মোক্ষ বা মুক্তি

চার্বাক মতে মোক্ষ বা মুক্তি কী? | চার্বাক দর্শনে মোক্ষ | Indian Philosophy 2026

মোক্ষ বা মুক্তি কী ?

ভারতীয় দর্শনে মোক্ষ বা মুক্তি কী? | সম্পূর্ণ আলোচনাভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে মোক্ষ বা মুক্তি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, মৌলিক এবং পরীক্ষোপযোগী বিষয়। ভারতীয় দর্শনের অধিকাংশ সম্প্রদায়ের দর্শনচিন্তার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মানুষের দুঃখ, বন্ধন, অজ্ঞানতা এবং জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি লাভ। তাই ভারতীয় দর্শনের অধিবিদ্যা, আত্মতত্ত্ব, জ্ঞানতত্ত্ব ও নীতিতত্ত্ব সঠিকভাবে বুঝতে হলে মোক্ষ বা মুক্তির ধারণা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। XI শ্রেণি, B.A. 1st Semester, B.A. Philosophy এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ভারতীয় দর্শনে মোক্ষ বা মুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

এই আলোচনায় ভারতীয় দর্শনে মোক্ষ বা মুক্তি সম্পর্কে সহজ ও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এখানে মোক্ষ বা মুক্তির অর্থ কী, মোক্ষের ধারণার মূল বৈশিষ্ট্য কী, মানুষ কেন বন্ধন ও দুঃখের মধ্যে আবদ্ধ হয়, জন্ম-মৃত্যুর চক্রের সঙ্গে মোক্ষের সম্পর্ক কী এবং ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন সম্প্রদায় মোক্ষকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেছে—এসব বিষয় ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি ভারতীয় দর্শনে মোক্ষকে কেন মানবজীবনের পরম পুরুষার্থ বা চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই বিষয়টিও সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।

ভারতীয় দর্শনে মোক্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংসারবন্ধন থেকে মুক্তি। ভারতীয় দার্শনিকদের একটি বড় অংশের মতে, মানুষ কর্ম, অজ্ঞানতা, আসক্তি এবং বাসনার কারণে সংসারচক্রে আবদ্ধ থাকে। জন্ম, মৃত্যু, পুনর্জন্ম এবং দুঃখের এই ধারাবাহিকতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তিই মোক্ষ। তবে বিভিন্ন দর্শন সম্প্রদায় মোক্ষের কারণ ও প্রকৃতি সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছে। কোথাও জ্ঞানকে মুক্তির প্রধান উপায় বলা হয়েছে, কোথাও ঈশ্বরের কৃপা ও ভক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও যোগসাধনা, বৈরাগ্য ও কর্মের মাধ্যমে মুক্তির পথ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ভারতীয় দর্শনে মোক্ষ ও দুঃখের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসারজীবনে মানুষ বিভিন্ন ধরনের দুঃখ, সীমাবদ্ধতা, আসক্তি ও অশান্তির সম্মুখীন হয়। এই দুঃখ থেকে সম্পূর্ণ ও চিরস্থায়ী মুক্তিই মোক্ষের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। তাই মোক্ষকে কেবল কোনো সাময়িক সুখের অবস্থা হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি এমন এক চূড়ান্ত অবস্থা, যেখানে সংসারজনিত বন্ধন ও দুঃখের অবসান ঘটে।

এই আলোচনায় জ্ঞান ও মোক্ষের সম্পর্ক সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষত উপনিষদীয় চিন্তা এবং বেদান্ত দর্শনে আত্মা ও পরম সত্যের প্রকৃত জ্ঞানকে মুক্তির প্রধান কারণ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অজ্ঞানতার কারণে মানুষ নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করে এবং সংসারবন্ধনে আবদ্ধ হয়। সেই অজ্ঞানতা দূর হয়ে সত্যজ্ঞান লাভ হলে মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয়—ভারতীয় দর্শনের বহু ধারায় এই ধারণাটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

আপনি যদি ভারতীয় দর্শনে মোক্ষ, মোক্ষ বা মুক্তি কী, মোক্ষের সংজ্ঞা, ভারতীয় দর্শনে মুক্তির ধারণা, মোক্ষের স্বরূপ, মোক্ষের লক্ষণ, মোক্ষ ও সংসার, মোক্ষ ও দুঃখ, মোক্ষ লাভের উপায়, ভারতীয় দর্শনে পরম পুরুষার্থ অথবা বিভিন্ন দর্শন সম্প্রদায়ের মোক্ষতত্ত্ব সম্পর্কে সহজ, নির্ভুল ও পরীক্ষাভিত্তিক নোট খুঁজে থাকেন, তাহলে এই আলোচনা আপনার জন্য অত্যন্ত উপযোগী হবে। বিশেষ করে পরীক্ষায় ভারতীয় দর্শনে মোক্ষ বা মুক্তি সম্পর্কে মান-১০, SAQ এবং MCQ প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও এই আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ।

আলোচনায় আরও দেখানো হয়েছে, ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন সম্প্রদায় মোক্ষের স্বরূপ ও মুক্তির উপায় সম্পর্কে কীভাবে পৃথক মত পোষণ করেছে। সাংখ্য দর্শনে পুরুষ ও প্রকৃতির পার্থক্যজ্ঞানকে মুক্তির কারণ বলা হয়েছে, যোগ দর্শনে চিত্তবৃত্তির নিরোধ ও বিবেকখ্যাতির মাধ্যমে কৈবল্য লাভের কথা বলা হয়েছে, ন্যায়-বৈশেষিক দর্শনে তত্ত্বজ্ঞান ও দোষ-কর্মের নিবৃত্তির মাধ্যমে অপবর্গের কথা বলা হয়েছে এবং বেদান্তে ব্রহ্মজ্ঞানকে মোক্ষের প্রধান উপায় হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে মোক্ষের ধারণা ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন সম্প্রদায়কে বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতীয় দর্শনে মোক্ষ তাই শুধু একটি ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক ধারণা নয়; এটি মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য, দুঃখ ও বন্ধন থেকে মুক্তির আদর্শ এবং বিভিন্ন দার্শনিক মতবাদের একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। আত্মা, কর্ম, পুনর্জন্ম, সংসার, জ্ঞান, ঈশ্বর এবং পরম সত্য—এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ধারণার সঙ্গে মোক্ষের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই কারণে ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে মোক্ষতত্ত্ব একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক আলোচ্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু “মোক্ষ মানে মুক্তি”—এই সংজ্ঞা মুখস্থ না করে মোক্ষের প্রকৃত অর্থ, মোক্ষের সঙ্গে দুঃখ ও সংসারবন্ধনের সম্পর্ক, মোক্ষ লাভের উপায় এবং ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন সম্প্রদায়ে মোক্ষের ধারণার পার্থক্য সহজে বুঝতে পারে। XI শ্রেণি, B.A. Philosophy, B.A. 1st Semester এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এটি বিশেষভাবে সহায়ক হবে। আলোচনা শেষে গুরুত্বপূর্ণ MCQ, SAQ এবং পরীক্ষায় আসার সম্ভাবনাময় বড় প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে ভারতীয় দর্শনে মোক্ষ বা মুক্তি বিষয়টির প্রস্তুতি আরও সহজ করা যাবে। (www.ispgurukul.com)

চার্বাক মতে মোক্ষ বা মুক্তি কী?

চার্বাক মতে মোক্ষ বা মুক্তি কী? | সহজ ভাষায় সম্পূর্ণ আলোচনা – ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে চার্বাক দর্শনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পরীক্ষাভিত্তিক আলোচ্য বিষয়। চার্বাক দর্শনের অধিবিদ্যা, জড়বাদ এবং দেহাত্মবাদ সঠিকভাবে বুঝতে হলে তাঁদের মোক্ষ বা মুক্তি সম্পর্কে মতবাদ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। ভারতীয় দর্শনের অন্যান্য অনেক সম্প্রদায় যেখানে মোক্ষ বা মুক্তিকে মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে, সেখানে চার্বাক দর্শন মোক্ষের প্রচলিত ধারণাকে স্বীকার করে না। এই কারণেই চার্বাক মতে মোক্ষ বা মুক্তি কী—এই বিষয়টি ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও পরীক্ষোপযোগী আলোচ্য বিষয়।

চার্বাকদের মতে, মোক্ষ নামে কোনো অতীন্দ্রিয় বা পারলৌকিক মুক্তির অস্তিত্ব নেই। প্রচলিত ভারতীয় দর্শনে মোক্ষ বলতে জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি, দুঃখের সম্পূর্ণ অবসান অথবা আত্মার পরম অবস্থাকে বোঝানো হয়। কিন্তু চার্বাকরা আত্মার নিত্য অস্তিত্ব, পুনর্জন্ম ও পরলোক স্বীকার করেন না। তাই জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে আত্মার মুক্তি লাভের প্রশ্নও তাঁদের দর্শনে ওঠে না। তাঁদের মতে, যে আত্মাই স্বতন্ত্র ও নিত্য সত্তা হিসেবে অস্তিত্বশীল নয়, তার মুক্তির ধারণাও অর্থহীন।

চার্বাক দর্শনের জড়বাদ মোক্ষ সম্পর্কে তাঁদের মত বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চার্বাকদের মতে, ক্ষিতি, অপ, তেজ ও মরুৎ—এই চারটি জড় উপাদানের বিশেষ সংযোগের মাধ্যমে জীবদেহ ও চেতনার উৎপত্তি হয়। চেতনা কোনো স্বাধীন আত্মার ধর্ম নয়। ফলে দেহের বিনাশের সঙ্গে চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তির অস্তিত্বেরও অবসান ঘটে। মৃত্যুর পরে আত্মা কোনো বিশেষ মুক্তির অবস্থায় পৌঁছায়—এই ধারণাকে চার্বাকরা গ্রহণ করেন না।

মোক্ষ বা মুক্তি

চার্বাকদের দেহাত্মবাদ-এর সঙ্গেও মোক্ষ-অস্বীকারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। চার্বাকদের মতে, দেহের অতিরিক্ত কোনো স্বাধীন, নিত্য ও অবিনশ্বর আত্মার অস্তিত্ব নেই। যখন দেহ জীবিত থাকে, তখনই চেতনা ও ব্যক্তিসত্তার প্রকাশ ঘটে। দেহের বিনাশের সঙ্গে ব্যক্তির অস্তিত্বেরও অবসান ঘটে। তাই দেহের মৃত্যুর পরে আত্মার মুক্তি বা মোক্ষলাভের কোনো প্রশ্ন থাকে না।

চার্বাকরা জন্মান্তর ও পরলোক স্বীকার করেন না। অন্যান্য ভারতীয় দর্শনে জন্মান্তরকে মানুষের কর্মফল ও সংসারবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত করা হয় এবং মোক্ষকে সেই জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু চার্বাকদের মতে পুনর্জন্মের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই এবং নিত্য আত্মার অস্তিত্বও নেই। তাই জন্মান্তর না থাকলে জন্মান্তর থেকে মুক্তির ধারণাও তাঁদের কাছে অর্থহীন।

চার্বাক মতে মোক্ষের পরিবর্তে ইহজাগতিক সুখ বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। চার্বাকরা মানুষের জীবনের প্রত্যক্ষ ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের মতে, ভবিষ্যৎ জীবনের কোনো অপ্রমাণিত সুখ বা মোক্ষের আশায় বর্তমান জীবনের বাস্তব সুখকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। মানুষের উচিত বর্তমান জীবনের প্রত্যক্ষ সুখ ও কল্যাণের দিকে গুরুত্ব দেওয়া। তবে এর অর্থ এই নয় যে চার্বাকরা সব ধরনের সুখের নির্বিচার ভোগকে সমর্থন করেছেন; বরং তাঁদের দর্শনে ইহজীবনের প্রত্যক্ষ বাস্তবতাই মুখ্য।

চার্বাকদের প্রত্যক্ষবাদ মোক্ষ অস্বীকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। চার্বাকদের মতে প্রত্যক্ষই নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। কিন্তু মোক্ষ যদি এমন কোনো অতীন্দ্রিয় অবস্থা হয় যা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করা যায় না, তাহলে তার অস্তিত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এই প্রশ্ন চার্বাকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাবে তাঁরা পারলৌকিক মোক্ষকে বাস্তব সত্য হিসেবে গ্রহণ করেন না।

চার্বাকরা কর্মবাদ ও কর্মফল-এর ধারণাকেও গ্রহণ করেন না। প্রচলিত ভারতীয় দর্শনে কর্মের ফল হিসেবে মানুষ বারবার জন্মগ্রহণ করে এবং সেই জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তিই মোক্ষ। কিন্তু চার্বাকদের মতে অদৃশ্য কর্মফল বা অদৃষ্টের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। ফলে কর্মফলভিত্তিক পুনর্জন্ম এবং সেই পুনর্জন্ম থেকে মুক্তির ধারণাও তাঁদের দর্শনে গ্রহণযোগ্য নয়।

চার্বাক মতে মোক্ষ সম্পর্কে তাঁদের অবস্থান ভারতীয় দর্শনের অন্যান্য মতবাদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। যেখানে বেদান্তে ব্রহ্মজ্ঞান, সাংখ্যে পুরুষ-প্রকৃতির বিবেকজ্ঞান, যোগে কৈবল্য এবং ন্যায়ে অপবর্গ-এর মতো মুক্তির ধারণা রয়েছে, সেখানে চার্বাকরা কোনো পারলৌকিক মুক্তিকে স্বীকার করেন না। কারণ তাঁদের দর্শনে নিত্য আত্মা, পরলোক ও পুনর্জন্মেরই কোনো স্বীকৃতি নেই।

অতএব বলা যায়, চার্বাক মতে মোক্ষ বা মুক্তি নামে কোনো স্বতন্ত্র পারলৌকিক অবস্থা নেই। আত্মা নিত্য নয়, পুনর্জন্ম নেই, পরলোক নেই এবং কর্মের অদৃশ্য ফলেরও কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। তাই জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে আত্মার মুক্তির ধারণা চার্বাক দর্শনের দৃষ্টিতে অর্থহীন। চার্বাকদের মতে দেহের বিনাশের সঙ্গে ব্যক্তির চেতনাসম্পন্ন অস্তিত্বেরও অবসান ঘটে। এই কারণে তাঁদের দর্শনে প্রচলিত অর্থে মোক্ষ বা মুক্তির কোনো স্থান নেই।

প্রশ্ন : চার্বাক মতে মোক্ষ বা মুক্তি কী ?

ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে চার্বাক দর্শন একটি স্বতন্ত্র জড়বাদী, বস্তুবাদী ও প্রত্যক্ষবাদী দর্শন। ভারতীয় দর্শনের অধিকাংশ সম্প্রদায় যেখানে মোক্ষ বা মুক্তিকে মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বা পরম পুরুষার্থ হিসেবে গ্রহণ করেছে, সেখানে চার্বাক দর্শন প্রচলিত অর্থে মোক্ষ বা মুক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করে না। চার্বাকদের মতে দেহের অতিরিক্ত কোনো নিত্য আত্মা নেই, পুনর্জন্ম নেই, পরলোক নেই এবং কর্মের কোনো অদৃশ্য ফল নেই। তাই যে আত্মা জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ হয়ে কর্মফল ভোগ করে এবং পরে মোক্ষ লাভ করে—এই প্রচলিত ধারণাটিই চার্বাক দর্শনের কাছে অগ্রহণযোগ্য। চার্বাক মতে মোক্ষের ধারণা বুঝতে হলে তাঁদের জড়বাদ, দেহাত্মবাদ, প্রত্যক্ষবাদ, কর্মবাদ-বিরোধিতা এবং পুনর্জন্ম-বিরোধী মত সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন।

মোক্ষ বা মুক্তি কী?

মোক্ষ বা মুক্তি: ভারতীয় দর্শনে মোক্ষ বলতে সাধারণত জন্ম-মৃত্যুর চক্র, কর্মবন্ধন, দুঃখ, অজ্ঞানতা ও সংসারবন্ধন থেকে আত্মার চূড়ান্ত মুক্তিকে বোঝানো হয়। মানুষের জীবনকে সংসারবন্ধনে আবদ্ধ বলে মনে করে বিভিন্ন দর্শন সেই বন্ধন থেকে মুক্তির বিভিন্ন পথ নির্দেশ করেছে। কারও মতে জ্ঞান, কারও মতে যোগসাধনা, কারও মতে ঈশ্বরভক্তি বা ঈশ্বরের কৃপা এবং কারও মতে তত্ত্বজ্ঞান মোক্ষ লাভের প্রধান উপায়। কিন্তু চার্বাকরা যেহেতু নিত্য আত্মা, পুনর্জন্ম ও পরলোক স্বীকার করেন না, তাই তাঁদের দর্শনে এই প্রচলিত মোক্ষধারণার কোনো স্থান নেই।

চার্বাক মতে মোক্ষের ধারণা

১. মোক্ষের অস্তিত্ব অস্বীকার: চার্বাকরা প্রচলিত অর্থে কোনো পারলৌকিক মোক্ষকে স্বীকার করেন না। তাঁদের মতে, মৃত্যুর পরে আত্মা কোনো চিরস্থায়ী সুখ বা মুক্তির অবস্থায় পৌঁছায়—এমন কোনো বাস্তবতার প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। তাই মোক্ষকে একটি বাস্তব ও প্রমাণিত অবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

২. নিত্য আত্মার অস্তিত্ব নেই: মোক্ষের ধারণার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো নিত্য আত্মা। আত্মা জন্ম-মৃত্যুর ঊর্ধ্বে এবং এক দেহ ত্যাগ করে অন্য দেহে প্রবেশ করে—এই ধারণা গ্রহণ করলেই আত্মার মুক্তির প্রশ্ন আসে। কিন্তু চার্বাকদের মতে দেহের অতিরিক্ত কোনো স্বাধীন, নিত্য ও অবিনশ্বর আত্মার অস্তিত্ব নেই। ফলে আত্মার মোক্ষলাভের ধারণার ভিত্তিই চার্বাক দর্শনে অনুপস্থিত।

৩. দেহাত্মবাদ মোক্ষকে অস্বীকার করে: চার্বাকদের দেহাত্মবাদ অনুযায়ী, দেহের অতিরিক্ত কোনো পৃথক আত্মার অস্তিত্ব নেই। জীবদেহের বিশেষ সংগঠনের সঙ্গে চেতনার প্রকাশ ঘটে। দেহের অস্তিত্ব থাকলেই চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তির অস্তিত্ব থাকে এবং দেহের বিনাশের সঙ্গে সেই অস্তিত্বেরও অবসান ঘটে। তাই মৃত্যুর পরে আত্মা কোনো মুক্ত অবস্থায় পৌঁছাবে—এই ধারণা চার্বাকদের দেহাত্মবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

৪. পুনর্জন্মের অস্বীকৃতি: ভারতীয় দর্শনের বহু সম্প্রদায়ে মোক্ষকে জন্ম-মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি বা সংসারচক্র থেকে মুক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু চার্বাকরা পুনর্জন্ম স্বীকার করেন না। তাঁদের মতে, দেহের মৃত্যুর পরে কোনো নিত্য আত্মা অন্য দেহে প্রবেশ করে নতুন জন্ম গ্রহণ করে না। অতএব পুনর্জন্মের চক্রই যদি না থাকে, তাহলে সেই চক্র থেকে মুক্তির অর্থও থাকে না।

৫. পরলোকের অস্বীকৃতি: মোক্ষের ধারণা সাধারণত কোনো পারলৌকিক অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত। মৃত্যুর পরে আত্মা স্বর্গ, নরক বা অন্য কোনো জগতে অবস্থান করে এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তি লাভ করে—এমন ধারণা বহু ভারতীয় দর্শনে দেখা যায়। কিন্তু চার্বাকরা মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্বই স্বীকার করেন না। তাই পরলোক ও পারলৌকিক মোক্ষ উভয়ই তাঁদের কাছে অগ্রহণযোগ্য।

৬. কর্মবাদ ও মোক্ষের সম্পর্ক অস্বীকার: প্রচলিত কর্মবাদ অনুযায়ী মানুষের কর্মের ফলে পুণ্য ও পাপ সঞ্চিত হয় এবং সেই কর্মফল মানুষকে বারবার জন্মগ্রহণ করতে বাধ্য করে। কর্মবন্ধন থেকে সম্পূর্ণ মুক্তিই মোক্ষ। কিন্তু চার্বাকরা অদৃশ্য কর্মফল, পুণ্য, পাপ এবং অদৃষ্ট স্বীকার করেন না। ফলে কর্মবন্ধন থেকে আত্মার মুক্তির ধারণাটিও তাঁদের দর্শনে গ্রহণযোগ্য নয়।

৭. অদৃষ্টের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না: কর্মবাদকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অনেক দর্শন অদৃষ্ট বা অদৃশ্য কর্মশক্তির কথা বলে। এই অদৃষ্ট ভবিষ্যতে কর্মের ফল প্রদান করে এবং জন্মান্তরের কারণ হয়। কিন্তু চার্বাকদের মতে অদৃষ্ট প্রত্যক্ষযোগ্য নয়। যেহেতু প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাব রয়েছে, তাই অদৃষ্টকে বাস্তব সত্তা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। অদৃষ্ট না থাকলে কর্মবন্ধন ও কর্মজনিত মোক্ষের ধারণাও প্রতিষ্ঠিত হয় না।

৮. প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাব: চার্বাক দর্শনের জ্ঞানতত্ত্বে প্রত্যক্ষই প্রধান ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। মোক্ষ যদি এমন একটি অতীন্দ্রিয় অবস্থা হয়, যা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করা যায় না, তাহলে তার অস্তিত্ব কীভাবে নিশ্চিতভাবে জানা যাবে—এটাই চার্বাকদের মূল প্রশ্ন। প্রত্যক্ষভাবে মোক্ষকে জানা বা প্রমাণ করা যায় না বলে তাঁরা পারলৌকিক মোক্ষের ধারণা গ্রহণ করেন না।

৯. চেতনা দেহনির্ভর: চার্বাকদের মতে চেতনা কোনো স্বাধীন আত্মার ধর্ম নয়; বরং জড় উপাদানের বিশেষ সংযোগের ফলে চেতনার উৎপত্তি ঘটে। তাই চেতনা দেহের উপর নির্ভরশীল। দেহের বিনাশের সঙ্গে চেতনাও বিলুপ্ত হয়। ফলে মৃত্যুর পরে চেতনা কোনো আত্মার সঙ্গে থেকে মোক্ষ লাভ করবে—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি থাকে না।

১০. বর্তমান ইহজীবনের গুরুত্ব: চার্বাকরা অপ্রমাণিত পরলোক বা ভবিষ্যৎ মোক্ষের পরিবর্তে বর্তমান ইহজীবনের বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেন। মানুষ যে সুখ-দুঃখ বর্তমান জীবনে প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করে, সেটিই বাস্তব অভিজ্ঞতা। তাই অপ্রত্যক্ষ পারলৌকিক সুখের আশায় বর্তমান জীবনের বাস্তব সুখকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। এই কারণে চার্বাক দর্শনে ইহজীবনের গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রকাশ পায়।

চার্বাক মতে মোক্ষের পরিবর্তে কী গুরুত্ব পায় ?

ইহজাগতিক সুখ: চার্বাক দর্শনে পারলৌকিক মোক্ষের পরিবর্তে বর্তমান জীবনের সুখ ও কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেহেতু চার্বাকরা পরলোক বা পুনর্জন্ম স্বীকার করেন না, তাই মানুষের কাছে এই জীবনই প্রত্যক্ষ ও নিশ্চিত জীবন। ফলে মানুষের জীবনযাত্রা, সুখ ও ইহজাগতিক কল্যাণ তাঁদের দর্শনে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

তবে এখানে মনে রাখা দরকার, চার্বাক দর্শনকে কেবল “যা খুশি তাই ভোগ করা”—এই সরল অর্থে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। চার্বাক দর্শনের মূল বক্তব্য হলো প্রত্যক্ষ বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং অপ্রমাণিত পারলৌকিক ধারণার উপর জীবনদর্শন প্রতিষ্ঠা না করা।

অন্যান্য ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে চার্বাকের পার্থক্য

চার্বাক ও সাংখ্য: সাংখ্য দর্শনে পুরুষ ও প্রকৃতির পার্থক্যজ্ঞান থেকে কৈবল্য লাভ হয়। কিন্তু চার্বাকরা নিত্য পুরুষ বা আত্মার অস্তিত্বই স্বীকার করেন না।

চার্বাক ও যোগ: যোগ দর্শনে চিত্তবৃত্তির নিরোধ ও বিবেকখ্যাতির মাধ্যমে কৈবল্য লাভের কথা বলা হয়েছে। চার্বাকরা এই ধরনের পারলৌকিক মুক্তির ধারণা গ্রহণ করেন না।

চার্বাক ও ন্যায়: ন্যায় দর্শনে তত্ত্বজ্ঞান ও দোষ-কর্মের নিবৃত্তির মাধ্যমে অপবর্গ লাভের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু চার্বাকরা আত্মা, কর্মফল ও পরলোকের ধারণা অস্বীকার করেন।

চার্বাক ও বেদান্ত: বেদান্তে আত্মা-ব্রহ্মের প্রকৃত জ্ঞানকে মোক্ষের প্রধান উপায় হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষত অদ্বৈত বেদান্তে ব্রহ্মজ্ঞান অজ্ঞানতার বিনাশ ঘটিয়ে মুক্তি প্রদান করে। কিন্তু চার্বাকরা ব্রহ্ম, নিত্য আত্মা এবং পারলৌকিক মোক্ষের ধারণা গ্রহণ করেন না।

চার্বাক মতে মোক্ষ অস্বীকারের মূল কারণ

১. নিত্য আত্মার অস্বীকৃতি: দেহের বাইরে স্বাধীন ও অবিনশ্বর আত্মা নেই।
২. পুনর্জন্মের অস্বীকৃতি: এক দেহের মৃত্যুর পরে আত্মার অন্য দেহে জন্ম হয় না।
৩. পরলোকের অস্বীকৃতি: মৃত্যুর পরে আত্মার কোনো অস্তিত্ব নেই।
৪. কর্মফলের অস্বীকৃতি: অদৃশ্য কর্মফল বা অদৃষ্টের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই।
৫. প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাব: পারলৌকিক মোক্ষকে প্রত্যক্ষভাবে জানা যায় না।
৬. দেহাত্মবাদ: ব্যক্তির অস্তিত্ব দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত; দেহের বিনাশের সঙ্গে ব্যক্তির অস্তিত্বেরও অবসান ঘটে।
৭. চেতনার জড়নির্ভরতা: চেতনা দেহের বিশেষ জড়-সমন্বয়ের ফল; এটি কোনো স্বাধীন আত্মার ধর্ম নয়।

মোক্ষ বা মুক্তি

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, চার্বাক মতে মোক্ষ বা মুক্তি কোনো স্বতন্ত্র পারলৌকিক অবস্থা নয়। কারণ চার্বাকরা নিত্য আত্মা, পুনর্জন্ম, পরলোক, কর্মফল এবং অদৃষ্ট—কোনোটিই স্বীকার করেন না। তাঁদের জড়বাদ ও দেহাত্মবাদ অনুযায়ী, ক্ষিতি, অপ, তেজ ও মরুৎ-এর বিশেষ সংযোগের ফলে দেহ ও চেতনার উৎপত্তি হয় এবং দেহের বিনাশের সঙ্গে সেই চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তির অস্তিত্বেরও অবসান ঘটে। তাই মৃত্যুর পরে কোনো আত্মা সংসারবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে মোক্ষ লাভ করবে—এই ধারণা চার্বাক দর্শনের কাছে অর্থহীন।

সুতরাং, চার্বাক মতে মোক্ষের আলোচনা মূলত মোক্ষের স্বীকৃতি নয়, বরং প্রচলিত মোক্ষতত্ত্বের অস্বীকৃতি ও খণ্ডন। নিত্য আত্মা নেই, পুনর্জন্ম নেই, পরলোক নেই এবং অদৃশ্য কর্মফলেরও কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই—এই যুক্তিগুলির উপর ভিত্তি করেই চার্বাকরা মোক্ষের প্রচলিত ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই কারণে “চার্বাক মতে মোক্ষ বা মুক্তি কী?” ভারতীয় দর্শনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পরীক্ষায় ১০ নম্বরের জন্য উপযোগী বিষয়।

উপরের আলোচনা থেকে নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ MCQ & SAQ প্রশ্ন ও উত্তরগুলি নিচে উপস্থাপন করা হলো। পরীক্ষার প্রস্তুতিকে আরও সহজ ও কার্যকর করার জন্য এগুলি বিশেষভাবে সহায়ক হবে।

MCQ প্রশ্নাবলি : চার্বাক মতে মোক্ষ বা মুক্তি কী? 🔥 | চার্বাক দর্শনে মোক্ষ | Indian Philosophy 2026

১. চার্বাক দর্শনে মোক্ষের ধারণা সম্পর্কে সঠিক মত কোনটি?
ক) মোক্ষই জীবনের পরম লক্ষ্য
খ) জ্ঞান দ্বারা মোক্ষ লাভ হয়
গ) প্রচলিত অর্থে মোক্ষ স্বীকার করা হয় না
ঘ) ঈশ্বরের কৃপায় মোক্ষ লাভ হয়
উত্তর: গ) প্রচলিত অর্থে মোক্ষ স্বীকার করা হয় না

২. চার্বাকরা মোক্ষ স্বীকার করেন না কেন?
ক) তাঁরা কর্মকে স্বীকার করেন না
খ) তাঁরা নিত্য আত্মা স্বীকার করেন না
গ) তাঁরা জ্ঞানকে স্বীকার করেন না
ঘ) তাঁরা দেহকে স্বীকার করেন না
উত্তর: খ) তাঁরা নিত্য আত্মা স্বীকার করেন না

৩. চার্বাক মতে দেহের অতিরিক্ত আত্মার প্রকৃতি কী?
ক) নিত্য
খ) অবিনশ্বর
গ) স্বাধীন
ঘ) কোনো পৃথক আত্মা নেই
উত্তর: ঘ) কোনো পৃথক আত্মা নেই

৪. চার্বাকদের মতে চেতনা কীসের ফল?
ক) আত্মার
খ) ঈশ্বরের
গ) জড় উপাদানের বিশেষ সংযোগের
ঘ) কর্মের
উত্তর: গ) জড় উপাদানের বিশেষ সংযোগের

৫. চার্বাক দর্শনের কোন মতটি মোক্ষ অস্বীকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত?
ক) দেহাত্মবাদ
খ) অদ্বৈতবাদ
গ) দ্বৈতবাদ
ঘ) ঈশ্বরবাদ
উত্তর: ক) দেহাত্মবাদ

৬. চার্বাকরা কোন বিষয়টি স্বীকার করেন না?
ক) প্রত্যক্ষ জ্ঞান
খ) ইহজগৎ
গ) পুনর্জন্ম
ঘ) দেহ
উত্তর: গ) পুনর্জন্ম

৭. ভারতীয় দর্শনে সাধারণত মোক্ষ বলতে কী বোঝায়?
ক) ইহজাগতিক সম্পদ লাভ
খ) জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি
গ) জ্ঞান অর্জন
ঘ) কর্ম সম্পাদন
উত্তর: খ) জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি

৮. চার্বাকদের মতে মৃত্যুর পরে কী ঘটে?
ক) আত্মা অন্য দেহে জন্ম নেয়
খ) আত্মা স্বর্গে যায়
গ) আত্মা মোক্ষ লাভ করে
ঘ) দেহের বিনাশের সঙ্গে ব্যক্তির চেতনাসম্পন্ন অস্তিত্বের অবসান ঘটে
উত্তর: ঘ) দেহের বিনাশের সঙ্গে ব্যক্তির চেতনাসম্পন্ন অস্তিত্বের অবসান ঘটে

৯. চার্বাক দর্শনে পুনর্জন্মের ধারণা অস্বীকারের প্রধান কারণ কী?
ক) ঈশ্বরের অনুপস্থিতি
খ) নিত্য আত্মার অস্বীকৃতি
গ) দেহের অস্তিত্ব
ঘ) ইহজীবনের গুরুত্ব
উত্তর: খ) নিত্য আত্মার অস্বীকৃতি

১০. চার্বাকরা কর্মফলের কোন দিকটি অস্বীকার করেন?
ক) প্রত্যক্ষ ফল
খ) অদৃশ্য কর্মফল
গ) বর্তমান জীবনের ফল
ঘ) স্বাভাবিক ফল
উত্তর: খ) অদৃশ্য কর্মফল

১১. চার্বাকদের মতে ‘অদৃষ্ট’ কী?
ক) প্রত্যক্ষ বস্তু
খ) ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান
গ) অদৃশ্য কর্মশক্তি
ঘ) জড় উপাদান
উত্তর: গ) অদৃশ্য কর্মশক্তি

১২. চার্বাক দর্শনের জ্ঞানতত্ত্বে কোন প্রমাণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়?
ক) শব্দ
খ) অনুমান
গ) উপমান
ঘ) প্রত্যক্ষ
উত্তর: ঘ) প্রত্যক্ষ

১৩. চার্বাকদের মতে পারলৌকিক মোক্ষ গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ—
ক) তা প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণিত নয়
খ) তা খুব কঠিন
গ) তা সুখের বিরোধী
ঘ) তা দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত
উত্তর: ক) তা প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণিত নয়

১৪. চার্বাক দর্শনে মোক্ষের পরিবর্তে কোন বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়?
ক) পরলোকের সুখ
খ) বর্তমান ইহজীবন
গ) আত্মার অমরত্ব
ঘ) কর্মফল
উত্তর: খ) বর্তমান ইহজীবন

১৫. কোন দর্শনে পুরুষ-প্রকৃতির বিবেকজ্ঞান মোক্ষের কারণ?
ক) চার্বাক
খ) সাংখ্য
গ) ন্যায়
ঘ) বৌদ্ধ
উত্তর: খ) সাংখ্য

১৬. যোগ দর্শনে মুক্তির চূড়ান্ত অবস্থাকে কী বলা হয়?
ক) অপবর্গ
খ) নির্বাণ
গ) কৈবল্য
ঘ) ব্রহ্মসায়ুজ্য
উত্তর: গ) কৈবল্য

১৭. ন্যায় দর্শনে মুক্তির নাম কী?
ক) কৈবল্য
খ) অপবর্গ
গ) নির্বাণ
ঘ) মোক্ষ
উত্তর: খ) অপবর্গ

১৮. বেদান্ত দর্শনে মোক্ষের সঙ্গে কোন বিষয়টি বিশেষভাবে সম্পর্কিত?
ক) ব্রহ্মজ্ঞান
খ) ইন্দ্রিয়সুখ
গ) দেহের বৃদ্ধি
ঘ) কর্মের সঞ্চয়
উত্তর: ক) ব্রহ্মজ্ঞান

১৯. চার্বাক মতে মোক্ষের ধারণা মূলত কীভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়?
ক) আত্মা, পুনর্জন্ম ও পরলোক অস্বীকারের মাধ্যমে
খ) প্রত্যক্ষ জ্ঞান অস্বীকারের মাধ্যমে
গ) জড় জগত অস্বীকারের মাধ্যমে
ঘ) দেহ অস্বীকারের মাধ্যমে
উত্তর: ক) আত্মা, পুনর্জন্ম ও পরলোক অস্বীকারের মাধ্যমে

২০. চার্বাক মতে মোক্ষ সম্পর্কে কোন বক্তব্যটি সবচেয়ে সঠিক?
ক) জ্ঞান লাভ করলে আত্মা মোক্ষ লাভ করে
খ) ঈশ্বরের কৃপায় মোক্ষ লাভ হয়
গ) যোগসাধনার মাধ্যমে মোক্ষ লাভ হয়
ঘ) নিত্য আত্মা না থাকায় প্রচলিত মোক্ষের ধারণাই অগ্রহণযোগ্য
উত্তর: ঘ) নিত্য আত্মা না থাকায় প্রচলিত মোক্ষের ধারণাই অগ্রহণযোগ্য

SAQ প্রশ্নাবলি : চার্বাক মতে মোক্ষ বা মুক্তি কী? 🔥 | চার্বাক দর্শনে মোক্ষ | Indian Philosophy 2026

১. মোক্ষ বা মুক্তি কী?
উত্তর: জন্ম-মৃত্যুর চক্র, কর্মবন্ধন ও সংসারজনিত দুঃখ থেকে আত্মার চূড়ান্ত মুক্তিকে মোক্ষ বা মুক্তি বলা হয়।

২. চার্বাকরা কি মোক্ষ স্বীকার করেন?
উত্তর: না, চার্বাকরা প্রচলিত অর্থে কোনো পারলৌকিক মোক্ষ বা মুক্তি স্বীকার করেন না।

৩. চার্বাক মতে মোক্ষ অস্বীকারের প্রধান কারণ কী?
উত্তর: চার্বাকরা দেহের অতিরিক্ত কোনো নিত্য ও অবিনশ্বর আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। তাই আত্মার মোক্ষলাভের ধারণাও তাঁরা অস্বীকার করেন।

৪. চার্বাকদের মতে আত্মা কী?
উত্তর: চার্বাকদের মতে দেহের অতিরিক্ত কোনো স্বাধীন ও নিত্য আত্মা নেই। তাঁদের দেহাত্মবাদ অনুযায়ী দেহই ব্যক্তিসত্তার ভিত্তি।

৫. দেহাত্মবাদ কী?
উত্তর: দেহের অতিরিক্ত কোনো পৃথক, নিত্য ও অবিনশ্বর আত্মার অস্তিত্ব নেই—এই মতকে দেহাত্মবাদ বলা হয়।

৬. চার্বাকদের দেহাত্মবাদের সঙ্গে মোক্ষের সম্পর্ক কী?
উত্তর: চার্বাকরা যখন দেহের অতিরিক্ত নিত্য আত্মা স্বীকার করেন না, তখন সেই আত্মার সংসারবন্ধন থেকে মুক্তি লাভের প্রশ্নও থাকে না। তাই দেহাত্মবাদ মোক্ষ অস্বীকারের ভিত্তি।

৭. চার্বাকরা পুনর্জন্ম স্বীকার করেন না কেন?
উত্তর: চার্বাকরা নিত্য আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করেন না এবং পুনর্জন্মের প্রত্যক্ষ প্রমাণও নেই। তাই তাঁরা পুনর্জন্মবাদ অস্বীকার করেন।

৮. পুনর্জন্ম ও মোক্ষের মধ্যে কী সম্পর্ক রয়েছে?
উত্তর: অনেক ভারতীয় দর্শনে পুনর্জন্মের চক্র থেকে আত্মার মুক্তিকেই মোক্ষ বলা হয়। কিন্তু চার্বাকরা পুনর্জন্মই স্বীকার করেন না, তাই পুনর্জন্ম থেকে মুক্তির ধারণাও তাঁদের কাছে অগ্রহণযোগ্য।

৯. চার্বাকরা পরলোক অস্বীকার করেন কেন?
উত্তর: চার্বাকদের মতে দেহের মৃত্যুর পরে কোনো নিত্য আত্মা অস্তিত্বশীল থাকে না। তাই মৃত্যুর পর আত্মার পরলোকে অবস্থানের ধারণাও তাঁরা অস্বীকার করেন।

১০. চার্বাক মতে চেতনার কী হয় দেহের মৃত্যুর পরে?
উত্তর: চার্বাকদের মতে চেতনা দেহের বিশেষ জড়-সমন্বয়ের ফল। তাই দেহের বিনাশের সঙ্গে চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তির অস্তিত্বেরও অবসান ঘটে।

১১. চার্বাক মতে কর্মবাদ ও মোক্ষের সম্পর্ক কী?
উত্তর: প্রচলিত মত অনুযায়ী কর্মের ফলে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন সৃষ্টি হয় এবং কর্মবন্ধন থেকে মুক্তিই মোক্ষ। কিন্তু চার্বাকরা অদৃশ্য কর্মফল ও কর্মবন্ধন স্বীকার করেন না, তাই মোক্ষও স্বীকার করেন না।

১২. অদৃষ্ট কী? চার্বাকরা কেন তা অস্বীকার করেন?
উত্তর: কর্মের ফলে সৃষ্ট অদৃশ্য শক্তিকে অদৃষ্ট বলা হয়। চার্বাকরা অদৃষ্টকে অস্বীকার করেন, কারণ এটি প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধ বা প্রমাণ করা যায় না।

১৩. চার্বাকদের প্রত্যক্ষবাদ কীভাবে মোক্ষকে অস্বীকার করতে সাহায্য করে?
উত্তর: চার্বাকরা প্রত্যক্ষকে প্রধান নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেন। পারলৌকিক মোক্ষ প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধ নয়। তাই তাঁরা মোক্ষের অস্তিত্বকে স্বীকার করেন না।

১৪. চার্বাক মতে মোক্ষের পরিবর্তে কোন জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়?
উত্তর: চার্বাক মতে বর্তমান ইহজীবনই প্রত্যক্ষ ও বাস্তব। তাই পারলৌকিক মোক্ষের পরিবর্তে বর্তমান জীবনের সুখ ও কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

১৫. চার্বাকরা কি মোক্ষকে মানবজীবনের পরম পুরুষার্থ মনে করেন?
উত্তর: না। অন্যান্য ভারতীয় দর্শনের মতো চার্বাকরা মোক্ষকে মানবজীবনের পরম পুরুষার্থ হিসেবে স্বীকার করেন না।

১৬. চার্বাক মতে মোক্ষের জন্য জ্ঞানকে কেন গ্রহণ করা হয় না?
উত্তর: মোক্ষের জন্য যে আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান প্রয়োজন বলে অন্যান্য দর্শন মনে করে, চার্বাকরা সেই নিত্য আত্মা বা ব্রহ্মের অস্তিত্বই স্বীকার করেন না। তাই সেই ধরনের জ্ঞাননির্ভর মোক্ষও তাঁরা গ্রহণ করেন না।

১৭. সাংখ্য ও চার্বাকের মোক্ষতত্ত্বের একটি পার্থক্য লেখো।
উত্তর: সাংখ্য মতে পুরুষ ও প্রকৃতির পার্থক্যজ্ঞান থেকে কৈবল্য লাভ হয়। কিন্তু চার্বাকরা নিত্য পুরুষ বা আত্মার অস্তিত্বই স্বীকার করেন না এবং মোক্ষও গ্রহণ করেন না।

১৮. বেদান্ত ও চার্বাকের মোক্ষতত্ত্বের প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: বেদান্তে আত্মা-ব্রহ্মের জ্ঞানকে মোক্ষের প্রধান কারণ বলা হয়। কিন্তু চার্বাকরা নিত্য আত্মা ও ব্রহ্ম স্বীকার করেন না এবং তাই পারলৌকিক মোক্ষও অস্বীকার করেন।

১৯. চার্বাক মতে মোক্ষ অস্বীকারের মূল ভিত্তিগুলি কী কী?
উত্তর: নিত্য আত্মার অস্বীকৃতি, পুনর্জন্মের অস্বীকৃতি, পরলোকের অস্বীকৃতি, অদৃশ্য কর্মফল অস্বীকার এবং পারলৌকিক মোক্ষের প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাব—এসবই মোক্ষ অস্বীকারের মূল ভিত্তি।

২০. চার্বাক মতে মোক্ষ সম্পর্কে সংক্ষেপে কী বলা যায়?
উত্তর: চার্বাক মতে প্রচলিত অর্থে মোক্ষ বা মুক্তির কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। নিত্য আত্মা, পুনর্জন্ম, পরলোক ও অদৃশ্য কর্মফল স্বীকার না করায় আত্মার সংসারবন্ধন থেকে মুক্তির ধারণাকেও তাঁরা অগ্রহণযোগ্য মনে করেন।

চার্বাক দর্শনের মোক্ষ বা মুক্তি বিষয়টি পড়া গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি চার্বাক দর্শনের জড়বাদ, দেহাত্মবাদ, প্রত্যক্ষবাদ এবং কর্মবাদ ও পুনর্জন্ম-বিরোধী মতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই নোটটি পড়লে আমরা সহজভাবে জানতে পারব মোক্ষ বা মুক্তি কী, চার্বাকরা কেন প্রচলিত অর্থে মোক্ষ স্বীকার করেন না, নিত্য আত্মার অস্বীকৃতির সঙ্গে মোক্ষের সম্পর্ক কী, চার্বাকরা পুনর্জন্ম ও পরলোক কেন অস্বীকার করেন, কর্মফল ও অদৃষ্টের ধারণা কীভাবে মোক্ষতত্ত্বকে প্রভাবিত করে এবং চার্বাক দর্শনে ইহজীবনের গুরুত্ব কেন বেশি। বিশেষ করে XI শ্রেণি, B.A. Philosophy এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় চার্বাক মতে মোক্ষ বা মুক্তি থেকে সংজ্ঞা, ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন, SAQ, MCQ এবং মান-১০-এর প্রশ্ন আসতে পারে। তাই এই নোটটি পড়লে বিষয়টির মূল ধারণা যেমন পরিষ্কার হবে, তেমনি পরীক্ষায় বড় প্রশ্নের উত্তর লেখার জন্য প্রয়োজনীয় যুক্তি, চার্বাকদের মোক্ষ-বিরোধী মত এবং গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যও একসঙ্গে প্রস্তুত হয়ে যাবে।

সহযোগী Video

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *