান বলা হয়।

ধারণা ও ধ্যানের মধ্যে পার্থক্য হলো— ধারণায় মনকে একটি বিষয়ে স্থাপন করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু ধ্যানে সেই বিষয়ের উপর চিন্তার প্রবাহ স্বাভাবিক ও অবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

ধ্যানের মাধ্যমে মন সম্পূর্ণ শান্ত হয় এবং সাধক নিজের অন্তর্গত আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করার দিকে এগিয়ে যায়। যোগ দর্শনে ধ্যানকে সমাধির পূর্ববর্তী স্তর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

সমাধি : যোগসূত্রে বলা হয়েছে, “তদেবকার্থমাত্রনির্ভাসং স্বরূপশূন্যমিব সমাধিঃ”। অর্থাৎ ধ্যান যখন ধ্যেয়ের স্বভাবে আবেশে জ্ঞানাত্মক স্বরূপশূন্য হয় তখন তাকে সমাধি বলে। সমাধি হল ধ্যানের চরম উৎকর্ষ, চিত্তবৃত্তির সর্বোত্তম অবস্থা ও যোগের শেষ স্তর। এই অবস্থায় কেবল পুরুষ বা আত্মা বিরাজ করে। সমাধি অবস্থায় আধ্যাত্মিক ধ্যানকর্তা, আধার ও ধ্যানের বিষয়। এই অবস্থায় ‘আমি ধ্যান করছি’ সাধকের এমন চিন্তাও থাকে না। ও এক আত্মহারা অবস্থা। চিত্তের এই অবস্থাই হচ্ছে সমাধি। যা অষ্টাঙ্গিক যোগাঙ্গের অন্তিম ও সর্বোচ্চ স্তর।

সমাধি হলো অষ্টাঙ্গ যোগের সর্বশেষ এবং সর্বোচ্চ স্তর। এটি যোগ সাধনার চরম পরিণতি। সমাধির অবস্থায় সাধকের চিত্ত সমস্ত প্রকার বিক্ষেপ থেকে মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ শান্ত ও স্থির হয়ে যায়।

সমাধির সময় ধ্যাতা, ধ্যান ও ধ্যেয়ের মধ্যে যে পার্থক্য থাকে তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। সাধক নিজের ব্যক্তিগত অহংবোধ অতিক্রম করে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করে।

যোগ দর্শনের মতে, সমাধির মাধ্যমে বিবেকখ্যাতি লাভ হয় এবং পুরুষ ও প্রকৃতির ভেদজ্ঞান উপলব্ধি করা যায়। এই জ্ঞানের মাধ্যমে সাধক কৈবল্য বা মুক্তি লাভ করে।

অষ্টাঙ্গ যোগাঙ্গকে আবার দুটি ভাগে ভাগ করা যায় যথা— বহিরঙ্গ সাধন ও অন্তরঙ্গ সাধন। যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম ও প্রত্যাহার এই পাঁচটি যোগ বহিরঙ্গের অন্তর্গত। আর ধারণা, ধ্যান ও সমাধি হল যোগের অন্তরঙ্গ সাধনের অন্তর্গত। এই তিনটিকে একত্রে আবার সংযমও বলা হয়।

অষ্টাঙ্গ যোগের এই বিভাজনের মাধ্যমে বোঝা যায় যে যোগ সাধনা ধীরে ধীরে বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ থেকে অভ্যন্তরীণ আত্মোপলব্ধির দিকে অগ্রসর হয়।

যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম ও প্রত্যাহার হলো বহিরঙ্গ সাধন। এগুলির মাধ্যমে সাধক প্রথমে নিজের আচরণ, শরীর, শ্বাস ও ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করে।

অন্যদিকে ধারণা, ধ্যান ও সমাধি হলো অন্তরঙ্গ সাধন। এগুলির মাধ্যমে সাধক নিজের চিত্তের গভীরে প্রবেশ করে আত্মজ্ঞান লাভ করে।

এই তিনটি—ধারণা, ধ্যান ও সমাধি—একত্রে সংযম নামে পরিচিত। সংযমের মাধ্যমে সাধকের মধ্যে বিশেষ জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক শক্তির বিকাশ ঘটে।

যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ

উপসংহার হিসেবে বলা যায়, পতঞ্জলি যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ যোগ হলো মানুষের নৈতিক, শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি সম্পূর্ণ সাধন পদ্ধতি। যম ও নিয়ম মানুষের চরিত্রকে উন্নত করে, আসন ও প্রাণায়াম শরীরকে প্রস্তুত করে, প্রত্যাহার ও ধারণা মনকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ধ্যান ও সমাধির মাধ্যমে মানুষ আত্মজ্ঞান লাভ করে।

সুতরাং অষ্টাঙ্গ যোগ শুধুমাত্র একটি সাধনা পদ্ধতি নয়, এটি মানুষের দুঃখমুক্তি ও কৈবল্য লাভের একটি সুসংবদ্ধ পথ।

উপরের আলোচনা থেকে নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ MCQ & SAQ প্রশ্ন ও উত্তরগুলি নিচে উপস্থাপন করা হলো। পরীক্ষার প্রস্তুতিকে আরও সহজ ও কার্যকর করার জন্য এগুলি বিশেষভাবে সহায়ক হবে।

MCQ প্রশ্নাবলি : যোগ দর্শনের 8 টি অঙ্গ 🔥 | অষ্টাঙ্গ যোগের বিভিন্ন অঙ্গ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা | Yoga Philosophy Notes

১. যোগ দর্শনের প্রধান প্রবর্তক কে?
ক) কপিল
খ) পতঞ্জলি
গ) গৌতম
ঘ) কণাদ
উত্তর: ➤ খ) পতঞ্জলি

২. “যোগশ্চিত্তবৃত্তি নিরোধঃ”—এই উক্তিটি কোন গ্রন্থে পাওয়া যায়?
ক) সাংখ্যকারিকা
খ) ন্যায়সূত্র
গ) যোগসূত্র
ঘ) বৈশেষিকসূত্র
উত্তর: ➤ গ) যোগসূত্র

৩. যোগ দর্শনের মূল উদ্দেশ্য কী?
ক) জাগতিক সুখ লাভ
খ) চিত্তবৃত্তির নিরোধ
গ) ইন্দ্রিয় ভোগ বৃদ্ধি
ঘ) কর্ম সম্পাদন
উত্তর: ➤ খ) চিত্তবৃত্তির নিরোধ

৪. যোগ সাধনা সম্ভব হয় কোন দুটি উপায়ে?
ক) জ্ঞান ও কর্ম
খ) ভক্তি ও কর্ম
গ) অভ্যাস ও বৈরাগ্য
ঘ) তপস্যা ও দান
উত্তর: ➤ গ) অভ্যাস ও বৈরাগ্য

৫. অষ্টাঙ্গ যোগের উল্লেখ কোন গ্রন্থে পাওয়া যায়?
ক) উপনিষদ
খ) যোগসূত্র
গ) ভগবদ্গীতা
ঘ) সাংখ্যকারিকা
উত্তর: ➤ খ) যোগসূত্র

৬. অষ্টাঙ্গ যোগের মোট কয়টি অঙ্গ রয়েছে?
ক) পাঁচটি
খ) ছয়টি
গ) সাতটি
ঘ) আটটি
উত্তর: ➤ ঘ) আটটি

৭. অষ্টাঙ্গ যোগের প্রথম অঙ্গ কোনটি?
ক) নিয়ম
খ) যম
গ) আসন
ঘ) ধ্যান
উত্তর: ➤ খ) যম

৮. যমের সংখ্যা কত?
ক) তিনটি
খ) চারটি
গ) পাঁচটি
ঘ) আটটি
উত্তর: ➤ গ) পাঁচটি

৯. নিম্নের কোনটি যমের অন্তর্গত নয়?
ক) অহিংসা
খ) সত্য
গ) শৌচ
ঘ) অপরিগ্রহ
উত্তর: ➤ গ) শৌচ

১০. অহিংসা বলতে কী বোঝায়?
ক) সত্য কথা বলা
খ) অপরকে আঘাত না করা
গ) বেশি সম্পদ সংগ্রহ করা
ঘ) তপস্যা করা
উত্তর: ➤ খ) অপরকে আঘাত না করা

১১. যোগ দর্শনে অপরের দ্রব্য গ্রহণ না করাকে কী বলা হয়?
ক) ব্রহ্মচর্য
খ) অস্তেয়
গ) সন্তোষ
ঘ) তপঃ
উত্তর: ➤ খ) অস্তেয়

১২. কাম-আচরণ ও কামচিন্তা থেকে বিরত থাকাকে কী বলা হয়?
ক) ব্রহ্মচর্য
খ) অপরিগ্রহ
গ) শৌচ
ঘ) স্বাধ্যায়
উত্তর: ➤ ক) ব্রহ্মচর্য

১৩. প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করাকে কী বলা হয়?
ক) সন্তোষ
খ) অপরিগ্রহ
গ) সত্য
ঘ) অহিংসা
উত্তর: ➤ খ) অপরিগ্রহ

১৪. অষ্টাঙ্গ যোগের দ্বিতীয় অঙ্গ কোনটি?
ক) যম
খ) নিয়ম
গ) আসন
ঘ) প্রাণায়াম
উত্তর: ➤ খ) নিয়ম

১৫. নিয়মের সংখ্যা কত?
ক) পাঁচটি
খ) তিনটি
গ) সাতটি
ঘ) আটটি
উত্তর: ➤ ক) পাঁচটি

১৬. নিম্নের কোনটি নিয়মের অন্তর্গত?
ক) অহিংসা
খ) সত্য
গ) শৌচ
ঘ) অস্তেয়
উত্তর: ➤ গ) শৌচ

১৭. শৌচ বলতে কী বোঝায়?
ক) ধ্যান করা
খ) পবিত্রতা
গ) সম্পদ সংগ্রহ
ঘ) ইন্দ্রিয় ভোগ
উত্তর: ➤ খ) পবিত্রতা

১৮. অল্পে সন্তুষ্ট থাকাকে কী বলা হয়?
ক) তপঃ
খ) সন্তোষ
গ) স্বাধ্যায়
ঘ) ধ্যান
উত্তর: ➤ খ) সন্তোষ

১৯. মোক্ষশাস্ত্র বা ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়নকে কী বলা হয়?
ক) স্বাধ্যায়
খ) অপরিগ্রহ
গ) প্রাণায়াম
ঘ) প্রত্যাহার
উত্তর: ➤ ক) স্বাধ্যায়

২০. ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণকে কী বলা হয়?
ক) তপঃ
খ) ঈশ্বরপ্রণিধান
গ) ধারণা
ঘ) সমাধি
উত্তর: ➤ খ) ঈশ্বরপ্রণিধান

SAQ প্রশ্নাবলি : যোগ দর্শনের 8 টি অঙ্গ 🔥 | অষ্টাঙ্গ যোগের বিভিন্ন অঙ্গ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা | Yoga Philosophy Notes

১. যোগ দর্শনের মূল উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: যোগ দর্শনের মূল উদ্দেশ্য হলো চিত্তবৃত্তির নিরোধের মাধ্যমে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করা এবং কৈবল্য লাভ করা।

২. ‘যোগশ্চিত্তবৃত্তি নিরোধঃ’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ‘যোগশ্চিত্তবৃত্তি নিরোধঃ’ বলতে বোঝায় চিত্তের বিভিন্ন বৃত্তি বা মানসিক পরিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ ও নিরোধ করাই হলো যোগ।

৩. যোগ দর্শনের প্রবর্তক কে?
উত্তর: মহর্ষি পতঞ্জলি যোগ দর্শনের প্রধান প্রবর্তক। তিনি তাঁর ‘যোগসূত্র’ গ্রন্থে যোগ দর্শনের মূল তত্ত্ব আলোচনা করেছেন।

৪. অষ্টাঙ্গ যোগ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: যোগ সাধনার আটটি অঙ্গ বা ধাপকে একত্রে অষ্টাঙ্গ যোগ বলা হয়। এই আটটি অঙ্গ হলো—যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি।

৫. অষ্টাঙ্গ যোগের প্রথম অঙ্গ কোনটি এবং এর উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: অষ্টাঙ্গ যোগের প্রথম অঙ্গ হলো যম। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষের নৈতিক ও সামাজিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করা।

৬. যম কাকে বলে?
উত্তর: মানুষের নৈতিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ—এই পাঁচটি সাধনাকে একত্রে যম বলা হয়।

৭. যমের পাঁচটি প্রকার কী কী?
উত্তর: যমের পাঁচটি প্রকার হলো—অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ।

৮. অহিংসা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: কায়িক, বাচিক ও মানসিক কোনো প্রকার ক্রিয়ার মাধ্যমে অন্যকে আঘাত না করাকে অহিংসা বলা হয়।

৯. সত্য বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: সত্য বলতে যথাযথ চিন্তা ও কথা বলা এবং মিথ্যা চিন্তা ও কথন থেকে বিরত থাকাকে বোঝায়।

১০. অস্তেয় কী?
উত্তর: অপরের দ্রব্য অন্যায়ভাবে গ্রহণ না করাকে অস্তেয় বলা হয়।

১১. ব্রহ্মচর্য বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: কামনা-বাসনা ও ইন্দ্রিয়সুখের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করাকে ব্রহ্মচর্য বলা হয়।

১২. অপরিগ্রহ কী?
উত্তর: প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোগ-বিলাসের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ এবং অপ্রয়োজনীয় সম্পদ গ্রহণ না করাকে অপরিগ্রহ বলা হয়।

১৩. অষ্টাঙ্গ যোগের দ্বিতীয় অঙ্গ কোনটি?
উত্তর: অষ্টাঙ্গ যোগের দ্বিতীয় অঙ্গ হলো নিয়ম। এটি ব্যক্তিগত জীবনকে শুদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত করে।

১৪. নিয়ম কাকে বলে?
উত্তর: শৌচ, সন্তোষ, তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বরপ্রণিধান—এই পাঁচটি সাধনাকে একত্রে নিয়ম বলা হয়।

১৫. নিয়মের পাঁচটি প্রকার কী কী?
উত্তর: নিয়মের পাঁচটি প্রকার হলো—শৌচ, সন্তোষ, তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বরপ্রণিধান।

১৬. শৌচ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: শৌচ বলতে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতাকে বোঝায়। শরীরের পরিচ্ছন্নতা ও মনের পবিত্রতা উভয়ই শৌচের অন্তর্ভুক্ত।

১৭. সন্তোষ কী?
উত্তর: অল্পে সন্তুষ্ট থাকা এবং নিজের প্রাপ্তিতে শান্ত থাকার মানসিক অবস্থাকে সন্তোষ বলা হয়।

১৮. তপঃ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: আত্মসংযম, সহনশীলতা ও কঠোর সাধনার অভ্যাসকে তপঃ বলা হয়।

১৯. স্বাধ্যায় কী?
উত্তর: মোক্ষশাস্ত্র, ধর্মশাস্ত্র, উপনিষদ ও অন্যান্য জ্ঞানমূলক গ্রন্থ অধ্যয়ন করাকে স্বাধ্যায় বলা হয়।

২০. ঈশ্বরপ্রণিধান বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস, ধ্যান ও আত্মসমর্পণ করাকে ঈশ্বরপ্রণিধান বলা হয়। এর মাধ্যমে চিত্ত শান্ত হয় এবং সমাধি লাভের পথ সহজ হয়।

সহযোগী কিছু পাঠ্য বই

১. ভারতীয় দর্শন-প্রদ্যোত কুমার মন্ডল – প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স , কলকাতা

২. ভারতীয় দর্শন – সমরেন্দ্র ভট্টাচার্য-বুক সিন্ডিকেট প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা

যোগ দর্শনের ৮টি অঙ্গ 🔥 | অষ্টাঙ্গ যোগের বিভিন্ন অঙ্গ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা | Yoga Philosophy Notes

ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ যোগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পরীক্ষাভিত্তিক আলোচ্য বিষয়। যোগ দর্শনের সাধন পদ্ধতি ও মুক্তি লাভের উপায় সঠিকভাবে বুঝতে হলে “অষ্টাঙ্গ যোগ” সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। অনেক শিক্ষার্থী অষ্টাঙ্গ যোগের সংজ্ঞা, যোগ দর্শনে চিত্তবৃত্তি নিরোধের ধারণা, যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি—এই আটটি যোগাঙ্গের প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য এবং যোগ সাধনায় এর গুরুত্ব বুঝতে গিয়ে বিভিন্ন জটিলতা ও বিভ্রান্তির সম্মুখীন হয়। সেই কারণে **ISP Gurukul-এর Website (www.ispgurukul.com)**-এ “যোগ দর্শনের ৮টি অঙ্গ 🔥 | অষ্টাঙ্গ যোগের বিভিন্ন অঙ্গ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা | Yoga Philosophy Notes” বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত, সুসংগঠিত এবং পরীক্ষাভিত্তিক আলোচনা উপস্থাপন করা হয়েছে।

এখানে যোগ দর্শনের মূল ধারণা, মহর্ষি পতঞ্জলির যোগসূত্র, যোগের সংজ্ঞা, চিত্তবৃত্তি নিরোধের অর্থ, অভ্যাস ও বৈরাগ্যের গুরুত্ব, অষ্টাঙ্গ যোগের উৎপত্তি এবং আটটি যোগাঙ্গ—যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধির অর্থ ও ব্যাখ্যা সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও প্রতিটি যোগাঙ্গের সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ এবং যোগ সাধনার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

তবে শুধুমাত্র লিখিত আলোচনা পড়ে অনেক সময় যোগ দর্শনের এই গভীর আধ্যাত্মিক সাধন পদ্ধতির সম্পূর্ণ ধারণা লাভ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষত যারা সহজ, সাবলীল এবং উদাহরণভিত্তিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে অষ্টাঙ্গ যোগ বিষয়টি আয়ত্ত করতে চায়, তাদের জন্য দৃশ্য ও শ্রবণনির্ভর শিক্ষণ পদ্ধতি অধিক কার্যকর। এই বিষয়টি মাথায় রেখে “যোগ দর্শনের ৮টি অঙ্গ 🔥 | অষ্টাঙ্গ যোগের বিভিন্ন অঙ্গ সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা | Yoga Philosophy Notes” শীর্ষক একটি বিস্তারিত YouTube Video প্রস্তুত করা হয়েছে।

ভিডিওটিতে যোগ দর্শনে যোগের প্রকৃতি, চিত্তবৃত্তি নিরোধের ধারণা, যোগ সাধনায় অভ্যাস ও বৈরাগ্যের প্রয়োজনীয়তা, অষ্টাঙ্গ যোগের অর্থ এবং আটটি যোগাঙ্গের গুরুত্ব অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় আলোচনা করা হয়েছে। ভিডিওতে বিশেষভাবে যমের পাঁচটি প্রকার—অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ; নিয়মের পাঁচটি প্রকার—শৌচ, সন্তোষ, তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বরপ্রণিধান; এবং আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধির বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে।

যারা বিদ্যালয়, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে দর্শন বিষয় অধ্যয়ন করছে কিংবা XI শ্রেণি, B.A. Philosophy (Major/Minor), NET, SET, PSC, School Service, College Service এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাদের জন্য এই Video বিশেষভাবে সহায়ক হবে। কারণ এখানে শুধু অষ্টাঙ্গ যোগের সংজ্ঞা বা তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং প্রতিটি যোগাঙ্গের দার্শনিক তাৎপর্য, যোগ সাধনার ক্রমবিকাশ এবং পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলিও সহজভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

যোগ দর্শনের মতে, মানুষের জীবনের দুঃখ দূর করার জন্য এবং বিবেক জ্ঞান লাভের জন্য চিত্তশুদ্ধি অপরিহার্য। অষ্টাঙ্গ যোগ সেই চিত্তশুদ্ধির একটি সুসংবদ্ধ পদ্ধতি। যম ও নিয়মের মাধ্যমে নৈতিক জীবন গঠন, আসন ও প্রাণায়ামের মাধ্যমে শরীর ও প্রাণশক্তির নিয়ন্ত্রণ, প্রত্যাহারের মাধ্যমে ইন্দ্রিয় সংযম এবং ধারণা, ধ্যান ও সমাধির মাধ্যমে আত্ম উপলব্ধির পথে অগ্রসর হওয়া যায়। তাই যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ যোগ শুধু একটি সাধন পদ্ধতি নয়, বরং মানুষের শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি পূর্ণাঙ্গ পথ।

তাই উপরিউক্ত লিখিত আলোচনার পাশাপাশি নিচে দেওয়া Video-টি মনোযোগ সহকারে দেখলে যোগ দর্শনের অষ্টাঙ্গ যোগ, যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান, সমাধি, চিত্তবৃত্তি নিরোধ এবং কৈবল্য লাভের উপায় সম্পর্কে যথার্থ, নির্ভুল ও পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হবে। আশা করা যায়, এই Video আপনাদের অধ্যয়নকে আরও সহজ, আকর্ষণীয় এবং ফলপ্রসূ করে তুলবে।

সহযোগী Video

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *