পাশ্চাত্য দর্শন সম্পূর্ণ অধ্যায় | 100+ MCQ + SAQ + মান–1 , 5 ও 10 -এর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর | Western Philosophy 2026
পাশ্চাত্য দর্শনের পরিচয়
“পাশ্চাত্য দর্শনের পরিচয়” পাশ্চাত্য দর্শনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ভিত্তিমূলক অধ্যায়। পাশ্চাত্য দর্শনের প্রকৃতি, স্বরূপ, বৈশিষ্ট্য, উদ্দেশ্য, জ্ঞান, সত্য, ঈশ্বর, আত্মা, জগৎ এবং মানুষের জীবন সম্পর্কে পাশ্চাত্য দার্শনিকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও পাশ্চাত্য দর্শনের মূল চিন্তাধারা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা অর্জনের জন্য এই অধ্যায়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও এই অধ্যায় থেকে বিভিন্ন ধরনের বড়, ছোট, MCQ এবং SAQ প্রশ্ন দেখা যায়।
এই অধ্যায়টি শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সহজ, সুসংগঠিত এবং পরীক্ষামুখী করে তুলতে ISP Gurukul–এ এক জায়গায় সাজানো হয়েছে “পাশ্চাত্য দর্শনের পরিচয়” অধ্যায়ের সম্পূর্ণ Study Materials।
এই অধ্যায়ে শিক্ষার্থীরা পাবে—
বড় প্রশ্ন — মান ১০ ও ৫: পাশ্চাত্য দর্শনের স্বরূপ, প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য, উদ্দেশ্য, পরিধি এবং মূল চিন্তাধারা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ রচনাধর্মী ও ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নগুলির বিস্তারিত উত্তর। পরীক্ষায় পূর্ণ নম্বর পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলি সহজ, সাবলীল ও পরীক্ষোপযোগী ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
ছোট প্রশ্ন — মান ২: পাশ্চাত্য দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা, ধারণা, বৈশিষ্ট্য এবং দার্শনিক বিষয় নিয়ে নির্বাচিত সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও সহজ ভাষায় উপযুক্ত উত্তর, যা দ্রুত Revision-এর জন্য বিশেষভাবে সহায়ক।
M.C.Q — Multiple Choice Questions: পাশ্চাত্য দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির উপর ভিত্তি করে নির্বাচিত বহুনির্বাচনী প্রশ্ন, যা বিভিন্ন শিক্ষামূলক, বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা করবে।
S.A.Q — Short Answer Questions: পাশ্চাত্য দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ও মূল বক্তব্য যাচাই করার জন্য নির্বাচিত Short Answer Questions, যা শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক ধারণা আরও শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।
বিষয়ভিত্তিক সহযোগী Video: শুধু বই পড়ে নয়, সহজ ও সাবলীল ব্যাখ্যার মাধ্যমে পাশ্চাত্য দর্শনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে এই অধ্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত সহযোগী YouTube Video দেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি ভিডিও দেখে বিষয়গুলি আরও সহজে বুঝতে পারবে।
পাশ্চাত্য দর্শনের পরিচয় ও মূল বিষয়সমূহ
পাশ্চাত্য দর্শন মূলত ইউরোপীয় দার্শনিক চিন্তার দীর্ঘ ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রাচীন গ্রিক দর্শন থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় দর্শন, আধুনিক দর্শন এবং সমকালীন দর্শন পর্যন্ত পাশ্চাত্য দর্শনের চিন্তার ধারায় জ্ঞান, সত্য, বাস্তবতা, ঈশ্বর, আত্মা, মন, নৈতিকতা, সমাজ এবং মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ গড়ে উঠেছে।
পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, ডেকার্ট, স্পিনোজা, লাইবনিজ, জন লক, বার্কলে, হিউম, কান্ট, হেগেল প্রমুখ দার্শনিকের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের বিভিন্ন দার্শনিক মতবাদ পাশ্চাত্য দর্শনের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
এই অধ্যায়ে পাশ্চাত্য দর্শনের যুক্তিনির্ভর চিন্তা, জ্ঞান অনুসন্ধান, সত্যের সন্ধান, বাস্তবতার প্রকৃতি, যুক্তিবাদ, অভিজ্ঞতাবাদ, ভাববাদ এবং বস্তুবাদ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রবণতা সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া হয়েছে।
কারা উপকৃত হবে?
এই অধ্যায়ের Study Materials বিশেষভাবে উপকারী হবে উচ্চ মাধ্যমিক (HS) শিক্ষার্থী, B.A. শিক্ষার্থী, B.A. Philosophy Major/Minor শিক্ষার্থী, M.A. শিক্ষার্থী, B.Ed শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার্থীদের জন্য। এছাড়াও যারা পাশ্চাত্য দর্শনের মৌলিক ধারণা তৈরি করতে চান, দর্শন বিষয়ের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অথবা দ্রুত Revision করতে চান, তারাও এই অধ্যায়ের উপকরণ থেকে উপকৃত হতে পারবেন।
ISP Gurukul-এর লক্ষ্য হলো জটিল দার্শনিক বিষয়গুলিকে সহজ ভাষায়, পরীক্ষার উপযোগীভাবে এবং একটি নির্দিষ্ট অধ্যায়ের সমস্ত প্রয়োজনীয় Study Materials এক জায়গায় শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তাই “পাশ্চাত্য দর্শনের পরিচয়” অধ্যায়ের বড় প্রশ্ন, ছোট প্রশ্ন, MCQ, SAQ এবং বিষয়ভিত্তিক সহযোগী Video—সবকিছু একসঙ্গে পেতে এই অধ্যায়টি সম্পূর্ণভাবে অনুসরণ করুন।
পড়ুন → বুঝুন → অনুশীলন করুন → Video দেখুন → Revision করুন → পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করুন।
ISP Gurukul — একদিনে হবে না, একদিন হবেই।

পাশ্চাত্য দর্শন স্বরূপ বড় প্রশ্ন ও উত্তর (মান – 10 & 5)
প্রশ্ন:- আধুনিক যুগের সময়কাল নির্ণয় কর। এই যুগের দার্শনিকদের বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।
উত্তর :- যুগ অনুযায়ী পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসকে ৩টি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা— প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগ। আধুনিক যুগের সময়কাল হল চতুর্দশ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত।
আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্য : চতুর্দশ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত এই আধুনিক যুগের সময়সীমা। ইংল্যান্ডের বেকন, জার্মানির নিকোলাস এবং ফ্রান্সের ডেকার্তকে পাশ্চাত্য আধুনিক যুগের প্রবক্তা বলে মনে করা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ডেকার্ত হলেন পাশ্চাত্য দর্শনের জনক।
এই যুগের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বৈজ্ঞানিক। মধ্যযুগের অন্ধবিশ্বাস মানুষের বুদ্ধিকে যে পথে নিয়ে গিয়েছিল, সেই পথ থেকে মানুষকে বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তির পথে ফিরিয়ে আনার জন্য শুরু হল নবজাগরণের আন্দোলন। এর ফলে মানুষের মূল্যবোধের ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিল এবং একই সঙ্গে মানুষের মনে জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ বৃদ্ধি পেল।
আধুনিক যুগে মানুষের চিন্তাধারায় এক বিরাট পরিবর্তন দেখা যায়। মধ্যযুগে যেখানে ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও গির্জার প্রভাব ছিল প্রধান, সেখানে আধুনিক যুগে মানুষ নিজের বিচার-বুদ্ধি, যুক্তি ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধানের চেষ্টা করে। এই কারণে আধুনিক দর্শনকে অনেক সময় যুক্তি ও অনুসন্ধানের যুগ বলা হয়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিক যুগে মূল চারটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়, যথা—
ক. অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
খ. নির্বিচারবাদী প্রচলিত রচনার বিরুদ্ধে সংশয় ও সমালোচনা।
গ. দর্শনের জ্ঞানতত্ত্বের বিচার এবং বিশ্লেষণ।
ঘ. ধর্মীয় আপ্তবাক্যের উপর নির্ভরতার পরিবর্তে আত্মচেতনা।
এছাড়াও আধুনিক যুগে ব্যক্তির স্বাধীন যুক্তিচিন্তার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এই যুগে দার্শনিক চিন্তাভাবনা প্রবন্ধ আকারে প্রকাশিত হত। এই যুগে দর্শনচর্চার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বাসস্থান বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। যে যেখানে বাস করত, সে সেখান থেকেই নিজের কাজের অবসরে দর্শনচর্চা করত।
পরবর্তীকালে অর্থাৎ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে বিদ্যালয়ে দর্শনচর্চা শুরু হয়। প্রথমে জার্মানিতে এবং পরে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে দর্শনচর্চা শুরু হয়। আরও পরবর্তীকালে আমেরিকা দর্শনচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।
আধুনিক যুগে দর্শন আর শুধুমাত্র কয়েকজন ধর্মীয় ব্যক্তির চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ দর্শনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। ফলে দর্শন আরও স্বাধীন, যুক্তিনির্ভর এবং সর্বজনীন রূপ লাভ করে।
মধ্যযুগে গির্জার ধর্মযাজকরাই ছিলেন দর্শনের শিক্ষক। কিন্তু আধুনিককালে এই নিয়ম ভেঙে গেলে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষ দার্শনিক চিন্তাভাবনায় অংশগ্রহণ করেন। আধুনিক পাশ্চাত্য ইতিহাসে সকল জাতির সমান অবদান নেই। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানিই মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। অন্যান্য দেশগুলি সেই ভূমিকা নামমাত্র গ্রহণ করে।
পাশ্চাত্য দর্শনে জ্ঞানের উৎপত্তিকে কেন্দ্র করে মোট নয়টি প্রধান মতবাদের উদ্ভব হয়েছে। তার মধ্যে লক, বার্কলে ও হিউমের মতবাদ অভিজ্ঞতাবাদ নামে পরিচিত। এই অভিজ্ঞতাবাদীদের মতে, ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতাই হল জ্ঞান লাভের একমাত্র উৎস।
ডেকার্ত, স্পিনোজা ও লাইবনিজ হলেন বুদ্ধিবাদী দার্শনিক। এই বুদ্ধিবাদীদের মতানুসারে, বুদ্ধিই হল জ্ঞান লাভের একমাত্র উপায় বা উৎস।
অন্যদিকে বিচারবাদী (কান্ট) প্রভৃতি দার্শনিকদের বক্তব্য হল, জ্ঞান লাভের জন্য কেবল অভিজ্ঞতা বা বুদ্ধি যথেষ্ট নয়। যথার্থ জ্ঞান লাভের জন্য অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধি উভয়েরই প্রয়োজন।
আধুনিক যুগের দর্শনে যুক্তিবাদ, অভিজ্ঞতাবাদ ও বিচারবাদ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। এই তিনটি মতবাদ জ্ঞানের উৎপত্তি, প্রকৃতি এবং সীমা সম্পর্কে নতুন চিন্তার জন্ম দেয়। বিশেষ করে কান্ট অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধির মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেন।

আধুনিক যুগের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল বৈজ্ঞানিক মনোভাবের বিকাশ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে মানুষ প্রকৃতি ও জগতকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করতে শুরু করে। ফলে দর্শনেও পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ ও যুক্তির গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
এই যুগের দার্শনিকরা মানুষের স্বাধীন চিন্তা, ব্যক্তিসত্তা, নৈতিকতা এবং জ্ঞানের সীমা সম্পর্কে গভীর আলোচনা করেন। তাই আধুনিক দর্শন শুধুমাত্র ঈশ্বর বা ধর্মকেন্দ্রিক না হয়ে মানুষ ও জ্ঞানকেন্দ্রিক দর্শনে পরিণত হয়।
উপসংহার : আধুনিক যুগ পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের যুগ। এই যুগে মানুষ অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধান শুরু করে। ডেকার্ত, বেকন, লক, হিউম, স্পিনোজা, লাইবনিজ ও কান্ট প্রমুখ দার্শনিক আধুনিক দর্শনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই আধুনিক যুগের দর্শন মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও জ্ঞান অনুসন্ধানের এক নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রশ্ন : মায়া বা অজ্ঞান সম্পর্কে আচার্য শংকরের মতবাদ
উত্তর : উপনিষদের বিভিন্ন গ্রন্থে জগত সম্পর্কে দুটি পরস্পর বিরোধী উক্তি লক্ষ্য করা যায়। তার মধ্যে কোনো কোনো উপনিষদে ব্রহ্মকেই একমাত্র সত্য এবং জগতকে মিথ্যা বলা হয়েছে। আবার অনেক উপনিষদ গ্রন্থে ব্রহ্মকে জগতের স্রষ্টারূপে উল্লেখ করে সৃষ্ট জগতকেও সত্য বলা হয়েছে। কিন্তু শংকরাচার্য তার অদ্বৈতবাদের জগৎ সম্পর্কিত উক্ত দুটি পরস্পরবিরোধী মতের মধ্যে সমন্বয় সাধন করার চেষ্টা করেছেন। বেদ, উপনিষদের বিভিন্ন জায়গায় জগতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ‘মায়া’ কথাটির উল্লেখ আছে। ঋকবেদে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘ইন্দ্র মায়াভিঃ পুরুরুপ ঈয়েতে’ অর্থাৎ মায়ার দ্বারা এক ইন্দ্র বহুরূপে (জগতরূপে) প্রকাশিত হন।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘ মায়াম্ তু প্রকৃতিম্ বিদ্যাৎ, মায়িনম্ তু মহেশ্বরম্’ অর্থাৎ এই প্রকৃতি হচ্ছে মায়া এবং মায়া উপহিত ব্রহ্ম বা ঈশ্বর হচ্ছেন মায়াধীশ। আচার্য শঙ্কর উপনিষদ থেকে ‘মায়া’ কথাটি গ্রহণ করে ব্রহ্ম ও জগতের সম্বন্ধ ব্যাখ্যা করেছেন।
আচার্য শংকরের মতে ব্রহ্মের সাথে জগতের সম্পর্ক নিয়ে কোনো প্রশ্ন হতে পারে না। কারণ,এক ব্রহ্ম ভিন্ন আর কোনকিছুই সত্য নয়। ব্রহ্ম যদি শুদ্ধ চৈতন্য বা আত্মা হয়, তাহলে ন্যায়গতভাবে, ব্রহ্মের সাথে অনাত্ম জগতের কোনো সম্বন্ধ বন্ধন থাকতে পারেনা। সম্বন্ধ মাত্রই দুটি ভিন্ন বিষয়কে সম্বন্ধ করে। ব্রহ্মের সাথে জগতের সম্পর্ক উল্লেখ করলে জগৎ ও ব্রহ্মকে দুটি ভিন্ন সত্তা বলতে হয়; কিন্তু অদ্বৈতমতে জগৎ ব্রহ্ম স্বতন্ত্র নয়, জগৎ ও ব্রহ্মের মধ্যে অনন্যত্ব সম্বন্ধ আছে।
জগতকে ব্রহ্মভিন্ন বললে তাদের মধ্যে আর কোনো সম্বন্ধই থাকতে পারে না। অসীম ব্রহ্মকে অসীম জগতের কারণ বলা যায় না। কারণ ও কার্য দুটি স্বতন্ত্র ঘটনা হওয়ায় কার্য যেমন কারণের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও খন্ডিত হয়, কারণও তেমনি কার্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও খন্ডিত হবে। এরূপ ক্ষেত্রে কারনরুপ ব্রহ্ম কার্যরূপ জগতে দ্বারা খন্ডিত হবে। কিন্তু অদ্বৈতমতে ব্রহ্ম বিভু বা সর্বব্যাপী। ব্রহ্মকে জগৎ স্রষ্টারূপে ক্রিয়াশীল কর্তাও বলা যাবে না, কেননা ক্রিয়া মাত্রই অভবের সূচক। কোনো না কোনো না পাওয়ার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য লাভের জন্যই কর্ম সাধিত হয়। কিন্তু ব্রহ্ম নিষ্কাম, ব্রহ্মের কোনো কামনা নেই। আবার এমনও বলা যাবে না যে, ব্রহ্ম তাঁর লীলাখেলার জন্য জগৎ রচনা করে নিজেকে প্রকাশ করেন; কারণ সসীম জগৎ অসীম ব্রহ্মের প্রকাশক হতে পারেন না। জগতকে ব্রহ্মের পরিণামও বলা যায় না, কারণ সেক্ষেত্রে প্রশ্ন দেখা দেবে – জগৎ কি সমগ্র ব্রহ্মের পরিণাম অথবা অংশের পরিণাম? জগৎ সমগ্র ব্রহ্মের পরিণাম হলে জগতের ন্যায় ব্রহ্ম ও সীমিত হয়। আবার জগৎ ব্রহ্মের আংশিক পরিণাম হলে ব্রহ্মকে সাংশ বলতে হয়। কিন্তু প্রথমত ব্রহ্মের কোনো সীমা নেই এবং দ্বিতীয়ত ব্রহ্ম অংশবিশিষ্ট নয়।
যার জন্য আচার্য শঙ্কর বলেন, জগৎ ব্রহ্মের বিবর্তক। আমরা জানি বিবর্তবাদ অনুসারে কারণ প্রকৃতই কার্যে পরিণত হয় না – কারণের বিবর্ত হলো কার্য। কারণ কার্যরূপে প্রতিভাত হয়,কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কার্যে পরিণত হয় না। আচার্য শঙ্কর ব্রহ্ম বিবর্তবাদী।
শংকরের মতে, ‘মায়া’ নামে এক ভ্রমসৃষ্টিকারী শক্তি আছে, মায়া উপহিত ব্রহ্ম অর্থাৎ ঈশ্বর মায়া উপাধি উপহিত হয়ে জগতরুপে প্রকাশিত হন। আর বদ্ধ জীব তার অজ্ঞান বা অবিদ্যাবশত এক ব্রহ্মের পরিবর্তে জগতের নানত্বকে সত্য বলে মনে করে। শঙ্কর মায়াকে ‘অবিদ্যা’ বা ‘অজ্ঞান’ ও বলেছেন। ঈশ্বরের দিক থেকে যা মায়া, জীবের দিক থেকে তাই অবিদ্যা বা অজ্ঞান। মায়া ঈশ্বরের শক্তি-স্বরূপ, যাকে ঈশ্বরের থেকে পৃথক করা যায় না, তবে, মায়াবী ঈশ্বর তাঁর মায়াজালে আবদ্ধ হন না।
জাদুকরের জাদু শক্তি ন্যায় ঈশ্বরের মায়া শক্তি কেবল অজ্ঞ ব্যক্তিকে প্রতারিত করে। ভ্রম উৎপাদনকারী জাদু শক্তির দ্বারা জাদুকর যেমন মিথ্যা বস্তু সৃষ্টি করে এবং সেই জাদুতে মুগ্ধ দর্শকবৃন্দ প্রতারিত হয়ে মিথ্যা বস্তুকে সত্য বলে মনে করে। কিন্তু মায়াধীশ ঈশ্বরের কাছে মায়ারসৃষ্ট জগৎ সত্য নয় এবং যিনি ব্রহ্মবিদ তিনিও জানেন যে জগত প্রপঞ্চ মিথ্যা – নির্গুণ নির্বিশেষ ব্রহ্মই সত্য। বদ্ধ জীবের কাছে জগৎ আছে, জগৎ স্রষ্টা ঈশ্বর আছেন। ব্রহ্ম জ্ঞানীর কাছে মায়াময় জগত নেই, মায়াবী ঈশ্বর নেই – আছে কেবল নির্গুণ অসঙ্গ ব্রহ্ম। এভাবে আচার্য শংকর মায়ার ব্যাখ্যা করে উপনিষদের দুটি পরস্পর বিরোধী উক্তির মধ্যে সঙ্গতি সাধনের চেষ্টা করেছেন। ব্রহ্মজ্ঞানীর নিকট নির্গুণ ব্রহ্ময় কেবল সত্য। বদ্ধ জীবের নিকট ব্রহ্ম সত্য এবং মায়াধীশ ঈশ্বর সৃষ্ট জগৎ ও সত্য।
সদানন্দ যোগীন্দ্র তার ‘বেদান্তসার’ নামক গ্রন্থে শঙ্করের মায়া বা অজ্ঞানের স্বরূপ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘সদসদ্ভ্যাম্ অনির্বচনীয়ম্ ত্রিগুণাত্মকম্ জ্ঞানবিরোধী ভাবরুপম্ যদকিঞ্চিদিতি’। অর্থাৎ মায়া হল সৎ অসৎ বিলক্ষণ অনির্বচনীয় ত্রিগুণবিশিষ্ট, জ্ঞান বিরোধী কিন্তু ভাবরুপ অর্থাৎ একটা কিছু নিছক শূন্য নয়। এই বৈশিষ্ট্যের প্রতিটি এখন আমরা বিস্তারিতভাবে জানবো।
১) মায়া ‘সদসদ্ভ্যাম্ অনির্বচনীয়’ : শঙ্করের মতে মায়া বা অবিদ্যা বা অজ্ঞান সৎ নয়, অসৎ নয়, সদসদ নয়, আবার সদসদ ভিন্নও নয়। মায়া সদসদ বিলক্ষণ অনির্বচ্য। যা অবাধিত কেবল তাই সত্য। ব্রহ্মের সত্তা কখনো বাধিত হয় না। তাই ব্রহ্ম সত্য। মায়াসৃষ্ট বা অজ্ঞানসৃষ্ট জগত ব্রহ্ম জ্ঞানের দ্বারা বাধিত হয়। মায়াময় জগত তাই ব্রহ্মের ন্যায় অবাধিত সত্য নয়। আবার মায়া সৃষ্ট বা অজ্ঞান সৃষ্ট জগত প্রপঞ্চবদ্ধ জীবের কাছে প্রতিভাত হয়। কাজেই জগত আকাশ কুসুমের ন্যায় অসৎ নয়। যা ব্রহ্মের ন্যায় সৎ নয়, আবার আকাশ কুসুমের ন্যায় অসৎ নয়, শংকর তাকেই ‘মিথ্যা’ বা ‘মায়া’ বলেছেন। এই অর্থের জগৎ মিথ্যা বা মায়া। মায়ার দুটি শক্তির কথা বেদান্ত দর্শনের স্বীকার করা হয়েছে। এগুলি হল- আবরণ শক্তি ও বিক্ষেপ শক্তি। আবরণ শক্তির দ্বারা মায়া সত্যের স্বরূপকে আবৃত করে এবং বিক্ষেপ শক্তির দ্বারা মায়া সত্যের স্থলে মিথ্যাকে প্রকাশিত করে। মায়ার আবরণ শক্তির দ্বারা এক ব্রহ্ম আবৃত হয়; মায়ার বিক্ষেপ শক্তির দ্বারা এক ব্রহ্মের পরিবর্তে জগত-প্রপঞ্চ প্রতিভাত হয়।
মায়া উপাধির দ্বারা উপহিত ব্রহ্মই ঈশ্বর। আর অবিদ্যা বা অজ্ঞান উপাধি দ্বারা সীমিত ব্রহ্মই হচ্ছে জীব। অর্থাৎ মায়ার সঙ্গে যুক্ত ঈশ্বর, অবিদ্যা বা অজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত জীব। ঈশ্বরের মায়া শক্তি থেকে যেমন জগতের উৎপত্তি, তেমনই আবার জীবাশ্রিত অবিদ্যা বা অজ্ঞান থেকেও জগতের উৎপত্তি। বদ্ধ জীব যেমন অবিদ্যা বা অজ্ঞানবশত রজ্জুতে সর্পের সৃষ্টি করে, তেমনি ওই অজ্ঞানবশত এক ব্রহ্মস্থলে জগত ভ্রম উৎপন্ন করে। রজ্জুর অজ্ঞানের জন্য ব্রহ্মস্থলে জগত ভ্রম হয়। মায়ার ন্যায় অবিদ্যা বা অজ্ঞানেরও দুটি শক্তি আছে- আবরণ ও বিক্ষেপ শক্তি। আবরণ শক্তির দ্বারা অধিষ্ঠান আবৃত হয়, আর বিক্ষেপ শক্তির দ্বারা অধিষ্ঠানস্থলে এক মিথ্যা বস্তু প্রতিভাত হয়। রজ্জুর অজ্ঞান প্রথমত আবরণ শক্তির দ্বারা রজ্জুকে আবৃত করে এবং দ্বিতীয়ত বিক্ষেপ শক্তির দ্বারা রজ্জুর স্থলে সর্পের বিক্ষেপ হয় অর্থাৎ সর্প প্রতিভাত হয়। তেমন এই জীবাশ্রীত অজ্ঞান প্রথমত ব্রহ্মকে আবৃত করে এবং দ্বিতীয় ব্রহ্মস্থলে জগতের বিক্ষেপ ঘটায়।
তবে অবিদ্যাকে ‘জীবাশ্রিত ‘ বলার মধ্যে কিছু দোষ এবং আচার্য শংকর সম্ভবত আক্ষরিক অর্থে অবিদ্যাকে ‘জীবাশ্রীত ‘ বলেন নি। শঙ্করের মতে, জীবই ব্রহ্ম – ‘জীবঃ ব্রহ্মৈব নাপরঃ’। জীব ব্রহ্ম যদি স্বরূপত অভিন্ন হয়, তাহলে জীবের ব্রহ্ম অতিরিক্তভাবে অস্তিত্ব স্বীকার করা যায় না, এবং সেক্ষেত্রে ‘জীবাশ্রিত অবিদ্যা’ থেকেও জগতের উৎপত্তি হতে পারে না। তাছাড়া জীবাশ্রিত অবিদ্যা থেকে জগতের উৎপত্তি হলে, প্রত্যেক জীবের জগৎ ভিন্ন ভিন্ন হবে; কিন্তু বাস্তবত সকল জীবের কাছে জগৎ একইভাবে প্রতিভাত। এজন্য জগতের উৎপত্তির কারণ স্বরূপ, জীবাশ্রিত অবিদ্যার পরিবর্তে এক সাধারণ অবিদ্যার স্বীকার করতে হয়। জীবাশ্রিত অবিদ্যা হচ্ছে তুলাবিদ্যা, আর সাধারণ অবিদ্যা হচ্ছে মূলাবিদ্যা। এই সাধারন অবিদ্যা অর্থাৎ মুলাবিদ্যাকেই শঙ্কর ঈশ্বরের ‘মায়াশক্তি’ বলেছেন। কাজেই জীবাশ্রিত অবিদ্যার পরিবর্তে ব্রহ্মাশ্রিত মায়াকেই জগতের কারনরূপে গণ্য করা অধিকতর যুক্তিযুক্ত।
২) মায়া ত্রিগুণাত্মক: সাংখ্য দার্শনিকদের ত্রিগুনা প্রকৃতি ন্যায় মায়া জড়াত্মক, সক্রিয় ও পরিণামী। উপনিষদে ও মায়াকে ‘ত্রিগুনাত্মক প্রকৃতি’ বলা হয়েছে- ‘মায়াম্ তু প্রকৃতিম্ বিদ্যাৎ’ । সাংখ্যের প্রকৃতি থেকে যেমন জগতের উৎপত্তি মায়া থেকেও তেমনি জগতের উৎপত্তি। পার্থক্য হল – সাংখ্যমতে জগৎ প্রকৃতির পরিণাম এবং পরিণামী জগতের পশ্চাতে মূল প্রকৃতির সৎ বস্তু। সাংখ্য দ্বৈতবাদী। সাংখ্য মতে জগতের মূল তত্ত্ব দুটি-পুরুষ (আত্মা) ও প্রকৃতি(জড়)। অদ্বৈতবাদী শংকরের মতে, প্রকৃতিসম মায়ার কোনো স্বতন্ত্র সত্তা নেই। ব্রহ্মই একমাত্র সদ্বস্তু এবং মায়া এক শক্তি ভিন্ন অন্য কিছু নয়।
৩)মায়া জ্ঞানবিরোধী: মায়ার প্রভাবে বদ্ধ জীব তার অজ্ঞানবশত মায়া সৃষ্ট জগতকেই সত্য মনে করে। মায়া – উপহিত ব্রহ্ম অর্থাৎ ঈশ্বর, মায়াশক্তি দ্বারা বহু বিচিত্র জগৎ রচনা করেন এবং অজ্ঞান বা অবিদ্যাবশত বদ্ধ জীব সেই জগতকে সত্য বলে মনে করে। কাজেই, বদ্ধ জীবের কাছে মায়া জ্ঞান বিরোধী। মায়া সত্যের স্বরূপ আবৃত করে মিথ্যাকে প্রকাশিত করে, ব্রহ্মের স্বরূপ আবৃত করে জগৎ-প্রপঞ্চকের প্রকাশিত করে। যতক্ষণ মায়ার প্রভাব ততক্ষণই জগতের অস্তিত্ব। ব্রহ্ম জ্ঞানে মায়া তিরোহিত হয়, অবিদ্যার নাশ হলে এবং জগত ও মরীচিকার ন্যায় বিলীন হবে। ব্রহ্মজ্ঞানীর কাছে মায়াময় জগত নেই, মায়াধীশ ঈশ্বরও নেই, আছে কেবল নির্গুণ অসঙ্গ ব্রহ্ম।
৪) মায়া ভাবরূপ : মায়া কেবল অভাবের সূচক নয়, ভাবেরও সূচক; মায়া কেবল অজ্ঞান-সূচক নয় জ্ঞানসূচকও বটে। মায়া শক্তির বা অজ্ঞানের যে দুটি দিক আছে তার একটি অভাবাত্মক হলেও অন্যটি ভাবাত্মক। মায়ার বা অজ্ঞানের দুটি দিক হলো – আবরণ ও বিক্ষেপ। প্রথমটি অভাবাত্মক, দ্বিতীয়টি ভাবাত্মক। মায়া সৎ অধিষ্ঠান ব্রহ্মকে আবৃত করে। এটা অভাবাত্মক দিক। আবার মায়া সৎ অধিষ্ঠানে (ব্রহ্মস্থলে) মিথ্যা জগতকে আরোপ(বিক্ষেপ) করে। এটা ভাবাত্মক দিক। আবরণের দিক থেকে মায়া ‘জ্ঞানাভাব’। বিক্ষেপের দিক থেকে মায়া ‘ মিথ্যাজ্ঞান’। কাজেই মায়া যুগপৎ জ্ঞানভাব ও মিথ্যাজ্ঞান। ‘ মিথ্যাজ্ঞান’ জ্ঞানের অভাব নয়। মিথ্যাজ্ঞান হল- এক বস্তুর স্থলে অন্য বস্তুর জ্ঞান- ব্রহ্মের স্থলে জগতের জ্ঞান।
৫) মায়া যদকিঞ্চিত: মায়া সদসদবিলক্ষণ অনির্বচনীয় হলেও মায়া নিছক শূন্য নয়, মায়া ‘ একটাকিছু ‘ অর্থাৎ ‘যদকিঞ্চিৎ ‘। মায়াময় জগত ব্রহ্মের বিবর্তন হলেও তা নিছক শূন্য নয় তা একটা কিছু। মায়াময় জগত প্রপঞ্চের পারমার্থিক সত্তা না থাকলেও তার ব্যবহারিক সত্তা আছে। উপনিষদে মায়াকে ‘ অঘটন-ঘটন পটিয়সী – শক্তি বলা হয়েছে। এই অঘটন-ঘটন পটিয়সী – শক্তি দ্বারা সৃষ্ট জগত মিথ্যা হলেও তা ‘ একটাকিছু ‘। ‘ মিথ্যা ‘, ‘ অলীক ‘ থেকে ভিন্ন। ‘ অলীক ‘ কোনকিছুই নয়, কিন্তু ‘ মিথ্যা ‘ একটা কিছু।
মায়ার স্বরূপ লক্ষণে ‘ ইতি ‘ অর্থে (যদকিঞ্চিদিতি) ‘ ইত্যাদি ‘ অর্থাৎ মায়ার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলি নিম্নরূপ –
৬) মায়া জ্ঞান – নিরাস্য : জ্ঞানের উদয় হলে মায়ার নিরাশ হয়, অর্থাৎ মায়ার আর কার্যকারিতা থাকে না। জ্ঞানের উদয় হলে মায়া অন্তর্হিত হয়, বিদ্যার আবির্ভাব হলে অবিদ্যার নাশ হয়। অধিষ্ঠানের জ্ঞান হলে মায়ার আর কোন কার্যকারিতা থাকে না। অধিষ্ঠান রজ্জুর জ্ঞান হলে সর্পভ্রম অন্তর্হিত হয়। ব্রহ্ম জ্ঞানে জগৎ – প্রপঞ্চ অন্তর্হিত হয়।
৭) মায়া অনাদি কিন্তু অন্তবিশিষ্ট : মায়ার উৎপত্তিকাল নির্ণয় করা যায় না। মায়া তাই অনাদি। ব্রহ্ম জ্ঞানে মায়া অন্তর্হিত হয়, অজ্ঞান বা অবিদ্যার নাশ হয়। মায়া তাই অন্তবিশিষ্ট।

৮) ব্রহ্মই মায়ার আশ্রয় ও বিষয় : মায়া শক্তি নিরালম্ব থাকতে পারে না। আবার তা অলীক বস্তুকেও আশ্রয় করে থাকতে পারে না। যা অলীক তা কোনো কিছুর আশ্রয় নয়। ব্রহ্মই একমাত্র সৎ। বোম্বাই মায়ায় কাজে এই ব্রহ্মই মায়ার আশ্রয় ও বিষয়। ব্রহ্ম মায়ার আশ্রয় হলেও মায়া শক্তির দ্বারা তিনি কিছু মাত্র প্রভাবিত হন না। জাদুকর যেমন তার মায়াজালে নিজে আবদ্ধ হন না, অমানিশার কৃষ্ণবর্ণ যেমন বর্ণহীন আকাশকে স্পর্শ করে না, তেমনই ব্রহ্মকেও মায়া স্পর্শ করতে পারে না। ব্রহ্মা মায়ার আশ্রয় ও বিষয় হলেও মায়া শক্তির দ্বারা অপরিনামী ব্রহ্মের কোনো পরিবর্তন হয়না। বদ্ধ জীবই কেবল মায়া শক্তির প্রভাবে ব্রহ্মের বিবর্ত জগতকে সত্য বলে মনে করে, জাদুকরের মায়াজালে যেমন দর্শকবৃন্দ প্রতারিত হয়ে একটু মুদ্রার স্থলে দশটি মুদ্রাকে সত্য বলে মনে করে ।।
উপসংহার : সুতরাং বলা যায়, শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে একটি গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ হলেও এর বিরুদ্ধে বহু দার্শনিক আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে মায়ার অস্তিত্ব, আশ্রয়, ব্রহ্মের সঙ্গে সম্পর্ক এবং জগতের বাস্তবতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবুও ব্রহ্ম ও জগতের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার
থেলিসের মতে, মূল উপাদান কী? এই প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য আলোচনা কর।
উত্তর— পাশ্চাত্য দর্শনের জনক থেলিসের মতে, পৃথিবীর মূল উপাদান হল জল। গ্রিক দার্শনিকদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন দার্শনিক হলেন থেলিস। থেলিসের দার্শনিক চিন্তার মূলে রয়েছে ২টি মূল তত্ত্ব, যথা—
ক. জগতে যাবতীয় বস্তুর আদি কারণ হল জল। জল থেকেই সমস্ত কিছুর উৎপত্তি এবং জলেই সবকিছুর পরিণতি।
খ. পৃথিবী একটি সমতল থালার মতো, যা জলের ওপর ভাসমান।
থেলিস ছিলেন মাইলেশীয় সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান দার্শনিক। তিনি প্রথম দার্শনিক যিনি পৌরাণিক কাহিনি বা ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তি ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিশ্বজগতের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। এই কারণে তাঁকে পাশ্চাত্য দর্শনের প্রথম দার্শনিক এবং বিজ্ঞানসম্মত চিন্তার পথিকৃৎ বলা হয়।
থেলিসের দ্বিতীয় বক্তব্যটির তুলনায় প্রথম বক্তব্যটি নানা কারণে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁর জলকে মূল উপাদান হিসেবে গ্রহণ করার ধারণার মধ্যেই পরবর্তী পাশ্চাত্য দর্শনের মূল প্রশ্ন— “জগতের আদি কারণ কী?”— এর সূচনা হয়েছিল। তাঁর এই অনুসন্ধানই পরবর্তী দার্শনিকদের মূল উপাদান সম্পর্কে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে।
1️⃣ প্রথমত : জল থেকেই সবকিছুর উৎপত্তি— থেলিসের এই বক্তব্য আজকের দিনে সকলের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হলেও একেবারে অবাস্তব নয়। পৌরাণিকতা এবং মানবজগতে দেবদেবীর কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা না করে প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সাহায্যেই বিশ্বজগতকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
থেলিসের সবচেয়ে বড় অবদান হল, তিনি জগতের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অতিপ্রাকৃত শক্তির পরিবর্তে প্রাকৃতিক কারণ অনুসন্ধান করেছিলেন। তাঁর মতে, প্রকৃতির সমস্ত পরিবর্তনের পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। যদিও আধুনিক বিজ্ঞানের বিচারে জলকে সমস্ত বস্তুর একমাত্র উপাদান বলা যায় না, তবুও যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যার সূচনা হিসেবে তাঁর মতবাদের গুরুত্ব অপরিসীম।
2️⃣ দ্বিতীয়ত : থেলিসের দর্শনে বিশ্বজগতের বহুত্বের মূলে যে একটি মাত্র মূল কারণ বা তত্ত্বের উপস্থিতি রয়েছে, সেই বিষয়টি প্রকাশ করেই প্রাক্-সক্রেটিস দর্শনের আলোচনার গতি ও প্রকৃতি নির্দেশ করেছিলেন। কারণ প্রাক্-সক্রেটিস যুগে আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল বিশ্বের বহুত্বের মূলে একটি মাত্র আদি কারণের উপস্থিতি।
প্রাক্-সক্রেটিস দার্শনিকদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল জগতের বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে যে ঐক্য রয়েছে তার সন্ধান করা। থেলিস প্রথম দেখিয়েছিলেন যে, বাহ্যিকভাবে জগতে নানা ধরনের বস্তু দেখা গেলেও তাদের পেছনে একটি মৌলিক উপাদান থাকতে পারে। এই চিন্তাই পরবর্তীকালে অ্যানাক্সিম্যান্ডার, অ্যানাক্সিমিনিস প্রমুখ দার্শনিকদের চিন্তাকে প্রভাবিত করে।
3️⃣ তৃতীয়ত : থেলিসের দার্শনিক বক্তব্য এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, তিনি বিশ্বজগতের ঐক্য (Unity of the World) সম্পর্কে ধারণা করেছিলেন।
থেলিস মনে করেছিলেন যে, জগতের সমস্ত বৈচিত্র্যের মধ্যে একটি মৌলিক ঐক্য রয়েছে। বিভিন্ন বস্তু আসলে একই মূল উপাদানের বিভিন্ন প্রকাশ মাত্র। এই ধারণার মাধ্যমে তিনি বিশ্বকে একটি সুসংবদ্ধ ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছিলেন।
4️⃣ চতুর্থত : অনেক ক্ষেত্রে সঠিক উত্তর দিতে না পারা সত্ত্বেও শুধুমাত্র প্রশ্ন উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে কৃতিত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। থেলিসের ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য। বার্নেট বলেন, থেলিস যে বিশেষ উক্তিটি করেছিলেন, তার মধ্যে তাঁর প্রতিভার পরিচয় নিহিত রয়েছে। কারণ থেলিসের পরবর্তী সময়ে “সমস্ত কিছু একটি সত্তা থেকে নিঃসৃত কিনা?”— এই প্রশ্নটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছিল।
থেলিস হয়তো জগতের প্রকৃত মূল উপাদান সম্পর্কে সম্পূর্ণ সঠিক উত্তর দিতে পারেননি, কিন্তু তিনি যে প্রশ্নের সূচনা করেছিলেন সেটিই দর্শনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো বিষয়ের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি সঠিক প্রশ্ন উত্থাপন করাও একজন প্রকৃত দার্শনিকের বৈশিষ্ট্য।
5️⃣ পঞ্চমত : থেলিসের দার্শনিক মতবাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল এই যে, তিনি বস্তুসমূহকে একটি প্রাথমিক ও মূল উপাদানের বিভিন্ন রূপ হিসেবে ধারণা করেছেন। প্রথম গ্রিক দার্শনিক হওয়ার কৃতিত্ব থেলিস একমাত্র অর্জন করেছেন।
থেলিসের এই ধারণার মাধ্যমে বস্তুজগতের মধ্যে কারণ ও কার্য সম্পর্ক অনুসন্ধানের একটি নতুন পথ তৈরি হয়। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, জগতের সমস্ত পরিবর্তনের পেছনে একটি স্থায়ী মূল উপাদান থাকা সম্ভব। এই চিন্তা পরবর্তী গ্রিক দর্শনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
থেলিসের জলতত্ত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি জগতের উৎপত্তিকে কোনো দেবতার ইচ্ছার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেননি। বরং তিনি প্রকৃতির মধ্যেই জগতের উৎপত্তির কারণ অনুসন্ধান করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালে বৈজ্ঞানিক চিন্তার বিকাশে সহায়তা করে।
তবে থেলিসের মতবাদের কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। তিনি কেন জলকেই একমাত্র মূল উপাদান হিসেবে গ্রহণ করলেন তার সম্পূর্ণ যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি। এছাড়া আগুন, বায়ু ও মাটির মতো অন্যান্য উপাদানের গুরুত্বও তিনি যথাযথভাবে বিবেচনা করেননি। তবুও তাঁর চিন্তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

সুতরাং বলা যায়, থেলিসের “জলই জগতের আদি উপাদান”— এই মতবাদ আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য না হলেও দর্শনের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। কারণ তাঁর মাধ্যমেই প্রথমবার মানুষ পৌরাণিক ব্যাখ্যার পরিবর্তে যুক্তি ও প্রাকৃতিক কারণের সাহায্যে বিশ্বজগতকে বোঝার চেষ্টা করে। তাই থেলিসকে পাশ্চাত্য দর্শনের সূচনাকারী এবং প্রাকৃতিক দর্শনের প্রথম পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
উপসংহার : সুতরাং বলা যায়, থেলিসের “জলই জগতের আদি উপাদান” এই মতবাদ আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য না হলেও পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ তিনি প্রথমবার পৌরাণিক কাহিনি ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার পরিবর্তে প্রাকৃতিক উপাদানের মাধ্যমে বিশ্বজগতের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর এই চিন্তার মধ্য দিয়েই যুক্তিনির্ভর ও অনুসন্ধানমূলক দর্শনের সূচনা হয়।
থেলিসের মূল উপাদান তত্ত্ব পরবর্তী দার্শনিকদের একক মূল কারণ বা আদি উপাদান অনুসন্ধানের পথ দেখিয়েছিল। তাই তাঁর মতবাদ শুধু “জল” সম্পর্কিত একটি ধারণা নয়, বরং এটি ছিল প্রকৃতি, জগৎ এবং অস্তিত্বের মূল রহস্য অনুসন্ধানের এক গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রচেষ্টা। এই কারণে থেলিসকে পাশ্চাত্য দর্শনের প্রথম পথপ্রদর্শক এবং প্রাকৃতিক দর্শনের জনক হিসেবে স্মরণ করা হয়।
প্রশ্ন : পারমিনাইডিসের সত্তাতত্ত্ব আলোচনা কর।
উত্তর— গ্রিক দার্শনিকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম দার্শনিক হলেন পারমিনাইডিস। তিনি প্রাক্-সক্রেটিস যুগের একজন গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ছিলেন। তিনি একটি কাব্য রচনা করেছিলেন এবং এই কাব্যেই তিনি তাঁর দর্শনের বিবরণ দিয়েছেন। তিনি এই কাব্যটিকে দুটি অংশে ভাগ করেছেন। প্রথম অংশে তিনি বর্ণনা করেছেন ‘জগতের সত্যতা বা সত্যের বর্ণনা’ এবং দ্বিতীয় অংশে বর্ণনা করেছেন ‘ভ্রান্ত বিশ্বাসের বর্ণনা’। এই প্রথম অংশ অর্থাৎ সত্যের বর্ণনায় তিনি তাঁর দার্শনিক মতবাদ ব্যক্ত করেছেন।
তিনি তাঁর মতবাদকে এইভাবে প্রকাশ করেছেন— “যাহাই অস্তিত্বশীল তাহাই সত্তা এবং যাহা অস্তিত্বশীল নয় তাহাই অসত্তা; আর এই অসত্তা অচিন্তনীয়।”
তিনি বলেন যে, সত্তার বিপরীত হল অসত্তা এবং অসত্তার বিপরীত হল শূন্যতা। পারমিনাইডিসের মতে, এই শূন্যতাই হল মিথ্যা। তাঁর মতে, এই শূন্যতাকে কখনো চিন্তা করা যায় না। তাই যা কিছু চিন্তা করা যায়, তাই হল সত্তা এবং এই সত্তা সবসময় অস্তিত্বশীল, অপরিবর্তনীয় এবং অপরিণামী।
পারমিনাইডিসের দর্শনের মূল বিষয় হল সত্তা বা Being-এর প্রকৃতি নির্ণয় করা। তাঁর মতে, প্রকৃত দর্শনের কাজ হল ইন্দ্রিয়ের দ্বারা প্রাপ্ত জ্ঞানকে অনুসরণ না করে যুক্তির মাধ্যমে চরম সত্যকে উপলব্ধি করা। তিনি মনে করেন যে, ইন্দ্রিয় আমাদের যে জগতের ধারণা দেয় তা পরিবর্তনশীল এবং তাই তা প্রকৃত সত্য নয়। একমাত্র বিচারবুদ্ধির মাধ্যমে উপলব্ধ সত্তাই হল চূড়ান্ত সত্য।
তাঁর মতে, এই জগতের সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। যা ক্ষণস্থায়ী তাই পরিবর্তনশীল। কোনো কিছু এই মুহূর্তে আছে, আবার পরমুহূর্তে তা নেই। তিনি বলেন, পরিবর্তনশীল বিষয় সম্পর্কে কখনো যথার্থ জ্ঞান লাভ করা যায় না। যা পরিবর্তনশীল, তার মধ্যে যে স্থায়ী সত্তা রয়েছে তাকে জানার জন্যই তিনি সত্তা ও অসত্তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
পারমিনাইডিসের মতে, যদি কোনো বস্তুর উৎপত্তি হয়, তাহলে প্রশ্ন আসে সেটি কোথা থেকে উৎপন্ন হল। যদি বলা হয় অসত্তা থেকে উৎপন্ন হয়েছে, তাহলে অসত্তার অস্তিত্ব স্বীকার করতে হয়। কিন্তু অসত্তার কোনো অস্তিত্ব নেই। আবার যদি বলা হয় অন্য কোনো সত্তা থেকে উৎপন্ন হয়েছে, তাহলেও সেই সত্তার পূর্ব অস্তিত্ব স্বীকার করতে হয়। তাই প্রকৃত সত্তার কোনো সৃষ্টি নেই এবং তার কোনো ধ্বংসও নেই।
তাঁর মতে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ হল অবাস্তব। তিনি মনে করেন যে, ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমরা যে জগতকে জানি সেই জগৎ হল মিথ্যার অবভাস মাত্র, অনেকটা ইন্দ্রজালের মতো। এটি হল অসত্তার জগৎ। অপরপক্ষে, যে সত্তা হল সত্য ও যথার্থ, তাকে আমরা চিন্তার মাধ্যমে জানতে পারি। অর্থাৎ সত্যকে জানা যায় বিচার ও বুদ্ধির মাধ্যমে। এক কথায়, তাঁর মতে সত্তাকে জানার একমাত্র উপায় হল বিচারবুদ্ধি।
পারমিনাইডিসের মতে, প্রকৃত সত্তার কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমত, সত্তা হল এক ও অদ্বিতীয়। কারণ যদি সত্তার মধ্যে একাধিক ভাগ থাকে, তাহলে তার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হবে এবং তার ঐক্য নষ্ট হবে। দ্বিতীয়ত, সত্তা হল চিরন্তন। কারণ যা সত্যিকার অর্থে বিদ্যমান তার শুরু বা শেষ থাকতে পারে না। তৃতীয়ত, সত্তা অপরিবর্তনীয়, কারণ পরিবর্তন স্বীকার করলে অসত্তার অস্তিত্ব মেনে নিতে হয়।
পারমিনাইডিস মনে করেন যে, মানুষের জ্ঞান দুই ধরনের— একটি হল সত্যের পথ এবং অপরটি হল মতামতের পথ। সত্যের পথ হল যুক্তি ও বিচারবুদ্ধির পথ, যেখানে প্রকৃত সত্তাকে জানা যায়। আর মতামতের পথ হল ইন্দ্রিয়নির্ভর পথ, যেখানে মানুষ পরিবর্তনশীল জগতকে সত্য বলে মনে করে।
পারমিনাইডিসের সত্তাতত্ত্ব হেরাক্লিটাসের পরিবর্তনবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। হেরাক্লিটাস মনে করতেন যে, জগৎ সর্বদা পরিবর্তনশীল এবং পরিবর্তনই হল জগতের প্রকৃত নিয়ম। কিন্তু পারমিনাইডিস বলেন, পরিবর্তন প্রকৃত সত্য নয়; এটি ইন্দ্রিয়ের ভ্রম মাত্র। প্রকৃত সত্য হল অপরিবর্তনীয় সত্তা।

তবে পারমিনাইডিসের মতবাদের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, তিনি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বাস্তবতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি। আমরা প্রত্যক্ষভাবে পরিবর্তন, উৎপত্তি ও ধ্বংসের অভিজ্ঞতা লাভ করি, কিন্তু পারমিনাইডিস এগুলিকে সম্পূর্ণ ভ্রম বলে ব্যাখ্যা করেছেন। ফলে তাঁর দর্শন অতিরিক্ত যুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
তবুও দর্শনের ইতিহাসে পারমিনাইডিসের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ তিনি প্রথমবারের মতো “বাস্তবতা কী?”— এই মৌলিক দার্শনিক প্রশ্নের গভীর আলোচনা করেন। তাঁর সত্তাতত্ত্ব পরবর্তীকালে প্লেটো, অ্যারিস্টটল এবং অন্যান্য দার্শনিকদের চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
সুতরাং বলা যায়, পারমিনাইডিসের সত্তাতত্ত্ব হল পাশ্চাত্য দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিবিদ্যাগত মতবাদ। যদিও তাঁর মতবাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবুও একমাত্র সত্তাকে চরম সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে তিনি দর্শনে যুক্তি, চিন্তা ও বাস্তবতার অনুসন্ধানের এক নতুন পথ তৈরি করেছিলেন।
উপসংহার : পারমিনাইডিসের সত্তাতত্ত্ব পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মতবাদ। তাঁর মতে, একমাত্র সত্তাই সত্য, কারণ যা অস্তিত্বশীল নয় তাকে চিন্তা করা যায় না। তিনি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পরিবর্তনশীল জগতের পরিবর্তে চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় ও অভিন্ন সত্তাকে প্রকৃত বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। যদিও তাঁর মতবাদে পরিবর্তনশীল জগতের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়েছে, তবুও সত্যের অনুসন্ধানে যুক্তির গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য পারমিনাইডিসের অবদান অসাধারণ। তাই তাঁকে পাশ্চাত্য অধিবিদ্যার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রশ্নঃ প্লেটোর মতে, মঙ্গল কী? মঙ্গলের ধারণা ব্যাখ্যা কর।
উঃ- প্লেটোর মতে, মঙ্গল বা উত্তম হলো সর্বোচ্চ সত্তা, যা অন্য সব ধারণার ধারক বা নিয়ামক। প্লেটোর মতে, মঙ্গলের ধারণা হলো চরম সত্য। এই মঙ্গলের ধারণা অন্যান্য ধারণাসমূহের ধারক এবং সমগ্র বিশ্বের ভিত্তি।
প্লেটোর দর্শনের মূল ভিত্তি হলো ধারণাবাদ (Theory of Ideas)। তাঁর মতে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের সমস্ত বস্তু পরিবর্তনশীল ও অসম্পূর্ণ, কিন্তু ধারণার জগত চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় এবং প্রকৃত সত্যের অধিকারী। এই ধারণা জগতের সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে মঙ্গলের ধারণা। তাই প্লেটোর মতে, মঙ্গল হলো সকল অস্তিত্ব, জ্ঞান ও সত্যের চূড়ান্ত উৎস।
প্লেটোর মঙ্গলের ধারণা : প্লেটোর মতে, ধারণা জগত বহু। এক একটি ধারণা হলো এক একটি সম্পূর্ণ সত্তা। এই ধারণাগুলি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এই সম্পর্কটি ঐক্যবদ্ধ সংগঠনের বিভিন্ন অঙ্গের মতো। একটি ধারণা যেমন বহু বিশেষ বস্তুকে সাধারণ উপাদান হিসেবে ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ করে, তেমনি অন্যান্য নিম্নমানবিশিষ্ট ধারণাগুলিও এক ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ হয়, যা উচ্চমানবিশিষ্ট ধর্মের সঙ্গে যুক্ত।
প্লেটোর মতে, ধারণাগুলির মধ্যে একটি সুসংগঠিত ক্রম বা শ্রেণিবিন্যাস রয়েছে। নিম্নস্তরের ধারণাগুলি উচ্চস্তরের ধারণার উপর নির্ভরশীল এবং সমস্ত ধারণা ধীরে ধীরে একটি সর্বোচ্চ ধারণার দিকে অগ্রসর হয়। এই ধারাবাহিকতার সর্বোচ্চ পর্যায় হলো মঙ্গলের ধারণা।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, লোহিত বর্ণ, শ্বেত বর্ণ প্রভৃতি নিম্নমানের ধারণাগুলি উচ্চমানবিশিষ্ট “বর্ণ”-এর সাধারণ ধারণার অন্তর্ভুক্ত হয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকে। আবার বর্ণ, স্বাদ, গন্ধ প্রভৃতি ধারণাগুলি বৃহত্তর ধারণা “গুণ”-এর অন্তর্ভুক্ত হয়। একইভাবে ভাবজগতের ধারণাসমূহের মধ্যে যা নিম্নমানবিশিষ্ট, তা উচ্চমানবিশিষ্ট ধারণার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পর্যায়ক্রমে একটি অতি বৃহৎ স্তম্ভ বা পিরামিড গঠন করে।
এই ধারণার পিরামিডের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থান করে মঙ্গলের ধারণা। অন্যান্য সমস্ত ধারণা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মঙ্গলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মঙ্গল ছাড়া অন্য কোনো ধারণার পূর্ণ অর্থ বা মূল্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।
এই স্তম্ভ বা পিরামিডের সর্বোচ্চ মানবিশিষ্ট যে ধারণা, তাকে মঙ্গলের ধারণা বা উত্তমের ধারণা (The Idea of the Good) বলা হয়। অন্যান্য ধারণাগুলি এই মঙ্গলের ধারণার সঙ্গে এক ঐক্যবদ্ধ সূত্রে আবদ্ধ থাকে।
প্লেটোর মতে, মঙ্গল হলো সমস্ত ধারণার নিয়ামক। যেমন একটি রাষ্ট্রের সমস্ত কার্যকলাপ একটি মূল নীতির দ্বারা পরিচালিত হয়, তেমনি ধারণা জগতের সমস্ত ধারণা মঙ্গলের দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়।
প্লেটোর মতে, মঙ্গলের ধারণা হলো পরম সত্য, যা সমস্ত সত্তার ভিত্তি। প্লেটো তাঁর মঙ্গলের ধারণাকে ঈশ্বরের ধারণার সমতুল্য মনে করেছেন। প্লেটো তাঁর “Republic” গ্রন্থে মঙ্গলের ধারণাকে সূর্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সূর্য যেমন দৃশ্যমান জগতের শক্তির উৎস, তেমনি মঙ্গল হলো সকল জ্ঞান ও সত্যের উৎস।
প্লেটোর সূর্যের উপমা মঙ্গলের ধারণাকে বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সূর্যের আলো যেমন আমাদের চোখকে দৃশ্যমান বস্তু দেখতে সাহায্য করে, তেমনি মঙ্গলের জ্ঞান মানুষের বুদ্ধিকে প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। তাই মঙ্গল শুধু জ্ঞানের বিষয় নয়, বরং জ্ঞান লাভের ক্ষমতারও উৎস।
প্লেটোর মতে, মানুষ সাধারণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য লাভ করতে পারে না। যুক্তি, চিন্তা ও দার্শনিক জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ ধীরে ধীরে মঙ্গলের উপলব্ধির দিকে অগ্রসর হয়। যে ব্যক্তি মঙ্গলের জ্ঞান লাভ করে, সে প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
নৈতিক জীবনের ক্ষেত্রেও মঙ্গলের ধারণার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। প্লেটোর মতে, সমস্ত নৈতিক কাজের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মঙ্গল লাভ করা। মানুষ যখন প্রকৃত মঙ্গলের জ্ঞান অর্জন করে, তখন সে ন্যায়, সত্য ও সৎ জীবনের পথে পরিচালিত হয়।

সমালোচনা : প্লেটো মঙ্গলের ধারণা সম্পর্কে যে যুক্তিগুলি দিয়েছেন, সেগুলি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। পাশ্চাত্যের দার্শনিকগণ এর বিরোধিতা করে বলেছেন—
১) প্রথমত:
প্লেটোর মতে, সর্বোচ্চ ধারণা হলো মঙ্গলের ধারণা (The Idea of the Good)। এটি চরম সত্তা এবং অপর সকল ধারণার ভিত্তি। কিন্তু প্লেটো এই সর্বোচ্চ ধারণা থেকে অপর সকল ধারণা কীভাবে নিঃসৃত হয়, তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেননি।
সমালোচকদের মতে, যদি মঙ্গলই সকল ধারণার উৎস হয়, তাহলে অন্যান্য ধারণার সঙ্গে মঙ্গলের সম্পর্ক কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, সে বিষয়ে প্লেটোর ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ।
২) দ্বিতীয়ত:
তিনি বলেন, সকল ধারণার সাধারণ ধর্ম হলো সম্পূর্ণতা। আর এই সম্পূর্ণতাই হলো সর্বোচ্চ ধারণা, যা সকল পূর্ণ ধারণার নিয়ামক। কিন্তু এই পূর্ণতার ধারণার নিয়ামক কীভাবে সম্ভব, তা তিনি উল্লেখ করেননি।
সমালোচকদের মতে, মঙ্গলকে সর্বোচ্চ পূর্ণতা হিসেবে স্বীকার করলেও সেই পূর্ণতার প্রকৃতি ও ভিত্তি সম্পর্কে প্লেটো স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারেননি।
৩) তৃতীয়ত:
প্লেটোর মতে, সকল ধারণাই পূর্ণ সত্তা; সুতরাং পূর্ণতা সর্বোচ্চ ধারণার মধ্যে বিদ্যমান। কিন্তু শ্বেত বর্ণের বিশেষ ধারণা সর্বোচ্চ মঙ্গলের ধারণার মধ্যে নিহিত নয়। আবার মঙ্গলের ধারণা যে একটি অপরিহার্য ধারণা, যা সকল ধারণার ব্যাখ্যার মূল সূত্র বা উৎস—তা প্লেটো প্রমাণ করতে পারেননি।
এছাড়াও অনেক দার্শনিক মনে করেন, মঙ্গলের ধারণাকে অতিরিক্ত বিমূর্ত করা হয়েছে। বাস্তব জীবনের নৈতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে এই ধারণার ব্যবহারিক প্রয়োগ সবসময় স্পষ্ট নয়।
তবে সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও প্লেটোর মঙ্গলের ধারণা পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব। জ্ঞান, সত্য, নৈতিকতা এবং আদর্শ জীবনের সর্বোচ্চ ভিত্তি হিসেবে মঙ্গলের যে ব্যাখ্যা প্লেটো দিয়েছেন, তা দর্শনের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে।
শ্নঃ প্লেটোকে অনুসরণ করে দ্বিজাগতিক তত্ত্বের ব্যাখ্যা কর। অথবা, প্লেটো কীভাবে ধারণা জগৎ [সামান্য] এবং বাস্তব জগৎ [বিশেষ]-এর মধ্যে পার্থক্য করেছেন তা আলোচনা কর।
উত্তরঃ- প্লেটো তাঁর দর্শনে দুটি জগতের কথা উল্লেখ করেছেন। যথা— একটি হলো দেশ ও কালের অতীত সামান্য বা ধারণার জগৎ (World of Ideas) এবং অন্যটি হলো দেশ ও কালের মধ্যে অবস্থিত বিশেষ বা বাস্তব জগৎ (ইন্দ্রিয় জগৎ)। প্লেটোর এই দুটি জগতের ধারণাই তাঁর বিখ্যাত দ্বিজাগতিক তত্ত্বের ভিত্তি। তাঁর মতে, প্রকৃত সত্যকে বুঝতে হলে এই দুই জগতের পার্থক্য উপলব্ধি করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
প্লেটোর মতে, ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমরা যে জগতকে উপলব্ধি করি তা পরিবর্তনশীল ও অসম্পূর্ণ। এই জগতের কোনো বস্তুই চিরস্থায়ী নয়। অন্যদিকে, ধারণার জগৎ হলো চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় এবং প্রকৃত বাস্তবতার জগৎ। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের সমস্ত বস্তু ধারণার জগতের অনুকরণ মাত্র।
প্লেটোর মতে, সামান্য বা ধারণার জগতের মধ্যে সকল বস্তুর আদর্শ রূপ বা মূল ধারণা অবস্থান করে। যেমন পৃথিবীর বিভিন্ন সুন্দর বস্তু পরিবর্তনশীল হলেও “সৌন্দর্যের ধারণা” চিরকাল একই থাকে। তাই ধারণার জগতই হলো প্রকৃত জ্ঞানের বিষয়।
এই দুই জগতের মধ্যে প্লেটো বেশ কিছু পার্থক্য উল্লেখ করেছেন, সেগুলি হলো—
1️⃣ প্রথমতঃ- প্লেটোর মতে, সামান্য জগৎ বুদ্ধিলব্ধ। অন্যদিকে, বিশেষ জগৎ অভিজ্ঞতালব্ধ।
প্লেটোর মতে, ধারণার জগতের জ্ঞান ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে লাভ করা যায় না; এটি শুধুমাত্র বুদ্ধি, যুক্তি ও চিন্তার মাধ্যমে উপলব্ধ হয়। কিন্তু বিশেষ বা বাস্তব জগতের জ্ঞান আমরা চোখ, কান প্রভৃতি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে লাভ করি। তাই ধারণার জগৎ হলো বুদ্ধিগ্রাহ্য এবং বাস্তব জগৎ হলো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য।
2️⃣ দ্বিতীয়তঃ- সামান্য জগৎ হল দেশ ও কালের অতীত। কিন্তু বিশেষের জগৎ দেশ ও কালেই অবস্থিত।
ধারণার জগতের কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা সময় নেই। এটি সর্বকালীন ও সর্বজনীন। কিন্তু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের সমস্ত বস্তু কোনো নির্দিষ্ট স্থান ও সময়ের মধ্যে অবস্থান করে। তাই এই জগত দেশ ও কালের দ্বারা সীমাবদ্ধ।
3️⃣ তৃতীয়তঃ- সামান্য জগৎ নিত্য কিন্তু বিশেষের জগৎ অনিত্য।
ধারণার জগতের ধারণাগুলি চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়। যেমন ন্যায়, সৌন্দর্য, মঙ্গল প্রভৃতি ধারণার কোনো পরিবর্তন হয় না। কিন্তু বাস্তব জগতের বস্তুগুলির জন্ম, পরিবর্তন ও ধ্বংস ঘটে। তাই বিশেষ জগৎ অনিত্য।
4️⃣ চতুর্থতঃ- সামান্যের জগৎ ত্রুটিহীন কিন্তু বিশেষের জগৎ ত্রুটিযুক্ত।
ধারণার জগৎ হলো পূর্ণতা ও আদর্শের জগৎ। এখানে কোনো অসম্পূর্ণতা বা ত্রুটি নেই। কিন্তু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বস্তুগুলি অসম্পূর্ণ, কারণ এগুলি ধারণার জগতের আদর্শ রূপের অপূর্ণ প্রকাশ।
5️⃣ পঞ্চমতঃ- সামান্যের জগৎ বা ধারণার জগৎ পূর্ণসত্য। কিন্তু বিশেষের জগৎ আংশিক সত্য।
প্লেটোর মতে, প্রকৃত সত্য কেবল ধারণার জগতেই বিদ্যমান। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বস্তুগুলি সত্য হলেও তা পরম সত্য নয়। কারণ তাদের অস্তিত্ব ও সত্যতা ধারণার জগতের উপর নির্ভরশীল।
6️⃣ ষষ্ঠতঃ- সামান্যের জগৎ বিশেষ জগতের উপর নির্ভরশীল নয়। কিন্তু বিশেষের জগৎ সামান্য জগতের উপর নির্ভরশীল।
ধারণার জগতের নিজস্ব স্বাধীন অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু বাস্তব জগতের বস্তুগুলি ধারণার জগতের অনুকরণ হওয়ার কারণে তাদের অস্তিত্ব ধারণার উপর নির্ভরশীল। ধারণার জগৎ না থাকলে বিশেষ জগতের বস্তুগুলির প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
7️⃣ সপ্তমতঃ- সামান্যের নিজস্ব অস্তিত্ব আছে কিন্তু বিশেষ সামান্যের প্রতিলিপি মাত্র।
প্লেটোর মতে, ধারণাগুলি স্বাধীন ও প্রকৃত অস্তিত্বসম্পন্ন। কিন্তু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বস্তুগুলি সেই ধারণার অনুকরণ বা প্রতিচ্ছবি মাত্র। যেমন পৃথিবীর সমস্ত সুন্দর বস্তু “সৌন্দর্যের ধারণা”-র অসম্পূর্ণ প্রতিরূপ।
প্লেটোর এই দ্বিজাগতিক তত্ত্ব তাঁর জ্ঞানতত্ত্বের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। তাঁর মতে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগত থেকে আমরা কেবল মতামত বা সম্ভাব্য জ্ঞান লাভ করি, কিন্তু ধারণার জগত থেকে আমরা প্রকৃত ও নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করতে পারি। তাই দার্শনিকের প্রধান কাজ হলো ইন্দ্রিয়ের সীমা অতিক্রম করে ধারণার জগতের সত্য উপলব্ধি করা।

প্লেটোর মতে, মানুষ সাধারণত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের মধ্যেই আবদ্ধ থাকে এবং এই জগতকেই একমাত্র বাস্তব বলে মনে করে। কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি যুক্তি ও দর্শনের সাহায্যে ধারণার জগতের উপলব্ধি করতে সক্ষম হন।
সুতরাং বলা যায়, প্লেটোর দ্বিজাগতিক তত্ত্বে ধারণার জগৎ হলো চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় ও পূর্ণ সত্যের জগৎ, আর বিশেষ বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ হলো পরিবর্তনশীল, অসম্পূর্ণ ও আংশিক সত্যের জগৎ। এই দুই জগতের পার্থক্যের মাধ্যমে প্লেটো তাঁর আদর্শবাদী দর্শনের মূল ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন।
কান্টের মতে, দেশ ও কাল সম্পর্কে অভিমত বা স্বরূপ ব্যাখ্যা কর।
উত্তর :- কান্ট তাঁর গ্রন্থে দেশ ও কালের স্বরূপ আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন— কোনো বিষয় বা বস্তু ইন্দ্রিয় সংবেদনের মাধ্যমে মনের সংস্পর্শে আসামাত্রই তা দেশ ও কালের আকারে অনুভূত হয়। দেশ ও কাল ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষের সাধারণ ও অপরিহার্য আকার। দেশ ও কাল সম্পর্কে কান্টের অভিমত জানার পূর্বে অভিজ্ঞতাবাদীরা দেশ ও কাল সম্পর্কে কী অভিমত প্রকাশ করেছেন, তা জানা প্রয়োজন।
অভিজ্ঞতাবাদ অনুসারে, ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা হল আমাদের মনে দেশ ও কালের ধারণার উৎপত্তির ভিত্তি। আমরা ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে খণ্ড খণ্ড দেশগত ধারণা প্রত্যক্ষ করি। বিষয়সমূহের মধ্যে দূরত্ব, আপেক্ষিক আকার, পারস্পরিক অবস্থা, কোনো নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে বিষয়গুলি কোন দিকে আছে—প্রভৃতি নানা ঘটনা আমাদের ইন্দ্রিয় অনুভূতির মধ্যেই ধরা পড়ে। তারাই দেশ-বিষয়ক প্রত্যক্ষগত বিধানের তথ্য প্রদান করে। তারপর প্রত্যক্ষগত খণ্ড খণ্ড দেশকে বুদ্ধির সাহায্যে বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ করে আমরা এক অখণ্ড ও অসীম দেশের সাধারণ ও বিমূর্ত ধারণা গঠন করে থাকি।
অভিজ্ঞতাবাদীদের মতে, দেশ ও কাল মানুষের মনের নিজস্ব কোনো জন্মগত ধারণা নয়। মানুষের ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই প্রথমে ছোট ছোট দেশগত ও কালগত ধারণার সৃষ্টি হয় এবং পরে বুদ্ধির সাহায্যে সেই বিচ্ছিন্ন ধারণাগুলিকে একত্রিত করে দেশ ও কালের সামগ্রিক ধারণা তৈরি করা হয়। অর্থাৎ অভিজ্ঞতাবাদীদের মতে, দেশ ও কালের ধারণা সম্পূর্ণভাবে অভিজ্ঞতানির্ভর।
অনুরূপ পদ্ধতিতে ইন্দ্রিয়-অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি করে অভিজ্ঞতাবাদীরা কালের ধারণাকেও ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁদের মতে, আমরা নিজের মনের মধ্যে একটির পর একটি ধারণার পরম্পরা প্রত্যক্ষ করি। আমাদের জীবন ও তার চারপাশের প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তনশীল বিষয়সমূহের সম্পর্ককে সাক্ষাৎ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই আমরা প্রত্যক্ষগত কালের পরিচয় পেয়ে থাকি। অন্যান্য সমস্ত পরিবর্তনের মূলে রয়েছে এই কাল (Time)। এইভাবে আমরা খণ্ড খণ্ড ঘটনা বা বিষয় থেকে বুদ্ধির সাহায্যে এক বিমূর্ত বা অনন্তকাল প্রবাহের ধারণা গঠন করে থাকি।
কিন্তু কান্ট অভিজ্ঞতাবাদীদের এই মতকে সম্পূর্ণ গ্রহণ করেননি। তাঁর মতে, যদি দেশ ও কাল কেবলমাত্র অভিজ্ঞতার ফল হতো, তাহলে আমরা দেশ ও কাল সম্পর্কে সার্বজনীন ও অনিবার্য জ্ঞান লাভ করতে পারতাম না। কারণ অভিজ্ঞতা সবসময় পরিবর্তনশীল এবং ব্যক্তিভেদে পৃথক হতে পারে। অথচ দেশ ও কালের ধারণা সকল মানুষের ক্ষেত্রে একই এবং অপরিহার্য।

কান্ট অভিজ্ঞতাবাদীদের উক্ত মতের বিরোধিতা করে বলেন যে, দেশ ও কালের ধারণা অভিজ্ঞতাপ্রসূত নয়; তারা অভিজ্ঞতার পূর্বতঃসিদ্ধ আকার এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিস্বরূপ। এই প্রসঙ্গে কান্ট বলেন, পূর্বতঃসিদ্ধের দুটি লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য আছে, যথা— সর্বজনীনতা ও অনিবার্যতা।
কান্টের মতে, যে জ্ঞান অভিজ্ঞতা থেকে আসে না, কিন্তু অভিজ্ঞতাকে সম্ভব করে তোলে, তাকে বলা হয় পূর্বতঃসিদ্ধ (A Priori) জ্ঞান। দেশ ও কাল এই ধরনের পূর্বতঃসিদ্ধ ধারণা। কারণ আমরা কোনো অভিজ্ঞতা লাভ করার পূর্বেই আমাদের মন দেশ ও কালের কাঠামোর মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতাকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে।
কান্ট বলেন, সকল সংবেদনই দেশ ও কালের আকারে আকারিত হয়, এজন্য দেশ ও কাল সার্বিক। অপরদিকে দেশ ও কালের রূপ বাদ দিয়ে কোনো সংবেদনই অনুভূতির বিষয় হতে পারে না। এক কথায়, দেশ ও কালের জন্যই সংবেদনের অনুভূতি সম্ভব। এই জন্য দেশ ও কাল সংবেদনের অপরিহার্য আকার।
এখানে কান্ট বোঝাতে চেয়েছেন যে, বাইরের জগত থেকে যে সমস্ত অনুভূতি আমাদের মনে আসে, তা সরাসরি জ্ঞান তৈরি করে না। প্রথমে সেই অনুভূতিগুলি দেশ ও কালের ছাঁচে (Form) গঠিত হয়, তারপর বুদ্ধির সাহায্যে তা প্রকৃত জ্ঞানে পরিণত হয়। তাই দেশ ও কালকে কান্ট মানব জ্ঞানের অপরিহার্য শর্ত বলেছেন।
কান্টকে অনুসরণ করে সংশ্লেষক ও বিশ্লেষক অবধারণের মধ্যে পার্থক্য লেখ।
উত্তর :- বিচারবাদী দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট, ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর রচিত “Critique of Pure Reason” গ্রন্থে মূলত প্রধান দুই প্রকার অবধারণ নিয়ে আলোচনা করেছেন। যথা— সংশ্লেষক অবধারণ ও বিশ্লেষক অবধারণ। অবধারণ বলতে উদ্দেশ্য ও বিধেয় ধারণার মধ্যে এক প্রকার সম্বন্ধকে বোঝায়। যেমন— “গাছের পাতা হয় সবুজ”, “৭+৫=১২”— এগুলি হল কোনো না কোনো প্রকার অবধারণ। এখানে আমাদের আলোচ্য বিষয় হল সংশ্লেষক ও বিশ্লেষক অবধারণের পার্থক্য আলোচনা করা।
কান্টের জ্ঞানতত্ত্বে অবধারণের শ্রেণিবিভাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। তাঁর মতে, মানুষের জ্ঞান কীভাবে গঠিত হয় এবং কোন জ্ঞান নতুন তথ্য প্রদান করে— তা বোঝার জন্য অবধারণের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কান্টের পূর্বে অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকরা মনে করতেন যে, সমস্ত জ্ঞানই অভিজ্ঞতা থেকে উৎপন্ন হয়। আবার বুদ্ধিবাদীরা মনে করতেন যে, বুদ্ধির সাহায্যেই প্রকৃত জ্ঞান লাভ করা যায়। কান্ট এই দুই মতের সমন্বয় সাধন করে দেখান যে, জ্ঞান গঠনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধি উভয়েরই ভূমিকা রয়েছে।
এই কারণে কান্ট অবধারণকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করেন— বিশ্লেষক অবধারণ এবং সংশ্লেষক অবধারণ। বিশ্লেষক অবধারণ কোনো ধারণার অন্তর্নিহিত অর্থ প্রকাশ করে, আর সংশ্লেষক অবধারণ নতুন তথ্য সংযোজন করে জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করে।
সংশ্লেষক অবধারণ (Synthetic Judgement): কান্টের মতে, সংশ্লেষক অবধারণ হল এমন এক প্রকার অবধারণ যেখানে বিধেয় পদের ধারণাটি উদ্দেশ্য পদের ধারণার মধ্যে সুপ্ত বা ব্যক্তরূপে নিহিত থাকে না। এখানে বিধেয় উদ্দেশ্য সম্বন্ধে নতুন তথ্য প্রদান করে থাকে। যেমন— ৭+৫=১২, এটি একটি সংশ্লেষক অবধারণ। কেননা ১২-এর ধারণাকে বিশ্লেষণ করলে কেবলমাত্র ৭+৫ পাওয়া যায় না। ৭+৫ ছাড়া অন্যভাবে যেমন— ৪+৮, ১০+২, ৬+৬, ৯+৩ প্রভৃতি দ্বারাও ১২-এর ধারণাটি পাওয়া যেতে পারে। কান্ট বলেন, সংশ্লেষক অবধারণের মধ্যে দুটি বৈশিষ্ট্য আছে। যথা— সর্বজনীনতা এবং অনিবার্যতা।
সংশ্লেষক অবধারণের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, এতে বিধেয় উদ্দেশ্যের সঙ্গে নতুন কোনো ধারণা যুক্ত করে। ফলে মানুষের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি পায়। এই কারণে সংশ্লেষক অবধারণকে জ্ঞানবর্ধক অবধারণ বলা হয়।
কান্টের মতে, সংশ্লেষক অবধারণ দুই ধরনের হতে পারে— অভিজ্ঞতালব্ধ সংশ্লেষক অবধারণ এবং পূর্বতঃসিদ্ধ সংশ্লেষক অবধারণ। অভিজ্ঞতালব্ধ সংশ্লেষক অবধারণ ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার উপর নির্ভরশীল, কিন্তু পূর্বতঃসিদ্ধ সংশ্লেষক অবধারণ অভিজ্ঞতা নিরপেক্ষ হয় এবং তবুও নতুন জ্ঞান প্রদান করে।
বিশেষ করে গণিত ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কান্ট পূর্বতঃসিদ্ধ সংশ্লেষক অবধারণের গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। যেমন— “৭+৫=১২”। এখানে ১২-এর ধারণা ৭ এবং ৫-এর ধারণার মধ্যে আগে থেকে নিহিত নেই। বরং চিন্তার সংশ্লেষণের মাধ্যমে নতুন জ্ঞান লাভ হয়।
বিশ্লেষক অবধারণ (Analytic Judgement): কান্টের মতে, বিশ্লেষক অবধারণ হল এমন এক প্রকার অবধারণ যেখানে বিধেয়ের ধারণাটি উদ্দেশ্য ধারণার মধ্যে সুপ্ত বা ব্যক্তরূপে নিহিত থাকে। এখানে বিধেয় উদ্দেশ্য সম্বন্ধে কোনো নতুন তথ্য প্রদান করে না। এক কথায় বলা যায় যে, যে অবধারণে বিধেয়ের ধারণাকে বিশ্লেষণ করলে উদ্দেশ্যের ধারণাকে পাওয়া যায়, তাই হল বিশ্লেষক অবধারণ। যেমন— “সকল মানুষ হয় বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন জীব”। এটি হল একটি বিশ্লেষক অবধারণ। কেননা বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন জীবকে বিশ্লেষণ করলে একমাত্র মানুষের ধারণাই পাওয়া যায়। এই বিশ্লেষক অবধারণের আরও একটি উদাহরণ হল “সকল গাছ হয় উদ্ভিদ”। কান্ট বলেন, এই বিশ্লেষক অবধারণ দুটি নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। যথা— বিরোধ-বাধক নীতি এবং তাদাত্ম্য নীতি।
বিশ্লেষক অবধারণের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যের মধ্যেই বিধেয়ের ধারণা পূর্ব থেকেই উপস্থিত থাকে। তাই এই ধরনের অবধারণ আমাদের নতুন কোনো জ্ঞান প্রদান করে না। বরং পূর্বস্থিত ধারণাকে স্পষ্ট ও পরিষ্কার করে।
বিশ্লেষক অবধারণের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য বাহ্যিক অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় না। শুধুমাত্র ধারণার বিশ্লেষণের মাধ্যমেই এর সত্যতা জানা যায়। যেমন— “সকল অবিবাহিত ব্যক্তি অবিবাহিত”। এখানে অবিবাহিত ব্যক্তির ধারণার মধ্যেই অবিবাহিত হওয়ার বিষয়টি নিহিত রয়েছে।
সংশ্লেষক ও বিশ্লেষক অবধারণের মধ্যে পার্থক্য: উক্ত আলোচনা থেকে আমরা সংশ্লেষক ও বিশ্লেষক অবধারণে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করতে পারি। সেগুলি হল—
প্রথমতঃ সংশ্লেষক অবধারণে বিধেয় পদকে বিশ্লেষণ করলে উদ্দেশ্য পদকে পাওয়া যায় না, তাই বিধেয় উদ্দেশ্য সম্বন্ধে নতুন তথ্য প্রদান করে। অন্যদিকে, বিশ্লেষক অবধারণে বিধেয় পদকে বিশ্লেষণ করলে উদ্দেশ্য পদকে পাওয়া যায়। তাই এক্ষেত্রে বিধেয় উদ্দেশ্য সম্বন্ধে কোনো নতুন তথ্য প্রদান করে না।
অর্থাৎ সংশ্লেষক অবধারণ জ্ঞানের সম্প্রসারণ ঘটায়, কিন্তু বিশ্লেষক অবধারণ শুধুমাত্র ধারণার ব্যাখ্যা প্রদান করে।
দ্বিতীয়তঃ সংশ্লেষক অবধারণ যেহেতু নতুন তথ্য দিয়ে থাকে সেহেতু জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে এরূপ অবধারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে। অন্যদিকে বিশ্লেষক অবধারণ যেহেতু নতুন তথ্য প্রদান করে না সেহেতু এই অবধারণ জ্ঞান গঠনের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা নেয় না।
সংশ্লেষক অবধারণের সাহায্যে বিজ্ঞান, গণিত এবং বাস্তব জগত সম্পর্কে নতুন জ্ঞান লাভ করা যায়। কিন্তু বিশ্লেষক অবধারণ কেবলমাত্র পূর্বের ধারণাকে স্পষ্ট করে।
তৃতীয়তঃ সংশ্লেষক অবধারণের দুটি বৈশিষ্ট্য আছে যথা— সর্বজনীনতা ও অনিবার্যতা। অন্যদিকে, বিশ্লেষক অবধারণের ক্ষেত্রে কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। বিশ্লেষক অবধারণ দুটি নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। যথা— বিরোধ-বাধক নীতি এবং তাদাত্ম্য নীতি।
সংশ্লেষক অবধারণের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার ভূমিকা থাকতে পারে এবং এটি জ্ঞানের বিস্তার ঘটায়। কিন্তু বিশ্লেষক অবধারণ শুধুমাত্র যুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সত্য বলে প্রমাণিত হয়।
চতুর্থতঃ সংশ্লেষক অবধারণ একটি অভিজ্ঞতালব্ধ অবধারণ কিন্তু বিশ্লেষক অবধারণ অভিজ্ঞতালব্ধ অবধারণ নয়।
তবে কান্টের মতে, সকল সংশ্লেষক অবধারণ অভিজ্ঞতালব্ধ নয়। বিশেষ করে গণিতের ক্ষেত্রে তিনি পূর্বতঃসিদ্ধ সংশ্লেষক অবধারণের কথা বলেছেন, যা অভিজ্ঞতা নিরপেক্ষ হলেও নতুন জ্ঞান প্রদান করে।
পঞ্চমতঃ সংশ্লেষক অবধারণের উদাহরণ হল— “৭+৫=১২” এবং বিশ্লেষক অবধারণের উদাহরণ হল— “সকল মানুষ হয় বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন জীব”।

কান্টের Synthetic A Priori Judgement-এর গুরুত্ব : কান্টের দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো পূর্বতঃসিদ্ধ সংশ্লেষক অবধারণের ধারণা। তাঁর মতে, গণিত ও বিজ্ঞানের বহু মৌলিক সত্য এই ধরনের অবধারণের উপর প্রতিষ্ঠিত।
পূর্বতঃসিদ্ধ সংশ্লেষক অবধারণ এমন এক ধরনের জ্ঞান, যা অভিজ্ঞতা থেকে আসে না, কিন্তু অভিজ্ঞতাকে সম্ভব করে তোলে এবং নতুন জ্ঞান প্রদান করে। এই ধারণার মাধ্যমে কান্ট অভিজ্ঞতাবাদ ও বুদ্ধিবাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছেন।
উপসংহার: সুতরাং বলা যায়, কান্টের মতে বিশ্লেষক অবধারণ যেখানে কোনো ধারণার অন্তর্নিহিত অর্থকে প্রকাশ করে, সেখানে সংশ্লেষক অবধারণ নতুন জ্ঞান প্রদান করে। বিশ্লেষক অবধারণ জ্ঞানের স্পষ্টতা বৃদ্ধি করে, আর সংশ্লেষক অবধারণ জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করে। তাই মানব জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক চিন্তার বিকাশে সংশ্লেষক ও বিশ্লেষক অবধারণ উভয়েরই গুরু
কোপারনিকাস বিপ্লব বলতে কী বোঝা? কান্টের কোপারনিকাস বিপ্লব আলোচনা কর।
উঃ- ‘বিপ্লব’ শব্দের অর্থ হল সম্পূর্ণ পরিবর্তন। কান্ট তাঁর দর্শনের জ্ঞানরাজ্যে এরূপ একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছিলেন। ঠিক যেমন জ্যোতির্বিদ কোপারনিকাস জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি সম্পূর্ণ পরিবর্তন সাধন করেছিলেন। কোপারনিকাসের মতো কান্ট তাঁর জ্ঞানরাজ্যে এক আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন বলেই কান্টের তত্ত্বকে কোপারনিকাস বিপ্লব বলা হয়।
জ্যোতির্বিদ কোপারনিকাস তৎকালীন প্রচলিত ভূকেন্দ্রিক ব্যাখ্যার পরিবর্তে সৌরকেন্দ্রিক ব্যাখ্যার প্রবর্তন করেছিলেন। ভূকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা বলতে বোঝায়— পৃথিবী স্থির এবং সূর্য পৃথিবীর চারপাশে আবর্তন করছে। অন্যদিকে, সৌরকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা বলতে বোঝায়— সূর্য স্থির এবং পৃথিবী সূর্যের চারদিকে আবর্তন করছে।
কোপারনিকাসের পূর্ববর্তী জ্যোতির্বিদরা সূর্যকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে যেতে দেখে সিদ্ধান্ত করেছিলেন যে, পৃথিবী স্থির এবং সূর্য তার চারপাশে আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীতে কোপারনিকাস প্রথম দেখালেন যে, তাদের এই সিদ্ধান্ত ভ্রান্ত। কারণ সূর্য একই স্থানে স্থির থাকে এবং পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ সূর্যের চারপাশে আবর্তন করে চলেছে। পরবর্তীকালে কোপারনিকাসের এই তত্ত্ব সত্য বলে প্রমাণিত হয়। এই মতবাদই কোপারনিকাস বিপ্লব নামে পরিচিত।
একইভাবে জ্ঞানরাজ্যে কান্ট কোপারনিকাসের মতো এক সম্পূর্ণ পরিবর্তন তথা বিপ্লব সাধন করেন। কান্টের পূর্ববর্তী দার্শনিকরা মনে করতেন যে, মানুষের জ্ঞানকে সত্য হতে হলে জ্ঞানকে বিষয়ের অনুরূপ হতে হবে। অর্থাৎ জ্ঞান বিষয় অনুযায়ী হবে। কিন্তু কান্ট তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন জ্ঞান যদি বিষয় অনুযায়ী হয় তাহলে অভিজ্ঞতা পূর্ব বা পূর্বতঃসিদ্ধ অবধারণ সম্ভব হবে না। এই মতবাদের বিরোধিতা করে কান্ট প্রকাশ করেন জ্ঞানকে সত্য হতে হলে বিষয়কে জ্ঞানের অনুরূপ হতে হবে অর্থাৎ বিষয় জ্ঞান অনুযায়ী হবে কখনোই জ্ঞান বিষয় অনুযায়ী হবে না।
কান্টের মতে, এই মতবাদ মেনে নিলে অভিজ্ঞতা পূর্ব অবধারণের ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হবে। জ্ঞান জগতে কান্টের এরূপ বক্তব্যই কোপারনিকাস বিপ্লব নামে পরিচিত।
কান্ট তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “Critique of Pure Reason” (১৭৮১ খ্রিস্টাব্দ)-এ এই কোপারনিকাস বিপ্লবের ধারণা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের জ্ঞান কীভাবে সম্ভব এবং জ্ঞান লাভের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও মনের ভূমিকা কী—তা ব্যাখ্যা করা।
কান্টের পূর্ববর্তী দর্শনে প্রধানত দুটি মতবাদ প্রচলিত ছিল— অভিজ্ঞতাবাদ এবং বুদ্ধিবাদ। অভিজ্ঞতাবাদীরা মনে করতেন যে, সমস্ত জ্ঞানের উৎস হল অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে, বুদ্ধিবাদীরা মনে করতেন যে, বুদ্ধির মাধ্যমেই প্রকৃত জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। কান্ট এই দুই মতবাদের সীমাবদ্ধতা দূর করে একটি নতুন সমন্বয়মূলক মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেন।
কান্টের মতে, জ্ঞান গঠনের ক্ষেত্রে মন কোনো নিষ্ক্রিয় মাধ্যম নয়। বাইরের বস্তু থেকে প্রাপ্ত সংবেদনকে মন তার নিজস্ব পূর্বতঃসিদ্ধ আকারের মাধ্যমে গ্রহণ করে। দেশ (Space) ও কাল (Time) হল মনের এমনই পূর্বতঃসিদ্ধ আকার, যার মাধ্যমে সমস্ত অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে প্রকাশিত হয়।
এছাড়াও বুদ্ধির বিভিন্ন শ্রেণি বা Categories-এর সাহায্যে মন সংবেদনগুলিকে সুসংগঠিত করে প্রকৃত জ্ঞান সৃষ্টি করে। অর্থাৎ বস্তু থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা এবং মনের নিজস্ব গঠন—এই উভয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমেই জ্ঞান সম্ভব হয়।

কান্টের কোপারনিকাস বিপ্লবের মূল বক্তব্য হল— জ্ঞান বস্তু অনুযায়ী তৈরি হয় না, বরং বস্তু মানুষের জ্ঞানের কাঠামোর মাধ্যমে উপলব্ধ হয়। এই কারণে কান্ট দর্শনে বিষয়ী বা মনের ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কান্টের এই মতবাদ জ্ঞানতত্ত্বে এক নতুন যুগের সূচনা করে। কারণ এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে, মানুষের মন শুধুমাত্র বাইরের জগতের প্রতিচ্ছবি গ্রহণ করে না, বরং নিজস্ব নিয়মের সাহায্যে অভিজ্ঞতাকে সংগঠিত করে।
কান্টের কোপারনিকাস বিপ্লবের গুরুত্ব হল—
প্রথমত, এটি জ্ঞানতত্ত্বে মনের সক্রিয় ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করে।
দ্বিতীয়ত, এটি অভিজ্ঞতাবাদ ও বুদ্ধিবাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে।
তৃতীয়ত, এটি দেখায় যে জ্ঞান লাভের ক্ষেত্রে বিষয়ী ও বিষয় উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
চতুর্থত, এটি আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের বিকাশে এক নতুন পথের সূচনা করে।
সুতরাং বলা যায়, কোপারনিকাস যেমন জ্যোতির্বিজ্ঞানে প্রচলিত ধারণার পরিবর্তন ঘটিয়ে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি করেছিলেন, তেমনি কান্ট জ্ঞানতত্ত্বে এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটান। মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং মনের সম্পর্ক সম্পর্কে তাঁর এই নতুন ব্যাখ্যাই দর্শনের ইতিহাসে কান্টের কোপারনিকাস বিপ্লব নামে পরিচিত।
লকের মতে, ধারণা কী? লকের সহজাত ধারণা আলোচনা কর।
অথবা, তিনি কীভাবে সহজাত ধারণাবাদ-এর খণ্ডন করেছেন আলোচনা কর।
উত্তর:- লকের মতে, আমাদের মন নিজের মধ্যে যাকে প্রত্যক্ষ করে বা যা কিছু প্রত্যক্ষণের বা চিন্তনের সাক্ষাৎ বিষয়বস্তু তাই হল ধারণা। যেমন— মনুষ্যত্বের ধারণা, টেবিলের ধারণা, সৈন্যদলের ধারণা ইত্যাদি। যেসব ধারণা জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনে প্রচ্ছন্নভাবে বিদ্যমান থাকে তাকে সহজাত ধারণা বলা হয়। যেমন— ঈশ্বর, অসীমতা, নিত্যতা প্রভৃতি ধারণা।
দর্শনের জ্ঞানতত্ত্বের আলোচনায় ধারণার উৎপত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জন লকের মতে, মানুষের সমস্ত জ্ঞানের মূল ভিত্তি হল অভিজ্ঞতা। তাঁর মতে, মানুষের মন জন্মের সময় কোনো পূর্বস্থিত জ্ঞান বা ধারণা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না। জন্মের পর ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা ও মনের নিজস্ব কার্যকলাপের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধারণার সৃষ্টি হয়।
লক তাঁর ‘Essay Concerning Human Understanding’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে সহজাত ধারণার অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছেন। তিনি যে কেবল ডেকার্তের বিরুদ্ধে সহজাত ধারণার খণ্ডন করেছেন তা নয়, যে সমস্ত দার্শনিক সহজাত ধারণার সমর্থন করেন তাঁদের সকলের বিরুদ্ধে লক মন্তব্য করেছেন। যেসব যুক্তির মাধ্যমে তিনি সহজাত ধারণা খণ্ডন করেছেন সেগুলি হল—
লকের মতে, মানুষের মন জন্মের সময় একটি শূন্য পট বা Tabula Rasa-এর মতো থাকে। অর্থাৎ জন্মের সময় মানুষের মনে কোনো নীতি, জ্ঞান বা ধারণা পূর্ব থেকে উপস্থিত থাকে না। অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই মানুষের মনে সমস্ত ধারণার উৎপত্তি হয়। তাই সহজাত ধারণার অস্তিত্ব স্বীকার করা অভিজ্ঞতার গুরুত্বকে অস্বীকার করার সমান।
প্রথমত:- সহজাত ধারণা বলে যদি কোনো ধারণা থাকত, তাহলে সেগুলি সকলের মনেই সমানভাবে বিদ্যমান থাকত। কিন্তু শিশু, নির্বোধ এবং অশিক্ষিত ব্যক্তিদের মনে সমানভাবে এই ধারণা গঠিত হয় না। কেননা ঈশ্বর, অসীমতা, নিত্যতা প্রভৃতি এই সকল সহজাত ধারণা সম্পর্কে উক্ত ব্যক্তিরা পুরোপুরি সচেতন নয়। এর থেকে লক সিদ্ধান্ত করেন যে, সহজাত ধারণা বলে কোনো কিছু নেই।
লকের এই যুক্তির মূল উদ্দেশ্য হল দেখানো যে, কোনো ধারণাকে সহজাত বলতে হলে তা সর্বজনীনভাবে মানুষের মধ্যে উপস্থিত থাকতে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, মানুষের জ্ঞান, বিশ্বাস ও চিন্তার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।
দ্বিতীয়ত:- লকের মতে, সহজাত ধারণা বলে যদি কোনো কিছু থাকত তাহলে তা সর্বজনস্বীকৃত হত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ঈশ্বর, অসীমতা, নিত্যতা প্রভৃতি বিষয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। কেননা আমরা জানি এমন কিছু ব্যক্তি আছেন, তারা যে অর্থে ঈশ্বর বা ধর্মের কথা বলেন, সেই অর্থকে অন্যান্য ব্যক্তিরা স্বীকার করেন না। কাজেই সহজাত ধারণার কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না।
লকের মতে, কোনো ধারণা যদি মানুষের জন্মগত সম্পদ হতো, তাহলে পৃথিবীর সকল মানুষ একই ধারণাকে একইভাবে গ্রহণ করত। কিন্তু বিভিন্ন সমাজ, সংস্কৃতি ও ব্যক্তির মধ্যে ধারণার পার্থক্য দেখা যায়। তাই সহজাত ধারণার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।
তৃতীয়ত:- লক বলেন, এমন কিছু ধারণা আছে যেগুলিকে আমরা প্রত্যেকে স্বীকার করি। তবুও ওই ধারণাগুলিকে সহজাত ধারণা বলা যায় না। যেমন— আগুন দহন কার্য সম্পন্ন করে, বরফ শীতলতা দিয়ে থাকে— এই জাতীয় বাক্যগুলিকে আমরা প্রত্যেকেই স্বীকার করি। তবুও এই জাতীয় বাক্যগুলিকে সহজাত ধারণা বলা যায় না।
লকের মতে, কোনো ধারণা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেই তাকে সহজাত বলা যায় না। কারণ অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেও অনেক সার্বজনীন ধারণা তৈরি হতে পারে।
চতুর্থত:- যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, জন্মের শুরু থেকে মনের মধ্যে সহজাত ধারণা উপস্থিত থাকে, কিন্তু মন তাদের সম্পর্কে সচেতন নয়, তাহলে সেগুলি আত্মবিরোধিতা বা স্ববিরোধিতা দোষে দুষ্ট হবে।

কারণ লকের মতে, কোনো ধারণা যদি মানুষের মনে থাকে কিন্তু মানুষ সেই ধারণা সম্পর্কে কোনোভাবেই সচেতন না হয়, তাহলে সেই ধারণার অস্তিত্ব স্বীকার করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
এই সকল যুক্তিগুলির ভিত্তিতে লক সিদ্ধান্ত করেন যে সহজাত ধারণা বলে কিছু নেই।
লকের মতে, মানুষের সমস্ত জ্ঞানের উৎস হল অভিজ্ঞতা। তিনি অভিজ্ঞতাকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন— ইন্দ্রিয় অনুভূতি (Sensation) এবং আত্মপ্রতিফলন (Reflection)। বাহ্যিক জগত থেকে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যে ধারণা লাভ হয় তা ইন্দ্রিয় অনুভূতি এবং মনের নিজস্ব ক্রিয়া সম্পর্কে যে ধারণা লাভ হয় তা আত্মপ্রতিফলন।
সমালোচনা:- অভিজ্ঞতাবাদী জন লক সহজাত ধারণা খণ্ডন সম্পর্কে যে সকল যুক্তিগুলি দিয়েছেন, সেগুলি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। পাশ্চাত্য দর্শনের অন্যান্য দার্শনিকগণ যেভাবে সমালোচনা করেছেন সেগুলি হল—
(ক) লকের সহজাত ধারণা বিষয়টির যথেষ্ট গুরুত্ব স্বীকার করা হলেও একথা কখনই বলা যাবে না যে তিনিই সর্বপ্রথম সহজাত ধারণা খণ্ডন করেছেন। কারণ ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মধ্যযুগের দার্শনিক সেন্ট টমাস অ্যাকুইনাস সর্বপ্রথম সহজাত ধারণার অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন।
এখানে সমালোচকরা বলতে চেয়েছেন যে, সহজাত ধারণার বিরোধিতা লকের পূর্বেও দর্শনের ইতিহাসে দেখা যায়। তাই এই ক্ষেত্রে লকের অবদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও একক নয়।
(খ) কোনো কোনো দার্শনিক বলেছেন সহজাত ধারণার অস্তিত্ব অস্বীকার করা হলেও মানুষের মনে কিছু স্বাভাবিক প্রবণতা আছে, সেগুলিকে অস্বীকার করা যায় না। কেননা সহজাত ধারণা এবং মানুষের মনের স্বাভাবিক প্রবণতা ভিন্ন বিষয় নয়। কাজেই সহজাত ধারণাকে অস্বীকার করলে জেনেটিক্যাল সায়েন্সকেও অস্বীকার করতে হবে।
এই সমালোচনার মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, মানুষের মধ্যে কিছু জন্মগত মানসিক ক্ষমতা ও প্রবণতা থাকে, যা অভিজ্ঞতার পূর্বেই বিদ্যমান।
(গ) লক যে শিশু, নির্বোধ বা অশিক্ষিতদের উদাহরণ দিয়েছেন তাও যুক্তিহীন। কারণ এদের মানসিক অবস্থা সম্বন্ধে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা অসম্ভব। কেননা যেখানে ঈশ্বর, অসীমতা ইত্যাদি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, সেখানে তাদের উত্তর সবসময় যথাযথ নাও হতে পারে।
সুতরাং লকের সহজাত ধারণা খণ্ডনের যুক্তিগুলি গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত নয়। তবুও অভিজ্ঞতাবাদী দর্শনের বিকাশে লকের এই মতবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
উপসংহারে বলা যায়, লক সহজাত ধারণার অস্তিত্ব অস্বীকার করে অভিজ্ঞতাকে জ্ঞানের প্রধান উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও তাঁর মতবাদ পরবর্তীকালে বিভিন্ন দার্শনিকের সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে, তবুও আধুনিক অভিজ্ঞতাবাদী দর্শনের ভিত্তি নির্মাণে লকের অবদান অনস্বীকার্য।
লকের মতে, মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর।
উত্তর:– পাশ্চাত্য দর্শনের অভিজ্ঞতাবাদী পুরোধা জন লক নিউটনের পদার্থবিজ্ঞান সূত্র অবলম্বন করে জড়দ্রব্যের দুটি প্রধান গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। যথা— মুখ্যগুণ ও গৌণগুণ। লকের মতে, গুণগুলি দ্রব্যকে আশ্রয় করে থাকে। লক তাঁর “An Essay Concerning Human Understanding” গ্রন্থে মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের মধ্যে যে পার্থক্যের উল্লেখ করেছেন সেগুলি হল—
মুখ্যগুণ:- লকের মতে, যা বস্তুকে আশ্রয় করে থাকে এবং যার মন নিরপেক্ষ বাস্তব অস্তিত্ব আছে তাই হল মুখ্যগুণ। এই গুণগুলি বস্তুর অপরিহার্য ও নিজস্ব গুণ। যেমন— আকার, আয়তন, গতি, বিস্তৃতি প্রভৃতি। লকের মতে, এই গুণগুলি ছাড়া কোনো বস্তুর অস্তিত্ব থাকতে পারে না। এই গুণগুলি বস্তুগত এবং অপরিবর্তনশীল।
লকের মতে, মুখ্যগুণগুলি বস্তুর মধ্যে বাস্তবভাবে অবস্থান করে এবং মানুষের মন এগুলিকে যেভাবে উপলব্ধি করুক না কেন, বস্তুর মধ্যে তাদের অস্তিত্ব অপরিবর্তিত থাকে। যেমন একটি বস্তুর নির্দিষ্ট আকার, আকৃতি বা বিস্তৃতি রয়েছে— মানুষ দেখুক বা না দেখুক, সেই গুণগুলি বস্তুর মধ্যে বিদ্যমান থাকে।
গৌণগুণ:- লকের মতে, যা বস্তুর নিজস্ব গুণ নয় এবং যা বস্তুর ধর্ম থেকে উৎপন্ন অথচ ব্যক্তি ভেদে পরিবর্তনশীল বা নির্ভরশীল, তাকেই গৌণগুণ বলা হয়। যেমন— স্বাদ, গন্ধ, বর্ণ, উষ্ণতা, শীতলতা ইত্যাদি। এই গুণগুলি ব্যক্তিগত হওয়ায় ব্যক্তিভেদে পরিবর্তনশীল হয়ে থাকে।
লকের মতে, গৌণগুণগুলি বস্তুর মধ্যে সরাসরি অবস্থান করে না। বরং বস্তুর মুখ্যগুণের প্রভাবে আমাদের মনে বিশেষ ধরনের অনুভূতি সৃষ্টি করে। যেমন— একটি ফুলের গন্ধ বা রং ফুলের নিজস্ব কোনো বস্তুগত ধর্ম নয়, বরং আমাদের ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বস্তুর সম্পর্কের ফলে এই অনুভূতির সৃষ্টি হয়।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে উভয় প্রকার গুণের মধ্যে যেসব পার্থক্যগুলি নির্ণয় করা যেতে পারে তা হল—
প্রথমতঃ মুখ্যগুণগুলি বস্তুগত, কিন্তু গৌণগুণগুলি ব্যক্তিগত।
মুখ্যগুণ বস্তুর মধ্যে বাস্তবভাবে অবস্থান করে এবং ব্যক্তির উপলব্ধির উপর নির্ভর করে না। অন্যদিকে, গৌণগুণ মানুষের ইন্দ্রিয় ও মানসিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল।
দ্বিতীয়তঃ মুখ্যগুণগুলি অপরিবর্তনশীল কিন্তু গৌণগুণগুলি ব্যক্তিভেদে পরিবর্তনশীল।
যেমন একটি বস্তুর আকার বা বিস্তৃতি সাধারণত একই থাকে, কিন্তু তার রং বা স্বাদ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিভিন্নভাবে প্রতীয়মান হতে পারে।
তৃতীয়তঃ মুখ্যগুণগুলিকে বাদ দিয়ে বস্তুর অস্তিত্ব সম্ভব নয় কিন্তু গৌণগুণগুলিকে বাদ দিয়ে বস্তুর অস্তিত্ব সম্ভব।
কারণ আকার, বিস্তৃতি প্রভৃতি বস্তুর মৌলিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু রং, স্বাদ, গন্ধ প্রভৃতি ছাড়াও বস্তু অস্তিত্বশীল থাকতে পারে।
চতুর্থতঃ মুখ্যগুণগুলি গৌণগুণের উপর নির্ভরশীল নয়। কিন্তু গৌণগুণগুলি মুখ্যগুণগুলির উপর নির্ভরশীল।
লকের মতে, গৌণগুণের উৎপত্তি মুখ্যগুণের মাধ্যমে হয়। তাই গৌণগুণের অস্তিত্ব মুখ্যগুণের উপর নির্ভর করে।
পঞ্চমতঃ আকার, আয়তন, গতি, বিস্তৃতি প্রভৃতি হল বস্তুর মুখ্যগুণ। অন্যদিকে স্বাদ, গন্ধ, বর্ণ, উষ্ণতা, শীতলতা প্রভৃতি হল বস্তুর গৌণগুণ।
লকের মতে, মুখ্যগুণগুলি জড়বস্তুর প্রকৃত ও বাস্তব বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে, আর গৌণগুণগুলি মানুষের অনুভূতির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

লকের এই মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের পার্থক্য তাঁর জ্ঞানতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে, আমাদের জ্ঞান লাভের ক্ষেত্রে বস্তু এবং মনের উভয়েরই ভূমিকা রয়েছে। যদিও পরবর্তীকালে বার্কলে প্রমুখ দার্শনিক লকের এই মতবাদের সমালোচনা করেছেন, তবুও অভিজ্ঞতাবাদী দর্শনের ইতিহাসে এই মতবাদ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
সমালোচকদের মতে, মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের মধ্যে লক যে পার্থক্য করেছেন তা সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ উভয় প্রকার গুণই কোনো না কোনোভাবে আমাদের ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানা যায়। বিশেষ করে বার্কলে মনে করেন, মুখ্যগুণও মনের উপলব্ধির বাইরে স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল নয়।
তবুও বলা যায়, জড়বস্তু ও তার গুণ সম্পর্কে লকের এই বিশ্লেষণ আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের মাধ্যমে লক বস্তুর বাস্তব অস্তিত্ব এবং মানুষের অনুভূতির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন।
প্রশ্নঃ লকের মতে দ্রব্য কী? লকের দ্রব্যতত্ত্ব আলোচনা কর।
উত্তরঃ লকের মতে, সংবেদন (Sensation) ও অন্তরদর্শন (Reflection)-এর মাধ্যমে আমরা অভিজ্ঞতা লাভ করে থাকি। তিনি বলেন, এই সংবেদন ও অন্তরদর্শনের মাধ্যমে আমরা বস্তুর বিভিন্ন গুণ সম্পর্কে জানতে পারি। কিন্তু এই গুণগুলি কখনোই শূন্যে অবস্থান করতে পারে না। গুণগুলি অবশ্যই কোনো না কোনো আধারে অবস্থান করে। গুণগুলি যে আধারে অবস্থান করে তাকেই ‘দ্রব্য’ (Substance) বলা হয়।
লকের দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি জ্ঞানতত্ত্বের আলোচনার মধ্যেই দ্রব্যতত্ত্বকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, মানুষ প্রত্যক্ষভাবে কোনো দ্রব্যকে উপলব্ধি করতে পারে না; মানুষ কেবল বস্তুর গুণগুলিকে অনুভব করতে পারে। এই গুণগুলির অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করার জন্যই একটি অদৃশ্য ও অজ্ঞাত আধারের ধারণা গ্রহণ করতে হয়, আর সেই আধারই হলো দ্রব্য।
🟧 লকের দ্রব্যতত্ত্ব সংক্ষেপে আলোচনা করা হল—
অভিজ্ঞতাবাদের জনক জন লকের মতে, ইন্দ্রিয়ানুভব বা অভিজ্ঞতাই জ্ঞান লাভের একমাত্র উৎস। তবে তাঁর মতে, আমরা সরাসরি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে কোনো বস্তুর প্রকৃত স্বরূপ জানতে পারি না। আমরা সংবেদন ও অন্তরদর্শনের মাধ্যমে ধারণা (Ideas) লাভ করি। সংবেদনের মাধ্যমে বাহ্যজগতের বস্তুর গুণাবলি সম্পর্কে ধারণা জন্মায় এবং অন্তরদর্শনের মাধ্যমে আমাদের মানসিক ক্রিয়া, চিন্তা, ইচ্ছা, সুখ, দুঃখ ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করি।
লকের মতে, মানুষের সমস্ত জ্ঞান ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ধারণা কখনোই স্বতন্ত্রভাবে সৃষ্টি হয় না; এগুলি কোনো না কোনো বস্তুর গুণের উপর নির্ভর করে। তাই গুণগুলির অস্তিত্বের জন্য একটি আশ্রয় বা ভিত্তির প্রয়োজন হয়। এই কারণেই তিনি দ্রব্যের অস্তিত্ব স্বীকার করেন।
লকের মতে, সংবেদনের মাধ্যমে আমরা বস্তুর গুণ ছাড়া আর কিছুই জানতে পারি না। কিন্তু এই গুণগুলি শূন্যে অবস্থান করতে পারে না। গুণগুলি যে আধারে অবস্থান করে, সেই আধারই হলো দ্রব্য।
এখানে লক্ষণীয় যে, লক দ্রব্যকে প্রত্যক্ষভাবে জানার দাবি করেননি। বরং তিনি বলেছেন, গুণের অস্তিত্ব থেকেই আমরা যুক্তির সাহায্যে দ্রব্যের অস্তিত্ব অনুমান করি। অর্থাৎ দ্রব্য প্রত্যক্ষ জ্ঞানের বিষয় নয়, বরং অনুমিত সত্তা।
লকের মতে দ্রব্যের ধারণার বৈশিষ্ট্য: লকের মতে, দ্রব্যের ধারণাটি একটি জটিল ধারণা (Complex Idea)। কেননা আমরা অনেকগুলি সরল ধারণা (Simple Ideas)-এর সমন্বয়ে দ্রব্যের ধারণা গঠন করি।
এর মধ্যে প্রধান বিষয়গুলি হলো—
১️⃣ প্রথমতঃ অনেকগুলি গুণের ধারণা একত্রে থাকে।
একটি বস্তু সম্পর্কে আমরা যখন রং, আকার, গন্ধ, স্পর্শ, কঠিনতা ইত্যাদি একসঙ্গে উপলব্ধি করি, তখন মনে হয় এগুলি একই বস্তুর অন্তর্গত। এই সম্মিলিত ধারণাই দ্রব্য সম্পর্কে ধারণা গঠনে সাহায্য করে।
২️⃣ দ্বিতীয়তঃ দ্রব্যের অন্তর্গত গুণগুলি স্বতন্ত্রভাবে থাকতে পারে না। ফলে গুণগুলির আশ্রয় হিসেবে একটি আধারের ধারণা গ্রহণ করতে হয়।
লকের মতে, গুণ কখনোই স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল নয়। তাই গুণগুলির ধারক হিসেবে দ্রব্যকে স্বীকার করা যুক্তিসঙ্গত।
৩️⃣ তৃতীয়তঃ কতকগুলি গুণের ধারণা একসঙ্গে যুক্ত থাকে। এই প্রসঙ্গে লক দুই প্রকার গুণের কথা উল্লেখ করেছেন। যথা—মুখ্যগুণ (Primary Qualities) ও গৌণগুণ (Secondary Qualities)।
যে গুণগুলি বস্তুর অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য এবং বস্তুর অস্তিত্বের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত থাকে, সেগুলিকে তিনি মুখ্যগুণ বলেছেন। যেমন—আকার, আয়তন, বিস্তৃতি, সংখ্যা, গতি ইত্যাদি। এই গুণগুলি বস্তুর অবিচ্ছেদ্য ধর্ম; এগুলি বাদ দিলে বস্তুর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।
মুখ্যগুণ বস্তুতে বাস্তবভাবে বিদ্যমান থাকে এবং পর্যবেক্ষকের উপর নির্ভরশীল নয়।
অন্যদিকে, যে গুণগুলি ব্যক্তিভেদে পরিবর্তিত হয় এবং পর্যবেক্ষকের ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভর করে, সেগুলিকে তিনি গৌণগুণ বলেছেন। যেমন—রং, রস, গন্ধ, শব্দ, উষ্ণতা ইত্যাদি।
গৌণগুণ বস্তুর মধ্যে প্রত্যক্ষভাবে থাকে না; বরং বস্তু ও ইন্দ্রিয়ের পারস্পরিক সম্পর্কের ফলে আমাদের মনে এই গুণগুলির ধারণা সৃষ্টি হয়।
লকের মতে, যে আধারে গুণগুলি থাকে তাই হলো দ্রব্য। লক বলেন, এই আধারকে আমরা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানতে পারি না। তাই তাঁর মতে— “দ্রব্য হলো জ্ঞাত গুণের অজ্ঞাত আধার”। এই প্রসঙ্গে তাঁর বিখ্যাত উক্তি হলো— “Know-not-what” অর্থাৎ “অজ্ঞাত তত্ত্ব”। অর্থাৎ দ্রব্য এমন এক সত্তা, যার প্রকৃত স্বরূপ আমরা জানি না, কিন্তু যার অস্তিত্ব অনুমান করতে বাধ্য হই।
এই উক্তির মাধ্যমে লক বোঝাতে চেয়েছেন যে, মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ। আমরা কেবল গুণ উপলব্ধি করি; কিন্তু গুণের অন্তর্নিহিত বাস্তব ভিত্তিকে প্রত্যক্ষ করতে পারি না।
লকের মতে দ্রব্যের প্রকারভেদ : লক বাহ্যিক জগতের দ্রব্যকে যেমন স্বীকার করেছেন, তেমনি অন্তর্জগতের মন বা আত্মা এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বও স্বীকার করেছেন। কাজেই লকের মতে দ্রব্য তিন প্রকার। যথা—
১. জড়দ্রব্য (Material Substance)
২. আত্মা বা মন (Spiritual Substance)
৩. ঈশ্বর (God)
জড়দ্রব্য বাহ্যিক বস্তুর আধার হিসেবে কাজ করে। মন বা আত্মা চিন্তা, ইচ্ছা, অনুভূতি ও চেতনার আধার। আর ঈশ্বরকে তিনি সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ সত্তা হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যিনি সমগ্র বিশ্বব্যবস্থার চূড়ান্ত কারণ।

লক মুখ্যগুণের আধার হিসেবে জড়দ্রব্যকে স্বীকার করেছেন এবং মানসিক ক্রিয়ার আধার হিসেবে মন বা আত্মাকে স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে সুখ, দুঃখ, ইচ্ছা, চিন্তা প্রভৃতি অভিজ্ঞতার আলোচনায় তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্বও স্বীকার করেছেন।
লকের দ্রব্যতত্ত্বের গুরুত্ব : লকের দ্রব্যতত্ত্ব পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী তত্ত্ব। কারণ তিনি প্রথমবার অভিজ্ঞতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দ্রব্য সম্পর্কে বিশ্লেষণ করেন। যদিও তিনি দ্রব্যকে অজ্ঞেয় বলেছেন, তবুও গুণের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করার জন্য দ্রব্যের ধারণাকে অপরিহার্য বলে মনে করেছেন। তাঁর এই মতবাদ পরবর্তীকালে বার্কলে ও হিউমের মতো দার্শনিকদের মধ্যে নতুন বিতর্কের সূচনা করে এবং আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
▶️ সমালোচনা : দ্রব্য সম্পর্কে জন লক যে সকল অভিমত প্রকাশ করেছেন, সেগুলি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তাই পাশ্চাত্য দর্শনে তাঁর দ্রব্যতত্ত্বকে বিভিন্নভাবে সমালোচনা করা হয়েছে।
(ক) অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জন লক অভিজ্ঞতাকেই জ্ঞান লাভের একমাত্র উৎস বলেছেন। অথচ তিনি আবার বলেছেন, দ্রব্য হলো জ্ঞাত গুণের অজ্ঞাত আধার। কাজেই যা অজ্ঞাত বা অজ্ঞেয়, তাকে স্বীকার করে তিনি নিজের মতবাদের মধ্যেই স্ববিরোধিতার সৃষ্টি করেছেন।
এই কারণে সমালোচকেরা বলেন, যদি সব জ্ঞান অভিজ্ঞতা থেকে আসে, তাহলে অভিজ্ঞতার বাইরে অবস্থিত একটি অজ্ঞেয় দ্রব্যের ধারণা গ্রহণ করা অভিজ্ঞতাবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
(খ) অভিজ্ঞতা বা ইন্দ্রিয়প্রত্যক্ষ যদি জ্ঞান লাভের একমাত্র পথ হয়, তাহলে অভিজ্ঞতায় কেবল গুণের ধারণাই পাওয়া যাবে। কিন্তু লক গুণের অতিরিক্ত একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে দ্রব্যকে স্বীকার করে নিজের মতবাদে অসঙ্গতির সৃষ্টি করেছেন।
এই আপত্তির ভিত্তিতেই বার্কলে বলেন, গুণের বাইরে কোনো জড়দ্রব্যের অস্তিত্ব স্বীকার করার প্রয়োজন নেই।
(গ) লক দ্রব্য ও ধারণাকে পৃথক করেছেন। কিন্তু জড়দ্রব্যের প্রকৃত স্বরূপ তিনি বিশ্লেষণ করেননি। “দ্রব্য হলো জ্ঞাত গুণের অজ্ঞাত আধার”—এই বক্তব্য দিয়ে দ্রব্যের প্রকৃতি সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করা যায় না। আবার আত্মাকে তিনি স্বতন্ত্র দ্রব্য হিসেবে স্বীকার করলেও তার অস্তিত্বের পক্ষে সুস্পষ্ট দার্শনিক যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেননি।
এছাড়া সমালোচকেরা আরও বলেন, “Know-not-what” বলে দ্রব্যকে চিহ্নিত করা আসলে সমস্যার সমাধান নয়; বরং সমস্যাটিকে অন্যভাবে প্রকাশ করা মাত্র। তাই লকের দ্রব্যতত্ত্ব আধুনিক দর্শনে ব্যাপক আলোচনার ও সমালোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বার্কলে কীভাবে বিমূর্ত সামান্য ধারণা খণ্ডন করেছেন তা আলোচনা কর।
উত্তরঃ অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জর্জ বার্কলে সামান্য ধারণাকে স্বীকার করেননি। তিনি বলেন, যাকে আমরা সামান্য ধারণা বলি তা বিশেষ বিশেষ বস্তুকে বোঝাবার একটি বিশেষ নাম মাত্র। তাঁর মতে, আমরা কোনো বিমূর্ত সামান্য ধারণার অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারি না।
তিনি বলেন, যে শব্দগুলি ব্যবহার করে বিমূর্ত ধারণাকে বোঝানো হয়, সেগুলি ব্যক্তি বা বস্তুর নিছক নাম ছাড়া আর কিছু নয়। এই কারণে বার্কলের মতে, সামান্য ধারণার কোনো স্বাধীন ও পৃথক অস্তিত্ব নেই।
বার্কলে ছিলেন একজন অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক। তাঁর মতে, মানুষের সমস্ত জ্ঞান ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার উপর নির্ভরশীল। আমরা যা প্রত্যক্ষ করি, তা সবসময় কোনো নির্দিষ্ট বা বিশেষ বস্তুকে কেন্দ্র করেই করি। তাই এমন কোনো ধারণা গ্রহণ করা যায় না, যার মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য নেই।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের মন এমন কোনো বিমূর্ত ধারণা গঠন করতে পারে না, যেগুলি বাস্তবে অস্তিত্বশীল নয়। যেমন— আমরা এমন কোনো ত্রিভুজের সামান্য ধারণা গঠন করতে পারি না যে ত্রিভুজ একই সঙ্গে আয়তাকার বা গোলাকার।
বার্কলের মতে, যখন আমরা “ত্রিভুজ” শব্দটি ব্যবহার করি, তখন আমাদের মনে কোনো নির্দিষ্ট ত্রিভুজের ধারণাই উপস্থিত হয়। কিন্তু এমন কোনো ত্রিভুজের ধারণা সম্ভব নয় যার কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই, অর্থাৎ যা একই সঙ্গে সমবাহু, সমদ্বিবাহু বা বিষমবাহু নয়।
তিনি বলেন, ভাষার ব্যবহার থেকেই বিমূর্ত-অস্তিত্বের ভ্রান্তি হয়। এককথায়, বার্কলে বিমূর্ত সামান্য ধারণার মনোগত অস্তিত্বকেও অস্বীকার করেছেন।
বার্কলের মতে, আমরা অনেক সময় শব্দের সাধারণ ব্যবহারের কারণে মনে করি যে ওই শব্দের পিছনে কোনো সাধারণ বা বিমূর্ত ধারণার অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শব্দ শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ বস্তু বা ব্যক্তিকে বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
তিনি আরও বলেন, আমরা আমাদের ব্যবহারিক প্রয়োজনে বস্তু বা ব্যক্তির নাম প্রয়োগ করে থাকি। সামান্য সম্পর্কে বার্কলের এরূপ মতবাদকে নামবাদ (Nominalism) বলা হয়।
নামবাদ অনুযায়ী, সাধারণ ধারণা বা সামান্য কোনো বাস্তব সত্তা নয়; এটি কেবলমাত্র একটি নাম বা শব্দ, যা অনেকগুলি বিশেষ বস্তুকে বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। যেমন— “মানুষ” শব্দটি কোনো পৃথক সাধারণ মানুষকে নির্দেশ করে না, বরং বিভিন্ন ব্যক্তিকে বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।

বার্কলে অবশ্য এক বিশেষ অর্থে বিমূর্ত সামান্য ধারণাকে বা ধারণার অস্তিত্বকে স্বীকার করেছেন। বিশেষ অর্থটি হল— যখন একজাতীয় বিশেষ ধারণাসমূহের প্রতিনিধিরূপে ওই ধারণাগুলি ব্যবহৃত হয়, তখন ওই বিশেষ ধারণাগুলি সামান্য ধারণারূপে পরিগণিত হয়।
অর্থাৎ বার্কলে সম্পূর্ণভাবে সামান্য ধারণার ব্যবহার অস্বীকার করেননি। তাঁর মতে, কোনো একটি বিশেষ ধারণা যদি একই শ্রেণির অন্যান্য বিশেষ ধারণার প্রতিনিধিত্ব করে, তাহলে সেটিকে সামান্য অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সুতরাং, বার্কলে বিমূর্ত সামান্য ধারণাকে সমস্ত প্রাণীর প্রতিনিধিমূলক এই অর্থে স্বীকার করেছেন।
পরিশেষে বলা যায়, বার্কলে লকের বিমূর্ত সামান্য ধারণার মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করে দেখিয়েছেন যে, মানুষের মন কোনো বৈশিষ্ট্যহীন ও বিমূর্ত ধারণা সৃষ্টি করতে পারে না। তাঁর মতে, আমাদের সমস্ত ধারণাই বিশেষ এবং সামান্য ধারণা মূলত নাম বা শব্দের উপর নির্ভরশীল। এই কারণেই বার্কলের মতবাদকে নামবাদ বলা হয়। যদিও তাঁর মতবাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সমালোচনা রয়েছে, তবুও বিমূর্ত ধারণার সমালোচনার ক্ষেত্রে বার্কলের ভূমিকা দর্শনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জর্জ বার্কলে কীভাবে বিমূর্ত সামান্য ধারণা খণ্ডন করেছেন তা আলোচনা কর।
উত্তরঃ অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক জর্জ বার্কলে সামান্য ধারণাকে স্বীকার করেননি। তিনি বলেন, যাকে আমরা সামান্য ধারণা বলি, তা বিশেষ বিশেষ বস্তুকে বোঝাবার একটি বিশেষ নাম মাত্র। তাঁর মতে, আমরা কোনো বিমূর্ত সামান্য ধারণার অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারি না।
বার্কলে ছিলেন অভিজ্ঞতাবাদী দর্শনের একজন বিশিষ্ট দার্শনিক। তিনি মনে করতেন যে মানুষের সমস্ত জ্ঞান প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে উৎপন্ন হয়। তাই এমন কোনো ধারণা, যার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করা যায় না, তার বাস্তব অস্তিত্বও স্বীকার করা যায় না। এই যুক্তির ভিত্তিতেই তিনি বিমূর্ত সামান্য ধারণার তত্ত্বের বিরোধিতা করেন।
তিনি বলেন, যে শব্দগুলি ব্যবহার করে বিমূর্ত ধারণাকে বোঝানো হয়, সেগুলি ব্যক্তি বা বস্তুর নিছক নাম ছাড়া আর কিছু নয়।
অর্থাৎ, সাধারণ শব্দের ব্যবহার দেখে আমরা মনে করি যেন একটি পৃথক সামান্য ধারণার অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু বার্কলের মতে, বাস্তবে তা নয়। ভাষার সুবিধার জন্য একই শ্রেণির বহু বিশেষ বস্তুকে একটি সাধারণ নাম দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এই সাধারণ নামের জন্য কোনো পৃথক বিমূর্ত ধারণা কল্পনা করার প্রয়োজন নেই।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের মন এমন কোনো বিমূর্ত ধারণা গঠন করতে পারে না, যেগুলি বাস্তবে অস্তিত্বশীল নয়। যেমন— আমরা এমন কোনো ত্রিভুজের সামান্য ধারণা গঠন করতে পারি না, যে ত্রিভুজ একই সঙ্গে সমবাহু, সমদ্বিবাহু বা বিষমবাহু নয়।
বার্কলের মতে, আমরা যখন “ত্রিভুজ” কল্পনা করি, তখন অবশ্যই কোনো একটি নির্দিষ্ট ত্রিভুজের কথাই ভাবি। সেটি হয় সমবাহু, নয় সমদ্বিবাহু, অথবা বিষমবাহু হবে। কিন্তু এমন একটি ত্রিভুজ কল্পনা করা সম্ভব নয়, যার কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য নেই। তাই বিমূর্ত সামান্য ধারণা মানুষের পক্ষে গঠন করা অসম্ভব।
আরও উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা “মানুষ” শব্দটি ব্যবহার করলেও আমাদের মনে সবসময় কোনো না কোনো নির্দিষ্ট মানুষের চিত্রই ভেসে ওঠে। এমন কোনো মানুষকে কল্পনা করা যায় না, যার বয়স, রং, উচ্চতা বা লিঙ্গের কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য নেই। তাই সামান্য ধারণা বাস্তবে বিমূর্ত নয়, বরং বিশেষ ধারণার মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়।
তিনি বলেন, ভাষার ব্যবহার থেকেই বিমূর্ত অস্তিত্বের ভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। এককথায়, বার্কলে বিমূর্ত সামান্য ধারণার মনোগত অস্তিত্বকেও অস্বীকার করেছেন।
বার্কলের মতে, ভাষা মানুষের চিন্তাকে সহজ করে, কিন্তু অনেক সময় ভাষাই বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একই শব্দ বহু বিশেষ বস্তুর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়ায় মানুষ ভুল করে মনে করে যে ওই শব্দের জন্য একটি পৃথক বিমূর্ত ধারণাও রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটি ভাষাগত অভ্যাসের ফল, বাস্তব কোনো মানসিক সত্তা নয়।
তিনি আরও বলেন, আমরা আমাদের ব্যবহারিক প্রয়োজনে বস্তু বা ব্যক্তির নাম প্রয়োগ করে থাকি। সামান্য সম্পর্কে বার্কলের এরূপ মতবাদকে নামবাদ (Nominalism) বলা হয়।
নামবাদ অনুসারে, সামান্য বা Universal-এর কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই। কেবল বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি বা বস্তুই বাস্তবে বিদ্যমান। সাধারণ নাম কেবল তাদের একত্রে বোঝানোর একটি মাধ্যম মাত্র। এই কারণে বার্কলের মতবাদকে নামবাদ বলা হয়।
বার্কলের এই মতবাদ মূলত জন লকের বিমূর্ত ধারণার তত্ত্বের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছিল। লক মনে করেছিলেন, মন বিশেষ ধারণা থেকে বিমূর্তকরণের মাধ্যমে সামান্য ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু বার্কলে এই মত সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে বলেন, বিমূর্তকরণ নামে এমন কোনো মানসিক প্রক্রিয়া বাস্তবে সম্ভব নয়।
বার্কলে অবশ্য এক বিশেষ অর্থে বিমূর্ত সামান্য ধারণা বা সামান্য ধারণার অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন। বিশেষ অর্থটি হল— যখন একজাতীয় বিশেষ ধারণাসমূহের প্রতিনিধিরূপে ওই ধারণাগুলি ব্যবহৃত হয়, তখন ওই বিশেষ ধারণাগুলি সামান্য ধারণারূপে পরিগণিত হয়। সুতরাং, বার্কলে বিমূর্ত সামান্য ধারণাকে সমস্ত প্রাণীর প্রতিনিধিমূলক এই অর্থে স্বীকার করেছেন।
অর্থাৎ, বার্কলে সম্পূর্ণভাবে সামান্য ধারণার ব্যবহার অস্বীকার করেননি। তিনি কেবল বিমূর্ত ও স্বাধীন সামান্য ধারণার অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, কোনো একটি বিশেষ ধারণা যদি একই শ্রেণির অন্যান্য বিশেষ ধারণার প্রতিনিধিত্ব করে, তাহলে সেটিকে সামান্য অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি একটি প্রতিনিধিমূলক ব্যবহার, কোনো স্বাধীন বিমূর্ত ধারণা নয়।
পরিশেষে বলা যায়, বার্কলে তাঁর অভিজ্ঞতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে বিমূর্ত সামান্য ধারণার অস্তিত্ব খণ্ডন করেছেন। তাঁর মতে, মানুষের সমস্ত জ্ঞান বিশেষ বস্তুকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে এবং ভাষার ভুল ব্যবহারের কারণেই বিমূর্ত ধারণার ভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি নামবাদের সমর্থন করেন এবং পাশ্চাত্য দর্শনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক বিতর্কের সূচনা করেন।
ভাববাদ কী? বার্কলের আত্মগত ভাববাদ সবিচার আলোচনা কর।
অথবা, “অস্তিত্ব প্রত্যক্ষ নির্ভর” বলতে বার্কলে কী বুঝিয়েছেন?
উত্তরঃ বস্তুর স্বরূপকে কেন্দ্র করে আমাদের সামনে দুটি প্রশ্ন হাজির হয় তা হল— বস্তুর জ্ঞান মন সাপেক্ষ না মন নিরপেক্ষ? অর্থাৎ বস্তু আছে বলে কী আমরা তাদের জানছি? অথবা আমরা জানছি বলেই কি বস্তুর অস্তিত্ব আছে?
যারা বলেন বস্তুর সত্তা জ্ঞাতার মনের উপর নির্ভরশীল, তাদের মতবাদকে বলা হয় ভাববাদ। অন্যদিকে, যারা মনে করেন বস্তু আছে বলে আমরা তাদের জানছি অর্থাৎ বস্তুর সত্তা জ্ঞাতার মন নিরপেক্ষ, তাদের মতবাদকে বলা হয় বস্তুবাদ।
🟥 বার্কলের আত্মগত ভাববাদ সংক্ষেপে আলোচনা করা হল— বার্কলে আত্মগত ভাববাদের প্রবর্তক। তিনি বলেন জগতে মন নিরপেক্ষ বস্তুর স্বাধীন অস্তিত্ব নেই। তাঁর মতে, আমরা যা কিছু দেখছি বা শুনছি তা আমাদের মন এবং মনের ধারণার অতিরিক্ত নয়। তিনি জড়দ্রব্যের অস্তিত্বকে খণ্ডন করেছেন। তাঁর মতে, দ্রব্য হল কতকগুলি গুণের সমষ্টি। তাই গুণ ছাড়া দ্রব্যকে জানা যায় না। এই গুণগুলি সম্পূর্ণ মনের ধারণা মাত্র। সেজন্য বার্কলে বলেছেন মনের ধারণার বাইরে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই।
বার্কলে ছিলেন ইংরেজ ভাববাদী দার্শনিক। তিনি অভিজ্ঞতাবাদী ধারার মধ্যে থেকেও বস্তুবাদী মতবাদের বিরোধিতা করেন। তাঁর মতে, মানুষের জ্ঞান সরাসরি কোনো বস্তু সম্পর্কে নয়, বরং বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত আমাদের মনের ধারণা সম্পর্কে। তাই বাহ্যিক জগতের অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করতে হলে মন ও মনের ধারণাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বার্কলের দর্শনের মূল ভিত্তি হল— “Esse est percipi” অর্থাৎ “অস্তিত্বই প্রত্যক্ষ নির্ভর”। তাঁর মতে, কোনো বস্তুর অস্তিত্ব থাকা মানেই হল সেটি কোনো না কোনো মনের দ্বারা প্রত্যক্ষ হওয়া। যে বস্তুকে কোনো মন প্রত্যক্ষ করে না, তার স্বাধীন অস্তিত্ব স্বীকার করার কোনো কারণ নেই।
এইভাবে বার্কলে তাঁর দর্শনে একটি বিখ্যাত সূত্র আবিষ্কার করেছেন সেটি হল— “অস্তিত্বই প্রত্যক্ষ নির্ভর” অর্থাৎ কোনো কিছুর অস্তিত্ব নির্ভর করে সেটি প্রত্যক্ষ হবার উপর। এখানে বার্কলে বলেছেন যাকে প্রত্যক্ষ করা যায় না তার কোনো অস্তিত্ব নেই।
বার্কলের মতে, আমরা যখন কোনো বস্তুকে দেখি, তখন আমরা বস্তুর নিজস্ব কোনো স্বাধীন সত্তাকে প্রত্যক্ষ করি না; বরং আমরা প্রত্যক্ষ করি রং, আকার, গন্ধ, স্বাদ, স্পর্শ ইত্যাদি গুণ। এই সমস্ত গুণ আমাদের মনে ধারণা হিসেবে উপস্থিত হয়। তাই গুণের বাইরে কোনো অজ্ঞাত জড়পদার্থের অস্তিত্ব কল্পনা করা অপ্রয়োজনীয়।
এই বক্তব্য স্থাপন করার পর বার্কলে বলেন— জড়দ্রব্য যেহেতু প্রত্যক্ষ বহির্ভূত সেহেতু জড়দ্রব্যের কোনো অস্তিত্ব নেই। তিনি আরও বলেন, কেবল জড়দ্রব্য যদি মুখ্যগুণের আধার হত তাহলে তাকে প্রত্যক্ষ করা যেত। কিন্তু জড়দ্রব্য যেহেতু কেবল মুখ্যগুণ নিয়েই নয়, মুখ্য ও গৌণ গুণের সমন্বয়েই গঠিত সেহেতু জড়দ্রব্যের কোনো অস্তিত্ব নেই।
বার্কলে লকের মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের পার্থক্যকেও অস্বীকার করেন। লক মনে করেছিলেন, আকার, বিস্তৃতি, সংখ্যা, গতি ইত্যাদি মুখ্যগুণ বস্তুতে বাস্তবভাবে থাকে এবং রং, গন্ধ, স্বাদ ইত্যাদি গৌণগুণ মনের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু বার্কলের মতে, মুখ্যগুণও গৌণগুণের মতোই মনের ধারণা। কারণ আকার, বিস্তৃতি বা গতি সম্পর্কেও আমরা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ধারণা লাভ করি।
সুতরাং বার্কলের মতে, মুখ্যগুণ ও গৌণগুণ উভয়ই মনের ধারণা এবং এগুলির বাইরে কোনো স্বাধীন জড়দ্রব্যের অস্তিত্ব নেই।
বার্কলে বলেন জড়দ্রব্য প্রত্যক্ষের বিষয় না হওয়ায় জড়দ্রব্যের কোনো অস্তিত্ব নেই। তিনি বলেন কেবল সেই গুণেরই অস্তিত্ব আছে যে গুণগুলিকে প্রত্যক্ষ করা যায়। বার্কলের এই মতবাদ মেনে নিলে আমাদের দুইটি অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় সেগুলি হল—
প্রথমত:- আমার পড়ার ঘরের টেবিলের ওপর কতকগুলি বই আছে। আমি যতক্ষণ ঘরে বসে প্রত্যক্ষ করি ততক্ষণই বইগুলির অস্তিত্ব থাকে এবং যে মুহূর্তে ঘর ছেড়ে বাইরে এলাম সেই মুহূর্তে বইগুলির অস্তিত্ব লোপ পেল— অর্থাৎ বইগুলি একইসঙ্গে অস্তিত্বশীল এবং অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। সুতরাং বলা যায় বার্কলের এই মতবাদ মেনে নিলে একই বস্তু কখনো অস্তিত্বশীল এবং কখনো অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। যা বাস্তবে এক দুরূহ ব্যাপার।
অবশ্য বার্কলে এই আপত্তির উত্তর দিতে ঈশ্বরের ধারণা গ্রহণ করেছেন। তাঁর মতে, মানুষ কোনো বস্তুকে প্রত্যক্ষ না করলেও ঈশ্বর সর্বদা সেই বস্তুকে প্রত্যক্ষ করেন। তাই কোনো বস্তু মানুষের প্রত্যক্ষের বাইরে গেলেও তার অস্তিত্ব নষ্ট হয় না।
বার্কলের এই সমস্যার সমাধানের জন্য ঈশ্বরকেও শেষ পর্যন্ত টেনে এনেছেন এবং বলেছেন যে মুহূর্তে বইগুলি আমি প্রত্যক্ষ করিনি ঠিক সেই মুহূর্তে একজন অর্থাৎ সর্বশক্তিমান সত্তা বইগুলিকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এখানে বার্কলের অভিমত হল আমরা কোন কিছুকে প্রত্যক্ষ না করলেও সর্বশক্তিমান সত্তা রূপে ঈশ্বর সমস্ত কিছুকে প্রত্যক্ষ করেন।
দ্বিতীয় অংশ:
দ্বিতীয়ত:- দ্বিতীয় অসুবিধাটি হল— বার্কলের মতবাদকে যদি আমরা মেনে নিই তাহলে বাস্তব জগত ও কল্পনার জগতের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। কেননা কল্পনা জগতে আমরা অনেক কিছু দেখি যেগুলির বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। অবশ্য বার্কলে এই উত্তরে বলেছেন স্বপ্ন বা কল্পনার জগতে কোনো না কোনো নিয়ম শৃঙ্খলা আছে। তিনি আরও বলেন স্বপ্নের জগত, বাস্তব জগতের মতো পরিষ্কার ও স্পষ্ট নয়। সুতরাং বার্কলের অভিমত হল অস্তিত্ব প্রত্যক্ষ নির্ভর অর্থাৎ কোনো কিছুর অস্তিত্ব নির্ভর করে সেটির প্রত্যক্ষ হওয়ার উপর। এইভাবে তিনি তাঁর দর্শনে আত্মগত ভাববাদের প্রতিষ্ঠা করেছেন।
বার্কলের মতে, বাস্তব জগত ও কল্পনার জগতের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের প্রধান ভিত্তি হল অভিজ্ঞতার স্থায়িত্ব ও নিয়মবদ্ধতা। বাস্তব জগতের ধারণাগুলি আমাদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না এবং এগুলির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও ধারাবাহিকতা দেখা যায়। কিন্তু কল্পনার জগত সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত মানসিক ক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল এবং এতে কোনো স্থায়ী নিয়ম দেখা যায় না।
বার্কলে মনে করেন, বাহ্যিক জগত বলতে আমরা যা বুঝি তা আসলে আমাদের মনে উৎপন্ন ধারণার সমষ্টি। কিন্তু এই ধারণাগুলি মানুষের ইচ্ছাধীন নয়। আমরা ইচ্ছা করলেই কোনো বস্তু দেখতে বা অনুভব করতে পারি না। তাই এই ধারণাগুলির পিছনে একটি সক্রিয় ও সর্বশক্তিমান সত্তার অস্তিত্ব স্বীকার করতে হয়, আর সেই সত্তাই হল ঈশ্বর।
বার্কলের আত্মগত ভাববাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল— তিনি জড়জগতকে অস্বীকার করলেও মন বা আত্মার অস্তিত্বকে স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, ধারণা নিষ্ক্রিয় এবং ধারণার গ্রাহক হিসেবে আত্মা বা মন সক্রিয়। অর্থাৎ ধারণাগুলি মনের মধ্যে অবস্থান করে এবং মন সেই ধারণাগুলিকে উপলব্ধি করে।
সমালোচনা:-
দ্রব্য সম্পর্কে জন বার্কলে যে সকল অভিমত প্রকাশ করেছেন সেগুলি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তাই দার্শনিকরা তাঁর আত্মগত ভাববাদের বিভিন্ন দিক থেকে সমালোচনা করেছেন।
(ক) দার্শনিক মুর বার্কলের আত্মগত ভাববাদের সমালোচনায় বলেছেন— বস্তুর অস্তিত্ব কখনোই প্রত্যক্ষের উপর নির্ভরশীল নয়। কেননা আমাদের প্রত্যক্ষ হোক বা না হোক, বস্তুর অস্তিত্ব থাকবেই।
মুরের মতে, আমরা কোনো বস্তুকে প্রত্যক্ষ না করলেও সেই বস্তুর অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না। যেমন— কোনো মানুষ ঘরে না থাকলেও ঘরের টেবিল, চেয়ার ইত্যাদির অস্তিত্ব বজায় থাকে। তাই বস্তুর অস্তিত্বকে শুধুমাত্র প্রত্যক্ষের উপর নির্ভরশীল বলা যুক্তিসঙ্গত নয়।
(খ) বার্কলের মতবাদ পদার্থবিদ্যার বিরোধী। কারণ একজন পদার্থবিদ মনে করেন বাহ্যিক জগতে জড়পদার্থের অস্তিত্ব নির্ভর করে পদার্থবিদ্যার সূত্র অনুযায়ী। কাজেই বার্কলের মতবাদ মেনে নিলে পদার্থবিদ্যাকে অস্বীকার করতে হবে।
পদার্থবিদ্যার সমস্ত গবেষণা বাহ্যিক জগতের বাস্তব অস্তিত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি জড়পদার্থের কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে পদার্থবিদ্যার নিয়ম, বস্তুজগতের কার্যকারণ সম্পর্ক এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

(গ) বার্কলে বলেন যখন আমরা কোনো কিছুকে প্রত্যক্ষ করি না তখন ঈশ্বর সেটিকে প্রত্যক্ষ করেন। এর কোনো সঠিক উত্তর বার্কলে দিতে পারেননি।
সমালোচকদের মতে, ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ করার ধারণা বার্কলের সমস্যার সমাধান করলেও ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে তিনি পর্যাপ্ত যুক্তি দিতে পারেননি। তাই তাঁর মতবাদে একটি অতিরিক্ত অনুমানের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
(ঘ) বার্কলের আত্মগত ভাববাদে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জ্ঞান কেবল ব্যক্তিগত মনের উপর নির্ভরশীল নয়; জ্ঞানের ক্ষেত্রে সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক অভিজ্ঞতারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
(ঙ) বার্কলে জড়দ্রব্যের অস্তিত্ব অস্বীকার করলেও মানুষের সাধারণ অভিজ্ঞতায় আমরা বস্তুগুলিকে মনের বাইরে স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল বলে মনে করি। তাই তাঁর মতবাদ সাধারণ বুদ্ধির বিরোধী বলে অনেক দার্শনিক মনে করেন।
বার্কলের আত্মগত ভাববাদের গুরুত্ব
বার্কলের আত্মগত ভাববাদ পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ। তিনি দেখিয়েছেন যে, বস্তু সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সরাসরি বস্তুর জ্ঞান নয়, বরং বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত আমাদের মানসিক ধারণার জ্ঞান।
তিনি জড়বাদের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে মনের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর মতবাদ পরবর্তী ভাববাদী দর্শনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
যদিও তাঁর মতবাদ বিভিন্ন সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে, তবুও জ্ঞান, প্রত্যক্ষণ ও বাস্তবতার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে বার্কলের অবদান দর্শনের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
পরিশেষে বলা যায়, বার্কলের আত্মগত ভাববাদের মূল বক্তব্য হল— জগতের অস্তিত্ব মন ও প্রত্যক্ষের উপর নির্ভরশীল। তাঁর বিখ্যাত সূত্র “অস্তিত্বই প্রত্যক্ষ নির্ভর”-এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রত্যক্ষের বাই
অ্যারিস্টটলের ঈশ্বরতত্ত্ব আলোচনা কর। অথবা, জগতের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক কীরূপ তা অ্যারিস্টটলকে অনুসরণ করে আলোচনা কর।
উত্তরঃ অ্যারিস্টটলের কোনো কোনো রচনায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ে কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে যতগুলি প্রমাণ পাওয়া যায়, তার মধ্যে অন্যতম হলো— উদ্দেশ্যভিত্তিক প্রমাণ। তাঁর মতে, জগতের সৌন্দর্য এবং মহাবিশ্বের বিশাল মহিমার যিনি মূল কারণ, তিনি হলেন ঈশ্বর। তিনি মনে করেন, ঈশ্বর যেহেতু পরম স্রষ্টা, সেহেতু ঈশ্বরই একমাত্র পরিপূর্ণ রূপে ব্যক্ত এবং সত্যবান। ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বপক্ষে অ্যারিস্টটল কয়েকটি যুক্তি দিয়েছেন। সেগুলি হল—
অ্যারিস্টটল পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে একজন শ্রেষ্ঠ দার্শনিক। তাঁর অধিবিদ্যা বা Metaphysics গ্রন্থে ঈশ্বর সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পাওয়া যায়। যদিও তিনি ঈশ্বরকে প্রচলিত অর্থে কোনো ব্যক্তিগত সৃষ্টিকর্তা হিসেবে গ্রহণ করেননি, তবুও তিনি ঈশ্বরকে জগতের সর্বোচ্চ বাস্তবতা, চূড়ান্ত কারণ এবং সমস্ত পরিবর্তনের মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
অ্যারিস্টটলের ঈশ্বরতত্ত্ব মূলত তাঁর আকার ও উপাদান (Form and Matter), সম্ভাবনা ও বাস্তবতা (Potentiality and Actuality) এবং কারণতত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁর মতে, জগতের সমস্ত বস্তু পরিবর্তনশীল। কিন্তু এই পরিবর্তনের পিছনে এমন একটি অপরিবর্তনীয় সত্তার অস্তিত্ব থাকা প্রয়োজন, যিনি নিজে পরিবর্তিত না হয়ে অন্য সবকিছুর পরিবর্তনের কারণ হন।
1️⃣ প্রথমতঃ অ্যারিস্টটলের মতে, শুদ্ধ আকারই হল ঈশ্বর। তাঁর মতে, জগতের যাবতীয় বস্তু একটি বিশেষ ক্রমে সাজানো আছে। এই ক্রমবিন্যাসের সর্বোচ্চ স্তরে আছেন ঈশ্বর। সুতরাং ঈশ্বর অস্তিত্বশীল।
অ্যারিস্টটলের মতে, জগতের প্রতিটি বস্তু উপাদান ও আকারের সমন্বয়ে গঠিত। কিন্তু ঈশ্বরের মধ্যে কোনো উপাদান নেই; তিনি শুধুমাত্র শুদ্ধ আকার বা Pure Form। যেহেতু আকার উপাদানের তুলনায় অধিক বাস্তব, তাই সর্বোচ্চ শুদ্ধ আকার হিসেবে ঈশ্বরই হলেন পরম বাস্তব সত্তা।
অর্থাৎ, জগতের সমস্ত বস্তু যেখানে অসম্পূর্ণ ও পরিবর্তনশীল, সেখানে ঈশ্বর সম্পূর্ণ, চিরন্তন এবং অপরিবর্তনীয়।
2️⃣ দ্বিতীয়তঃ অ্যারিস্টটলের মতে, পরমপূর্ণ ঈশ্বর স্বয়ং চিন্তার স্বরূপ। তাঁর মতে, ঈশ্বর যেহেতু পরম আকার, সেহেতু তাঁর চিন্তার বিষয়বস্তু বিশুদ্ধ (বিশুদ্ধ চিন্তা)। সুতরাং অ্যারিস্টটলের কাছে ঈশ্বর হলেন— চিন্তার চিন্তা।
অ্যারিস্টটলের মতে, চিন্তা একটি সর্বোচ্চ কার্য। ঈশ্বর যেহেতু সর্বোচ্চ ও পরিপূর্ণ সত্তা, তাই তাঁর চিন্তার বিষয়ও সর্বোচ্চ হওয়া উচিত। তাই ঈশ্বর নিজেকেই চিন্তা করেন। এই কারণে অ্যারিস্টটল ঈশ্বরকে “চিন্তার চিন্তা” (Thought Thinking Itself) বলেছেন।
ঈশ্বরের জ্ঞান কোনো বাহ্যিক বস্তুর উপর নির্ভরশীল নয়, কারণ বাহ্যিক বস্তু পরিবর্তনশীল ও অসম্পূর্ণ। তাই ঈশ্বরের চিন্তা শুধুমাত্র নিজের পরিপূর্ণ সত্তাকে নিয়েই আবর্তিত হয়।
3️⃣ তৃতীয়তঃ অ্যারিস্টটলের মতে, ঈশ্বর একমাত্র বাস্তব এবং অন্যান্য সকল বস্তুগুলি কম-বেশি অবাস্তব। ক্রমের যত বেশি উপরে ওঠা যায়, ততই অধিকতর বাস্তবতা লাভ করা যায়। কেননা আকার তত অধিক মাত্রায় উপস্থিত থাকে।
অ্যারিস্টটলের মতে, বাস্তবতার বিভিন্ন স্তর রয়েছে। যে বস্তুর মধ্যে আকারের প্রাধান্য বেশি, সেটি তত বেশি বাস্তব। আর ঈশ্বর হলেন সম্পূর্ণ শুদ্ধ আকার, তাই তিনিই সর্বাধিক বাস্তব।
জগতের বস্তুগুলি পরিবর্তনশীল হওয়ায় তাদের বাস্তবতা সীমিত। কিন্তু ঈশ্বর পরিবর্তনহীন ও চিরন্তন হওয়ায় তাঁর বাস্তবতা সর্বোচ্চ।
4️⃣ চতুর্থতঃ অ্যারিস্টটলের মতে, ঈশ্বর জগতের নিমিত্ত কারণ। নিমিত্ত কারণ হলো সেই শক্তি, যার দ্বারা বস্তুর উদ্দেশ্য সাধিত হয়। নিমিত্ত কারণ বলতে তিনি গতিকে বুঝিয়েছেন। আবার নিমিত্ত কারণকে তিনি কর্তাও বলেছেন। এর কর্তা হলেন ঈশ্বর। তাঁর মতে, ঈশ্বর হলেন সকল বস্তুর পরিবর্তনের মূল কারণ। ঈশ্বর কারো দ্বারা সঞ্চালিত হন না; তিনি স্বয়ং নিশ্চল। এই নিশ্চল সত্তা হিসেবে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে স্বীকার করতেই হয়।
অ্যারিস্টটলের মতে, জগতে যে পরিবর্তন ও গতি দেখা যায় তার একটি প্রথম কারণ থাকা আবশ্যক। কারণ কোনো কিছু নিজে নিজে পরিবর্তিত হতে পারে না। যদি প্রতিটি পরিবর্তনের পিছনে আরেকটি কারণ খোঁজা হয়, তাহলে কারণের একটি অসীম ধারার সৃষ্টি হবে। তাই এই ধারার শেষে এমন একটি সত্তাকে মানতে হবে, যিনি নিজে অচল কিন্তু অন্য সবকিছুর গতির কারণ।
এই কারণেই অ্যারিস্টটল ঈশ্বরকে অচঞ্চল চালক (Unmoved Mover) বলেছেন।
5️⃣ পঞ্চমতঃ অ্যারিস্টটলের মতে, ঈশ্বর যান্ত্রিক কারণ নয়, বরং উদ্দেশ্যমূলক আকার। কারণ ঈশ্বর উদ্দেশ্যের দিক থেকে ক্রিয়া করে চলেছেন। প্রকৃতপক্ষে অ্যারিস্টটলের মতে, ঈশ্বর হলেন নিমিত্ত কারণ এবং স্বয়ং উদ্দেশ্য কারণ। সুতরাং ঈশ্বর একই সঙ্গে নিমিত্ত কারণ ও উদ্দেশ্য কারণ।
অ্যারিস্টটলের মতে, ঈশ্বর কোনো যান্ত্রিক শক্তির মতো জগতকে পরিচালনা করেন না। বরং সমস্ত বস্তু তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নিজেদের পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হয়। ঈশ্বর হলেন সেই চূড়ান্ত আদর্শ, যার দিকে সমস্ত পরিবর্তনশীল বস্তু এগিয়ে যায়।
এই কারণে ঈশ্বর একই সঙ্গে জগতের গতির কারণ এবং সমস্ত সৃষ্টির চূড়ান্ত উদ্দেশ্য।
জগতের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক অ্যারিস্টটলের মতে, ঈশ্বর ও জগতের সম্পর্ক সাধারণ সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির সম্পর্ক নয়। কারণ তিনি ঈশ্বরকে জগতের কোনো ব্যক্তিগত নির্মাতা হিসেবে গ্রহণ করেননি। ঈশ্বর জগতের বাইরে অবস্থান করে কোনো ইচ্ছার মাধ্যমে জগৎ সৃষ্টি করেন না।
বরং ঈশ্বর হলেন জগতের সর্বোচ্চ আদর্শ ও চূড়ান্ত কারণ। জগতের সমস্ত বস্তু ঈশ্বরের পরিপূর্ণতার দিকে আকৃষ্ট হয়ে পরিবর্তিত হয়।
অর্থাৎ, ঈশ্বর জগতের নিমিত্ত কারণ হলেও তিনি জগতের প্রত্যক্ষ স্রষ্টা নন। তিনি জগতের গতি ও উদ্দেশ্যের চূড়ান্ত ভিত্তি।
সমালোচনাঃ ঈশ্বরের সঙ্গে জগতের সম্পর্ক পারস্পরিক নির্ভরশীল নয়, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। কেননা ঈশ্বর জীব ও জগতের সৃষ্টিকর্তা নন; এমনকি জীব ও জগতের অস্তিত্বের জন্য ঈশ্বরের উপর নির্ভর করতে হয় না। প্রকৃতপক্ষে অ্যারিস্টটলের মতে, ঈশ্বর হলেন ব্যক্তিগত চিন্তন। এই সমস্ত দিক থেকে বিবেচনা করে বলা যায় যে, যাবতীয় বাস্তবতা সম্পর্কে ঈশ্বরের কোনো সম্পর্ক নেই— এই মত অ্যারিস্টটলকে অনুসরণ করে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করা যায় না। কেননা অ্যারিস্টটল পরম চিন্তা ঈশ্বরকে পরম সত্তা হিসেবে গ্রহণ করলেও তাঁকে জগতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্কযুক্ত অস্তিত্বশীল সত্তা হিসেবে গ্রহণ করেননি।
অ্যারিস্টটলের ঈশ্বরতত্ত্বের বিরুদ্ধে বলা হয় যে, তিনি ঈশ্বরকে জগতের সঙ্গে খুব বেশি দূরত্বে স্থাপন করেছেন। যদি ঈশ্বর জগতের প্রত্যক্ষ স্রষ্টা বা নিয়ন্ত্রক না হন, তাহলে জগতের নৈতিকতা ও ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক কীভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে— এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন।

এছাড়া অ্যারিস্টটলের ঈশ্বর ব্যক্তিগত ঈশ্বর নন। তিনি মানুষের প্রার্থনা, নৈতিক জীবন বা ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন। তাই অনেক দার্শনিক মনে করেন, তাঁর ঈশ্বরতত্ত্ব অতিরিক্ত বিমূর্ত।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, অ্যারিস্টটলের ঈশ্বরতত্ত্ব পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ। তিনি ঈশ্বরকে অচঞ্চল চালক, শুদ্ধ আকার, পরম বাস্তবতা এবং চূড়ান্ত কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যদিও তাঁর ঈশ্বর জগতের ব্যক্তিগত সৃষ্টিকর্তা নন, তবুও জগতের পরিবর্তন, গতি ও উদ্দেশ্যের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হিসেবে তাঁর ঈশ্বরতত্ত্ব দর্শনের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে।
অ্যারিস্টটলের মতে আকার ও উপাদানের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর।
উত্তরঃ গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল আকার ও উপাদান—এই দুটি মৌলিক উপাদানের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বজগতের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অ্যারিস্টটলের মতে, আকার হলো বস্তুর সামান্য ধর্ম, যা ওই বস্তুটিকে সংবদ্ধ করে। অন্যদিকে, উপাদান হলো সেই বিশেষ সত্তা, যা সামান্য ধর্মের দ্বারা আকারিত হয়ে সমগ্র বস্তুতে পরিণত হয়।
অ্যারিস্টটলের দর্শনে আকার ও উপাদান তত্ত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবিদ্যাগত ধারণা। তিনি মনে করেন, জগতের কোনো বস্তুই শুধুমাত্র উপাদান বা শুধুমাত্র আকার দিয়ে গঠিত নয়। প্রত্যেক বাস্তব বস্তু আকার ও উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। এই তত্ত্বের মাধ্যমে অ্যারিস্টটল বস্তুজগতের প্রকৃতি এবং পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।
অ্যারিস্টটলের মতে আকার ও উপাদান পরস্পর সাপেক্ষ। তাঁর মতে, এক দৃষ্টিভঙ্গিতে যা উপাদান, অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে তাই আকার। উপাদান হলো এমন কিছু, যা পরিবর্তিত হয় বা যাকে আশ্রয় করে বস্তুর পরিবর্তন ঘটে। আর অন্যদিকে, যাকে লাভ করার জন্য পরিবর্তন ঘটে, তাই হলো আকার। এক কথায়, যেটি পরিবর্তিত হয় সেটি হলো উপাদান এবং যা হয়ে ওঠে তাই হলো আকার। যেমন— একটি মাটির পাত্রের ক্ষেত্রে উপাদান হলো মাটি এবং মাটি যে নির্দিষ্ট রূপ লাভ করে পাত্রে পরিণত হয়েছে, সেটিই হলো তার আকার।
অর্থাৎ, উপাদান হলো বস্তুর সম্ভাবনার দিক এবং আকার হলো সেই সম্ভাবনার বাস্তব প্রকাশ। মাটির মধ্যে যেমন পাত্র হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু নির্দিষ্ট আকার লাভ না করা পর্যন্ত সেটি পাত্রে পরিণত হয় না। যখন মাটি একটি নির্দিষ্ট রূপ লাভ করে তখন তা বাস্তব পাত্রে পরিণত হয়। এইভাবে উপাদান সম্ভাবনা এবং আকার বাস্তবতার প্রতীক।
অ্যারিস্টটলের মতে, কোনো বস্তুতে উপাদান অপেক্ষা আকারের গুরুত্ব বেশি। কারণ উপাদান নিজে কোনো নির্দিষ্ট পরিচয় বহন করে না। আকারই উপাদানকে একটি নির্দিষ্ট বস্তু হিসেবে পরিচয় প্রদান করে। যেমন— কাঠ একটি উপাদান, কিন্তু কাঠের তৈরি চেয়ার, টেবিল বা দরজার পরিচয় নির্ভর করে তার নির্দিষ্ট আকারের উপর।
অ্যারিস্টটলের মতে উপাদান ও আকার অবিচ্ছেদ্যভাবে আবদ্ধ। কেননা কোনো একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে চিন্তা করা যায় না। যেকোনো বস্তুর আকার থাকলে সেই বস্তুটির একটি উপাদান থাকবেই। বাস্তবে এমন কোনো বস্তু নেই, যার আকার আছে অথচ উপাদান নেই; আবার উপাদান আছে অথচ তার আকার নেই। তাই অ্যারিস্টটল বলেন, আকার এবং উপাদান অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।
অ্যারিস্টটলের মতে, আকার ও উপাদানকে আলাদা করে কেবলমাত্র চিন্তার ক্ষেত্রে আলোচনা করা যায়, কিন্তু বাস্তব জগতে তারা সবসময় একসঙ্গে অবস্থান করে। কোনো বস্তু সৃষ্টি হওয়ার জন্য যেমন উপাদান প্রয়োজন, তেমনি সেই উপাদানকে নির্দিষ্ট রূপ দেওয়ার জন্য আকারের প্রয়োজন হয়।

আকার হলো বস্তুর সামান্য ধর্ম এবং উপাদান হলো বস্তুর বিশেষ ধর্ম। যেকোনো যৌগিক বস্তু আকার ও উপাদান অর্থাৎ সামান্য ও বিশেষের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়।
অ্যারিস্টটলের মতে, আকার বস্তুর প্রকৃত সত্তা প্রকাশ করে এবং উপাদান হলো সেই সত্তার প্রকাশের মাধ্যম। তাই আকার ছাড়া উপাদান অসম্পূর্ণ এবং উপাদান ছাড়া আকার বাস্তব রূপ লাভ করতে পারে না।
আকার ও উপাদানের এই সম্পর্ক অ্যারিস্টটলের কারণতত্ত্বের সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর মতে, কোনো বস্তুর পরিবর্তন ঘটার জন্য উপাদান কারণ এবং আকার কারণ উভয়েরই প্রয়োজন। উপাদান পরিবর্তনের ভিত্তি প্রদান করে এবং আকার সেই পরিবর্তনকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালিত করে।
পরিশেষে বলা যায়, অ্যারিস্টটলের আকার ও উপাদান তত্ত্ব বস্তুজগতের প্রকৃতি ব্যাখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা। তাঁর মতে, সমস্ত যৌগিক বস্তু আকার ও উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত এবং এই দুইয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক ছাড়া কোনো বাস্তব বস্তুর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। তাই পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে অ্যারিস্টটলের আকার ও উপাদান তত্ত্ব একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।
অ্যারিস্টটলের মতে কারণ কয় প্রকার ও কী কী? অথবা, অ্যারিস্টটলের কার্য-কারণ তত্ত্ব ব্যাখ্যা কর।
উত্তরঃ অ্যারিস্টটলের মতে, কোনো কিছুকে ব্যাখ্যা করতে হলে প্রথমে তার কারণ জানতে হয়। অ্যারিস্টটল এই প্রসঙ্গে চার প্রকার কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। যথা— (i) উপাদান কারণ, (ii) আকারগত কারণ, (iii) নিমিত্ত কারণ এবং (iv) উদ্দেশ্য বা পরিণতি কারণ।
অ্যারিস্টটলের কার্য-কারণ তত্ত্ব (Theory of Four Causes) পাশ্চাত্য দর্শনের অধিবিদ্যার একটি মৌলিক তত্ত্ব। তাঁর মতে, কোনো বস্তু বা ঘটনার প্রকৃত ব্যাখ্যা করতে হলে কেবল এটি কী দিয়ে তৈরি হয়েছে তা জানলেই যথেষ্ট নয়; বরং কেন এটি সৃষ্টি হয়েছে, কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে এবং এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কী—এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন। এই কারণেই তিনি চার প্রকার কারণের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, এই চারটি কারণ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং একটিকে বাদ দিয়ে কোনো বস্তুর পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়।
অ্যারিস্টটলের মতে, জগতের প্রতিটি বস্তু সম্ভাবনা (Potentiality) থেকে বাস্তবতায় (Actuality) পরিণত হয়। এই পরিবর্তনের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া বোঝানোর জন্যই তিনি কার্য-কারণ তত্ত্বের অবতারণা করেন। তাঁর এই তত্ত্ব শুধু দর্শনেই নয়, বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা এবং নৈতিক দর্শনেও বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে।
➡️ অ্যারিস্টটলকে অনুসরণ করে এই চার প্রকার কারণ সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো—
1️⃣ উপাদান বা বস্তুগত কারণ : কোনো কিছু উৎপন্ন করতে হলে যে উপাদানগুলির প্রয়োজন হয়, তাই হলো ওই বস্তুর উপাদান কারণ। সহজ কথায় বলা যায়, যে উপাদানের দ্বারা একটি বস্তুর উৎপত্তি হয়, সেই উপাদানই হলো ওই বস্তুর উপাদান কারণ। যেমন— একটি ব্রোঞ্জের মূর্তির ক্ষেত্রে উপাদান কারণ হলো ব্রোঞ্জ ধাতু। কেননা এই ব্রোঞ্জ ধাতু ছাড়া মূর্তি নির্মাণ অসম্ভব।
এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে, অ্যারিস্টটল বস্তুগত কারণ বলতে কেবলমাত্র স্থূল বস্তুকেই বোঝাননি; বরং সূক্ষ্ম উপাদানকেও উপাদান কারণ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
উপাদান কারণ হলো কোনো বস্তুর অস্তিত্বের ভিত্তি। এটি সেই উপকরণ, যার উপর নির্ভর করে একটি বস্তু গঠিত হয়। যেমন একটি কাঠের টেবিলের ক্ষেত্রে কাঠ, একটি স্বর্ণের আংটির ক্ষেত্রে সোনা এবং একটি মাটির কলসির ক্ষেত্রে মাটি হলো উপাদান কারণ। উপাদান পরিবর্তিত হয়ে নতুন রূপ লাভ করতে পারে, কিন্তু কোনো না কোনো উপাদান ছাড়া কোনো বস্তু সৃষ্টি সম্ভব নয়।
2️⃣ আকারগত কারণ: আকারগত কারণ হলো সেই কারণ, যে আকারে শিল্পী মূর্তিটি তৈরি করেন। অর্থাৎ উদ্দেশ্য অনুযায়ী উপাদান যে আকার ধারণ করে, তাই হলো আকারগত কারণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, শিল্পী যে আকারে ব্রোঞ্জের মূর্তিটি তৈরি করেন, সেটিই হলো মূর্তিটির আকারগত কারণ।
অ্যারিস্টটলের মতে, আকারই বস্তুকে তার প্রকৃত পরিচয় প্রদান করে। একই উপাদান বিভিন্ন আকার ধারণ করে ভিন্ন ভিন্ন বস্তুতে পরিণত হতে পারে। যেমন একই কাঠ দিয়ে চেয়ার, টেবিল কিংবা দরজা তৈরি করা যায়। এখানে কাঠ একই থাকলেও আকারের পরিবর্তনের ফলে বস্তুগুলির পরিচয় ভিন্ন হয়ে যায়। তাই আকারগত কারণ বস্তুর স্বরূপ নির্ধারণ করে।
3️⃣ নিমিত্ত কারণ : নিমিত্ত কারণ হলো সেই শক্তি, যার দ্বারা বস্তুর উদ্দেশ্য সাধিত হয়। অ্যারিস্টটল নিমিত্ত কারণ বলতে গতিকে বুঝিয়েছেন। তিনি গতি বলতে সমস্ত প্রকার পরিবর্তনকেই বুঝিয়েছেন। তাঁর মতে, যার প্রচেষ্টায় বস্তুর পরিবর্তন সাধিত হয়, তাই হলো নিমিত্ত কারণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ব্রোঞ্জের মূর্তির ক্ষেত্রে শিল্পী হলেন নিমিত্ত কারণ। নিমিত্ত কারণকে আবার কর্তা বলেও অভিহিত করা হয়।
নিমিত্ত কারণ হলো সেই কার্যকর শক্তি, যা উপাদানকে পরিবর্তিত করে নির্দিষ্ট আকার প্রদান করে। কোনো নির্মাতা, শিল্পী, কারিগর বা প্রাকৃতিক শক্তি—যে শক্তি পরিবর্তন ঘটায়, সেটিই নিমিত্ত কারণ। যেমন একজন কুমোর মাটি দিয়ে কলসি তৈরি করেন। এখানে কুমোর হলেন নিমিত্ত কারণ, কারণ তাঁর প্রচেষ্টার ফলেই মাটি কলসিতে পরিণত হয়েছে।
4️⃣ উদ্দেশ্য বা পরিণতি কারণ : উদ্দেশ্য বা পরিণতি কারণ হলো পরিবর্তনের চূড়ান্ত পরিণতি বা সমাপ্তি। অ্যারিস্টটল এই চতুর্থ প্রকার কারণের দ্বারা কাজের পরিসমাপ্তি বা বাস্তবায়ন বোঝাতে চেয়েছেন। তাঁর মতে, উপাদান কারণ, আকারগত কারণ এবং নিমিত্ত কারণ—এই তিনটি কারণ থাকলেই সৃষ্টি-ক্রিয়া সম্পূর্ণ হয় না। সৃষ্টি-ক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে হলে উদ্দেশ্য বা পরিণতি কারণেরও প্রয়োজন হয়। কারণ কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো কার্য সফল হতে পারে না।
সুতরাং বলা যায়, যে উদ্দেশ্য সাধনের জন্য শিল্পী মূর্তি নির্মাণ করেন, সেটিই হলো উদ্দেশ্য কারণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোনো ব্যক্তির স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে যদি শিল্পী একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি নির্মাণ করেন, তাহলে সেই ব্যক্তির স্মৃতি সংরক্ষণই হবে ওই মূর্তির উদ্দেশ্য বা পরিণতি কারণ।
অ্যারিস্টটলের মতে, উদ্দেশ্য কারণই চারটি কারণের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রত্যেক সৃষ্টি বা পরিবর্তনের পিছনে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থাকে। যেমন একটি বিদ্যালয় নির্মাণের উদ্দেশ্য হলো শিক্ষা প্রদান, একটি হাসপাতাল নির্মাণের উদ্দেশ্য হলো চিকিৎসা প্রদান এবং একটি সেতু নির্মাণের উদ্দেশ্য হলো যাতায়াত সহজ করা। এই উদ্দেশ্যই সংশ্লিষ্ট বস্তুর পরিণতি কারণ।
চার প্রকার কারণের একটি সহজ উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। একটি মাটির কলসির ক্ষেত্রে মাটি হলো উপাদান কারণ, কলসির নির্দিষ্ট আকৃতি হলো আকারগত কারণ, কুমোর হলেন নিমিত্ত কারণ এবং পানি সংরক্ষণ বা ব্যবহারই হলো উদ্দেশ্য কারণ। এই চারটি কারণ একত্রে বিবেচনা করলেই কলসির সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

অ্যারিস্টটলের কার্য-কারণ তত্ত্বের বিশেষ গুরুত্ব হলো, তিনি কোনো বস্তুকে একমাত্র যান্ত্রিক বা বস্তুগত দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেননি। বরং তিনি দেখিয়েছেন যে বাস্তব জগতের প্রতিটি বস্তু ও ঘটনার অস্তিত্বের পিছনে উপাদান, রূপ, কার্যকর শক্তি এবং উদ্দেশ্য—এই চারটি দিকই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহারঃ অ্যারিস্টটলের কার্য-কারণ তত্ত্ব পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী তত্ত্ব। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি জগতের সৃষ্টি, পরিবর্তন এবং বিকাশের একটি যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তাঁর মতে, কোনো বস্তুকে সম্পূর্ণভাবে জানতে হলে তার উপাদান, আকার, নিমিত্ত এবং উদ্দেশ্য—এই চারটি কারণই জানা অপরিহার্য। তাই দর্শনের ইতিহাসে অ্যারিস্টটলের কার্য-কারণ তত্ত্ব আজও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক।
প্রশ্নঃ “আমি চিন্তা করি অতএব আমি আছি” [I think therefore I am]— কিভাবে ডেকার্ত এই উক্তিটি আলোচনা করেছেন? অথবা, ডেকার্তের দর্শনে ‘মৌলিক সূত্রটি’ ব্যাখ্যা করো। অথবা, ডেকার্তের সংশয় পদ্ধতি আলোচনা করো।
উত্তরঃ Cogito ergo sum উক্তিটির অর্থ হলো— “আমি চিন্তা করি, সুতরাং আমি আছি”। এটি একটি ল্যাটিন শব্দ, যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো “I think, therefore I am”। এটি হলো ডেকার্তের দর্শনের মূল সূত্র। এই সূত্রের উপর ভিত্তি করে ডেকার্ত তাঁর সংশয় পদ্ধতি (Method of Doubt) প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ডেকার্তের সংশয় পদ্ধতির মূল বক্তব্য হলো— সমস্ত কিছুকে সংশয় করে অবশেষে নিশ্চিত সত্যে উপনীত হওয়া। ডেকার্তের মতে, দর্শনের ভিত্তি এমন একটি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত, যা সম্পূর্ণ নিশ্চিত এবং যার সম্পর্কে কোনো ধরনের সন্দেহ করা সম্ভব নয়। তাই তিনি প্রথমে সমস্ত প্রচলিত জ্ঞান, ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা এবং বাইরের জগতের অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেন।
ডেকার্ত তাঁর দর্শনে অবরোহ পদ্ধতি (Deductive Method) প্রয়োগ করে নিশ্চিত সত্যে উপনীত হতে চেয়েছেন। তিনি সংশয়ের জন্য সংশয় করেননি। তিনি কেবল সংশয় করেছেন নিশ্চিত সত্যে উপনীত হওয়ার জন্য। অর্থাৎ তাঁর সংশয় ছিল সাময়িক ও উদ্দেশ্যমূলক। তিনি সংশয়বাদী ছিলেন না, বরং সংশয়ের মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধানকারী দার্শনিক ছিলেন।
যেহেতু ডেকার্ত সমস্ত কিছুর শুরুতে সংশয় প্রকাশ করেছেন, সেহেতু ডেকার্তের সংশয়বাদকে প্রারম্ভিক সংশয়বাদ (Methodical Doubt) বলা হয়। এই সংশয় পদ্ধতির মাধ্যমে তিনি এমন একটি সত্যের সন্ধান করেন, যা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।
ডেকার্ত তাঁর সংশয় পদ্ধতির সাহায্যে যে মৌলিক সূত্রে উপনীত হয়েছেন সেটি হলো— “Cogito ergo sum” অর্থাৎ “আমি চিন্তা করি সুতরাং আমি আছি”। এই সূত্রটির বক্তব্য হলো— সমস্ত কিছুকে সংশয় করা গেলেও সংশয়কারীর অস্তিত্বকে সংশয় করা যায় না।
কারণ সংশয় করা মানে হলো চিন্তা করা। আর চিন্তা করার জন্য একজন চিন্তাশীল সত্তার অস্তিত্ব অবশ্যই প্রয়োজন। তাই যখন আমি কোনো বিষয় সম্পর্কে সন্দেহ করি, তখন সেই সন্দেহ করার কাজের মধ্যেই আমার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। এই কারণেই ডেকার্ত বলেন— “আমি চিন্তা করি, অতএব আমি আছি।”
ডেকার্তের মতে, এই সূত্র কোনো অনুমানের উপর নির্ভরশীল নয়। কারণ সাধারণ অনুমানের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়, কিন্তু Cogito Ergo Sum-এর ক্ষেত্রে চিন্তার সঙ্গে চিন্তাশীল আত্মার অস্তিত্ব সরাসরি উপলব্ধ হয়। তাই এটি একটি প্রত্যক্ষ ও নিশ্চিত সত্য।
ডেকার্তের মতে, “আমি” বলতে শরীরকে বোঝানো হয় না, বরং চিন্তাশীল আত্মাকে (Thinking Substance) বোঝানো হয়। তাঁর মতে, শরীর পরিবর্তনশীল হলেও চিন্তা করার ক্ষমতাসম্পন্ন আত্মার অস্তিত্ব নিশ্চিত। কারণ চিন্তা হলো আত্মার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ডেকার্ত মনে করেন, Cogito Ergo Sum হলো সমস্ত জ্ঞানের প্রথম ভিত্তি। এই নিশ্চিত সত্যের উপর ভিত্তি করেই তিনি পরবর্তীকালে আত্মা, ঈশ্বর এবং বাইরের জগতের অস্তিত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। তাই আধুনিক দর্শনের ইতিহাসে এই সূত্রের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
এইভাবে ডেকার্ত তাঁর দর্শনে “আমি চিন্তা করি সুতরাং আমি আছি”— এই মৌলিক সূত্রে উপনীত হলেন। সুতরাং বলা চলে, “আমি চিন্তা করি অতএব আমি আছি” এটি কোনো অনুমান নয়; এটি একটি স্বতঃসিদ্ধ, সত্য বচন, যা সমস্ত সংশয়ের ঊর্ধ্বে।
পরিশেষে বলা যায়, ডেকার্তের Cogito Ergo Sum তত্ত্ব আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করেছে। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে, মানুষের চিন্তাশীল আত্মাই হলো নিশ্চিত জ্ঞানের প্রথম ভিত্তি। তাই দর্শনের ইতিহাসে ডেকার্তের এই মৌলিক সূত্র একটি যুগান্তকারী অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রশ্ন:- দেহ ও মন সম্পর্কে স্পিনোজার মতবাদ আলোচনা কর।
অথবা, “দেহ ও মনের মধ্যে সমান্তরাল সম্পর্ক বর্তমান”— উক্তিটি কার? এই প্রসঙ্গে তাঁর মতবাদটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তরঃ পাশ্চাত্য দর্শনে দেহ ও মনের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে যেসকল মতবাদ গড়ে উঠেছে, তাদের মধ্যে প্রধান তিনটি মতবাদ হলো— ডেকার্তের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াবাদ (Interactionism), স্পিনোজার সমান্তরালবাদ (Parallelism) এবং লাইবনিজের পূর্ব-প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাবাদ (Pre-established Harmony)। এখানে আমাদের আলোচনার বিষয় হলো স্পিনোজার সমান্তরাল তত্ত্ব।
দেহ ও মন সম্পর্ক বিষয়ে স্পিনোজার মতবাদঃ
বুদ্ধিবাদী দার্শনিক স্পিনোজা হলেন সমান্তরালবাদ তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তা। তিনি ডেকার্তের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াবাদের ত্রুটি দূর করে সমান্তরাল তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ডেকার্ত দেহ ও মনকে দুটি পৃথক দ্রব্য হিসেবে স্বীকার করলেও তাদের মধ্যে কীভাবে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সম্ভব তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি। এই সমস্যার সমাধান করার জন্য স্পিনোজা তাঁর সমান্তরালবাদ তত্ত্বের প্রবর্তন করেন।
সমান্তরালবাদ অনুসারে দেহ ও মনের মধ্যে কোনো ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক নেই। এই মতবাদ অনুযায়ী দেহ ও মন পাশাপাশি অবস্থান করে এবং একই সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। যেমন— দুটি সমান্তরাল সরলরেখা পাশাপাশি অবস্থান করলেও কখনো একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয় না, ঠিক তেমনই দেহ ও মন পাশাপাশি থাকলেও কেউ কাউকে প্রভাবিত করে না।
স্পিনোজার মতে, দেহ ও মন পরস্পরের উপর কোনো কার্য-কারণ সম্পর্ক স্থাপন করে না। দেহের কোনো পরিবর্তন হলে মনেরও পরিবর্তন হয় এবং মনের কোনো পরিবর্তন হলে দেহেরও পরিবর্তন হয়, কিন্তু একটি অপরটির কারণ নয়। উভয়ের পরিবর্তন একই মূল উৎস থেকে ঘটে।
স্পিনোজার দ্রব্যতত্ত্বঃ
স্পিনোজার সমান্তরালবাদ বুঝতে হলে তাঁর দ্রব্যতত্ত্ব সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। স্পিনোজা বলেন— যা স্বনির্ভর এবং নিজের অস্তিত্বের জন্য অন্য কোনো কিছুর উপর নির্ভরশীল নয়, তাই হলো দ্রব্য। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী তিনি ঈশ্বরকেই একমাত্র দ্রব্য হিসেবে স্বীকার করেন।
স্পিনোজার মতে, ঈশ্বর বা প্রকৃতি (God or Nature) হলো একমাত্র অনন্ত দ্রব্য। এই একমাত্র দ্রব্যের অসংখ্য গুণ বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা ঈশ্বরের মাত্র দুটি গুণ সম্পর্কে জানতে পারি। এই দুটি গুণ হলো— বিস্তৃতি (Extension) এবং চেতনা (Thought)।
দেহ হলো বিস্তৃতি নামক গুণের প্রকাশ এবং মন হলো চেতনা নামক গুণের প্রকাশ। অর্থাৎ দেহ ও মন একই ঈশ্বরীয় দ্রব্যের দুটি পৃথক গুণের প্রকাশ। তাই এদের মধ্যে কোনো বিরোধ বা পারস্পরিক প্রভাবের সম্পর্ক নেই।
স্পিনোজার মতে, বিস্তৃতি এবং চেতনা ঈশ্বরের মধ্যে একই সঙ্গে এবং সমান্তরালভাবে অবস্থান করে। তাই দেহ ও মনও সমান্তরালভাবে কাজ করে। একটি অন্যটির উপর প্রভাব বিস্তার করে না।
দেহ ও মনের সমান্তরাল সম্পর্কঃ
স্পিনোজা বলেন, যখন আমাদের দেহে কোনো পরিবর্তন ঘটে, তখন মনের মধ্যেও পরিবর্তন ঘটে। আবার যখন মনের মধ্যে কোনো পরিবর্তন ঘটে, তখন দেহেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলির মধ্যে কার্য-কারণ সম্পর্ক নেই। উভয় পরিবর্তন একই সময়ে এবং একই নিয়ম অনুসারে ঘটে।

যেমন— একজন ব্যক্তি যখন কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করে, তখন তার শরীরেও বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কিন্তু চিন্তা সরাসরি শরীরের পরিবর্তনের কারণ নয় এবং শরীরের পরিবর্তনও সরাসরি চিন্তার কারণ নয়। উভয়ই একই ঈশ্বরীয় নিয়মের অধীনে সমান্তরালভাবে ঘটে।
এই প্রসঙ্গে স্পিনোজা বলেন, ঈশ্বরের মধ্যে চেতনা এবং বিস্তৃতি চিরকাল অবস্থান করে। তাই যখনই কোনো দৈহিক পরিবর্তন ঘটে, তখনই তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মানসিক পরিবর্তন ঘটে এবং যখন মানসিক পরিবর্তন ঘটে তখন তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দৈহিক পরিবর্তন ঘটে।
সমালোচনাঃ স্পিনোজার সমান্তরালবাদ তত্ত্বটি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। অধ্যাপক গিলবার্ট রাইল (Gilbert Ryle) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “The Concept of Mind”-এ সমান্তরালবাদের বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়েছেন।
প্রথমত, স্পিনোজা তাঁর সমান্তরালবাদে বলেছেন, যেখানে দৈহিক ক্রিয়া আছে অর্থাৎ বিস্তৃতি আছে, সেখানে মানসিক ক্রিয়া অর্থাৎ চেতনা আছে। কিন্তু রাইলের মতে, আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় এর বিরোধী প্রমাণ পাওয়া যায়। কারণ সমস্ত বিস্তৃত বস্তুর চেতনা নেই। যেমন— পাথর, টেবিল, চেয়ার ইত্যাদির বিস্তৃতি আছে, কিন্তু তাদের কোনো মন বা চেতনা নেই।
দ্বিতীয়ত, সমান্তরালবাদ স্বীকার করলে সমস্ত দৈহিক ক্রিয়ার পাশাপাশি একটি মানসিক ক্রিয়াকে স্বীকার করতে হয়। এর ফলে সর্বমনবাদ (Panpsychism) তত্ত্বের উদ্ভব হয়। কিন্তু জড়বস্তুর মধ্যেও মন বা চেতনা আছে—এই মতবাদ বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
তৃতীয়ত, স্পিনোজা দেহ ও মনকে একই ঈশ্বরীয় দ্রব্যের দুটি গুণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই ব্যাখ্যা মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ আমরা দেহ ও মনের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অনুভব করি।
চতুর্থত, স্পিনোজার মতে দেহ ও মন পরস্পরের কারণ নয়, কিন্তু একই সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। এই একই সঙ্গে পরিবর্তনের বিষয়টি তিনি ঈশ্বরের উপর নির্ভর করে ব্যাখ্যা করেছেন, যা অনেকের কাছে সন্তোষজনক মনে হয় না।
উপসংহারঃ পরিশেষে বলা যায়, স্পিনোজার সমান্তরালবাদ দেহ ও মনের সম্পর্ক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ। যদিও এই মতবাদ বিভিন্ন সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে, তবুও ডেকার্তের দ্বৈতবাদের সমস্যার সমাধানের জন্য স্পিনোজার এই প্রচেষ্টা দর্শনের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
স্পিনোজা দেখাতে চেয়েছেন যে, দেহ ও মন দুটি পৃথক সত্তা নয়; বরং একই অনন্ত দ্রব্য ঈশ্বরের দুটি ভিন্ন প্রকাশ। এই কারণে তাঁর সমান্তরালবাদ আধুনিক মন-দেহ সম্পর্কের আলোচনায় একটি উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছে।
প্রশ্ন:- দ্রব্য সম্পর্কে স্পিনোজার মতবাদ আলোচনা কর।
অথবা, ‘দ্রব্য = ঈশ্বর = প্রকৃতি’ তত্ত্বটি আলোচনা কর।
উত্তর:- ডেকার্তের পথ অনুসরণ করে স্পিনোজাও স্বনির্ভরতাকে দ্রব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য বলেছেন। স্পিনোজার মতে, যা নিজেই নিজের অস্তিত্বশীল এবং যাকে নিজের সাহায্যে বোঝা যায় তাই হল দ্রব্য।
স্পিনোজা তাঁর অধিবিদ্যায় একমাত্র দ্রব্যের অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃত অর্থে দ্রব্য এক এবং অদ্বিতীয়। ডেকার্ত যেখানে মন ও দেহকে দুটি পৃথক দ্রব্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, সেখানে স্পিনোজা মনে করেন দুটি স্বতন্ত্র দ্রব্য থাকা যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ প্রকৃত দ্রব্য হতে হলে তাকে অবশ্যই সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বনির্ভর হতে হবে।
দ্রব্যের এই সংজ্ঞা থেকে কতগুলি সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়, সেগুলি হল—
১. দ্রব্য স্বয়ম্ভূ :-
দ্রব্য হল স্বয়ম্ভূ অর্থাৎ দ্রব্য নিজেই নিজের কারণ। স্পিনোজার মতে, দ্রব্য যদি স্বয়ম্ভূ না হয় তাহলে দ্রব্যকে অন্য কিছু দ্বারা উৎপন্ন হতে হবে, কিন্তু তা সম্ভব নয়।
স্পিনোজার মতে, যে বস্তু অন্য কোনো কিছুর উপর নির্ভর করে অস্তিত্ব লাভ করে, তাকে প্রকৃত দ্রব্য বলা যায় না। কারণ প্রকৃত দ্রব্যের অস্তিত্বের জন্য অন্য কোনো কারণের প্রয়োজন হয় না। তাই দ্রব্য হলো নিজের অস্তিত্বের নিজস্ব কারণ।
২. দ্রব্য অসীম ও অনন্ত :-
দ্রব্য যদি অনন্ত না হয় তবে তা হবে সীমিত বা সসীম। যদি সসীম হয় তবে তা অপরের উপর নির্ভরশীল হবে। কিন্তু দ্রব্য হল স্বনির্ভর।
স্পিনোজার মতে, দ্রব্যের কোনো সীমা থাকতে পারে না। কারণ সীমাবদ্ধতা মানে অন্য কিছুর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া। কিন্তু দ্রব্য যেহেতু স্বাধীন ও স্বনির্ভর, তাই তা অবশ্যই অসীম ও অনন্ত।
৩. দ্রব্য এক ও অদ্বিতীয় :-
স্পিনোজার মতে, দ্রব্য যেহেতু অসীম ও অনন্ত তাই কখনও সংখ্যায় বহু হতে পারে না। আবার বহু হলে তাকে অনন্ত বলা যাবে না।
স্পিনোজার মতে, যদি একাধিক দ্রব্য স্বীকার করা হয়, তাহলে প্রত্যেক দ্রব্যকে অপরের থেকে পৃথক হতে হবে। কিন্তু পৃথক হওয়ার অর্থ হলো সীমাবদ্ধ হওয়া। তাই প্রকৃত দ্রব্য একটিই হতে পারে।
৪. দ্রব্য সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন :-
যেহেতু দ্রব্য অনন্ত সেহেতু দ্রব্য স্বাধীন হতে বাধ্য। স্বাধীন না হলে দ্রব্য অন্য কিছুর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে, তাহলে দ্রব্যকে স্বনির্ভর বলা যাবে না।
স্পিনোজার মতে, দ্রব্য কোনো বাইরের শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। এটি নিজের নিয়মে অস্তিত্বশীল এবং নিজের স্বভাব অনুযায়ী প্রকাশিত হয়।
৫. দ্রব্য হল নির্বিশেষ :-
স্পিনোজার মতে, বিশেষিত করার অর্থ হল কোনো কিছুর অস্তিত্বকে অস্বীকার বা সীমিত করা। কাজেই দ্রব্য যেহেতু অনন্ত ও অসীম, সেহেতু দ্রব্য সম্পর্কে কোনো বিশেষণ দেওয়া যায় না।
তবে এখানে নির্বিশেষ বলতে এমন কোনো শূন্য সত্তাকে বোঝানো হয়নি, বরং এমন এক অনন্ত সত্তাকে বোঝানো হয়েছে যার মধ্যে সমস্ত বৈশিষ্ট্যের সম্ভাবনা বিদ্যমান।
৬. দ্রব্য সবকিছুর আশ্রয় :-
দ্রব্য যদি স্বনির্ভর হয় তাহলে অন্য সবকিছুকে দ্রব্যের উপর নির্ভর করতে হয় বলেই অন্য সবকিছু অস্তিত্বশীল। তাই সসীম বস্তু অসীম দ্রব্যের প্রকাশ।
স্পিনোজার মতে, জগতের সমস্ত বস্তু হলো একমাত্র অসীম দ্রব্যের বিভিন্ন রূপ বা প্রকাশ। মানুষ, প্রকৃতি এবং সমস্ত জাগতিক বস্তু সেই একমাত্র দ্রব্যের উপর নির্ভরশীল।
অতএব, স্পিনোজার মতে, দ্রব্য হল স্বয়ম্ভূ, অসীম ও অনন্ত, এক ও অদ্বিতীয়, শাশ্বত, নির্বিশেষ এবং সবকিছুর আশ্রয়।
দ্রব্য = ঈশ্বর = প্রকৃতি তত্ত্ব : স্পিনোজার মতে, একমাত্র প্রকৃত দ্রব্যই হলো ঈশ্বর। তিনি ঈশ্বরকে কোনো ব্যক্তিগত সৃষ্টিকর্তা হিসেবে গ্রহণ করেননি, যিনি জগতের বাইরে অবস্থান করেন। বরং তাঁর মতে, ঈশ্বরই প্রকৃতি এবং প্রকৃতিই ঈশ্বর। এই মতবাদকে বলা হয় সর্বেশ্বরবাদ (Pantheism)।
স্পিনোজার বিখ্যাত উক্তি হলো— “Deus sive Natura” অর্থাৎ “ঈশ্বর অথবা প্রকৃতি”। এর অর্থ হলো ঈশ্বর ও প্রকৃতির মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। প্রকৃতির সমস্ত অস্তিত্বই ঈশ্বরের প্রকাশ।
স্পিনোজার মতে, ঈশ্বরের অসংখ্য গুণ বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু মানুষের সীমিত জ্ঞানের কারণে আমরা মাত্র দুটি গুণ উপলব্ধি করতে পারি। এই দুটি গুণ হলো—
প্রথমত, চিন্তা (Thought) এবং দ্বিতীয়ত, বিস্তৃতি (Extension)।
চিন্তার মাধ্যমে মানসিক জগতের প্রকাশ ঘটে এবং বিস্তৃতির মাধ্যমে বস্তুজগতের প্রকাশ ঘটে। মন হলো ঈশ্বরের চিন্তা গুণের প্রকাশ এবং দেহ হলো ঈশ্বরের বিস্তৃতি গুণের প্রকাশ।
এই কারণে স্পিনোজার মতে, মন ও দেহ দুটি পৃথক দ্রব্য নয়; বরং একই দ্রব্যের দুটি ভিন্ন প্রকাশ। তাই তাঁর দর্শনে দেহ ও মনের মধ্যে কোনো কার্য-কারণ সম্পর্ক নেই, বরং তারা একই বাস্তবতার সমান্তরাল দুটি দিক।
স্পিনোজার মতে, জগতের সমস্ত পরিবর্তন ও বৈচিত্র্য একমাত্র ঈশ্বরীয় দ্রব্যের বিভিন্ন প্রকাশ মাত্র। সসীম বস্তু স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল নয়; তারা অসীম দ্রব্যের উপর নির্ভরশীল।
সমালোচনা :- দ্রব্য সম্পর্কে স্পিনোজার মতবাদ সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। স্পিনোজার দর্শনে দ্রব্য, ঈশ্বর ও প্রকৃতি এক হওয়ায় দ্রব্যের প্রকৃত স্বরূপ সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
দ্রব্য সম্পর্কে স্পিনোজার ব্যাখ্যা আমাদের কাছে সম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়। কারণ তাঁর মতে, দ্রব্য নির্বিশেষ; কিন্তু নির্বিশেষ দ্রব্যের স্বরূপ বুদ্ধির সাহায্যে উপলব্ধি করা সহজ নয়।
স্পিনোজার মতে, দ্রব্য এক অখণ্ড ঐক্য। সমালোচকদের মতে, তাঁর দর্শনে জাগতিক বৈচিত্র্যের যথেষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। কারণ যদি সবকিছু একমাত্র দ্রব্যের প্রকাশ হয়, তাহলে বিভিন্ন বস্তু ও তাদের পার্থক্য কীভাবে সম্ভব—এই প্রশ্নের উত্তর স্পিনোজা স্পষ্টভাবে দিতে পারেননি।
এছাড়াও স্পিনোজা অতীন্দ্রিয় ঈশ্বর থেকে জগৎ ও জাগতিক বস্তুর উৎপত্তি কীভাবে হয়, তা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি।
আরও একটি অভিযোগ হলো, স্পিনোজার মতবাদ মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাকে দুর্বল করে দেয়। কারণ তাঁর মতে, সমস্ত ঘটনা ঈশ্বরীয় প্রকৃতির নিয়ম দ্বারা নির্ধারিত।
উপসংহার :- পরিশেষে বলা যায়, স্পিনোজার দ্রব্য তত্ত্ব পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ একত্ববাদী মতবাদ। তাঁর মতে, একমাত্র অনন্ত ও অসীম দ্রব্যই হলো ঈশ্বর এবং সেই ঈশ্বরই প্রকৃতি হিসেবে প্রকাশিত হয়। যদিও তাঁর মতবাদ বিভিন্ন সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে, তবুও ঈশ্বর, প্রকৃতি ও জগতের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে স্পিনোজার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর “দ্রব্য = ঈশ্বর = প্রকৃতি” তত্ত্ব আধুনিক অধিবিদ্যার আলোচনায় একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
প্রশ্ন:- লাইবনিজের পূর্ব প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাবাদ ব্যাখ্যা কর। অথবা, দেহ ও মন সম্পর্কে লাইবনিজের মতবাদ ব্যাখ্যা কর।
ভূমিকা:- পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে দেহ ও মনের সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। ডেকার্তের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াবাদ, স্পিনোজার সমান্তরালবাদ এবং লাইবনিজের পূর্ব প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাবাদ—এই তিনটি মতবাদ দেহ ও মনের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দার্শনিক লাইবনিজ উপলক্ষবাদ এবং ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াবাদের অসুবিধা দূর করার উদ্দেশ্যে পূর্ব প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাবাদের মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেন।
পূর্ব প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাবাদের ধারণা:- লাইবনিজের মতে, দেহ ও মনের মধ্যে কোনো প্রত্যক্ষ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক নেই। আবার দেহ ও মনের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য ঈশ্বরকে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হয় না। ঈশ্বর সৃষ্টির সময়ই এমন একটি নিখুঁত ব্যবস্থা করে দিয়েছেন যার ফলে দেহ ও মন নিজেদের নিজস্ব নিয়ম অনুসারে চললেও তাদের মধ্যে সর্বদা সামঞ্জস্য বজায় থাকে। এই মতবাদই পূর্ব প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাবাদ (Pre-established Harmony) নামে পরিচিত।
উপলক্ষবাদের সমালোচনা:- লাইবনিজ উপলক্ষবাদ গ্রহণ করেননি। উপলক্ষবাদ অনুসারে, যখন দেহে কোনো পরিবর্তন ঘটে তখন ঈশ্বর মনের মধ্যে তার অনুরূপ পরিবর্তন ঘটান এবং যখন মনে কোনো ইচ্ছা সৃষ্টি হয় তখন ঈশ্বর সেই অনুযায়ী দেহের মধ্যে ক্রিয়া সম্পন্ন করেন। অর্থাৎ দেহ ও মনের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ঈশ্বরকে প্রত্যেক মুহূর্তে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
লাইবনিজের মতে, এই মত গ্রহণ করলে ঈশ্বরের পূর্ণতা ও অসীম ক্ষমতার সঙ্গে অসঙ্গতি দেখা দেয়। কারণ একজন পূর্ণসত্তা ঈশ্বরকে প্রতিনিয়ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনের কাজে নিয়োজিত থাকতে হবে—এটি গ্রহণযোগ্য নয়। তাই তিনি বলেন, ঈশ্বর সৃষ্টির সময়ই দেহ ও মনের মধ্যে একটি পূর্বনির্ধারিত সামঞ্জস্য স্থাপন করেছেন।
লাইবনিজের মতে মনার্ড ও দেহ-মনের সম্পর্ক:- লাইবনিজের দর্শনের মূল ভিত্তি হলো মনার্ড তত্ত্ব। তাঁর মতে, জগত অসংখ্য মনার্ড বা সরল সত্তার সমষ্টি। প্রত্যেক মনার্ড স্বাধীন ও স্বতন্ত্র হলেও তারা ঈশ্বরের দ্বারা নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে কাজ করে। একইভাবে দেহ ও মনও নিজেদের নিয়ম অনুযায়ী চললেও তাদের মধ্যে পূর্ব থেকেই একটি সামঞ্জস্য স্থাপিত রয়েছে।
লাইবনিজের মতে, মন হলো এক ধরনের মনার্ড এবং দেহ হলো অসংখ্য মনার্ডের সমষ্টি। মন নিজের নিয়মে চিন্তা ও ইচ্ছার পরিবর্তন ঘটায় এবং দেহ নিজের নিয়মে শারীরিক পরিবর্তন ঘটায়। কিন্তু ঈশ্বরের পূর্ব প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার কারণে এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য দেখা যায়।
ঘড়ির উপমা:- লাইবনিজ তাঁর পূর্ব প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাবাদকে বোঝানোর জন্য দুটি ঘড়ির উদাহরণ দিয়েছেন। তাঁর মতে, দুটি ঘড়ি একই সময় নির্দেশ করার তিনটি উপায় থাকতে পারে।
প্রথম শর্ত:- যদি দুটি ঘড়ি একই যান্ত্রিক নিয়মে তৈরি হয় এবং একই নিয়মে চলে, তাহলে তাদের কাঁটার গতি একই হবে এবং তারা একই সময় নির্দেশ করবে।
দ্বিতীয় শর্ত:- যদি একজন দক্ষ কারিগর নিয়মিতভাবে ঘড়ি দুটির কাঁটা মিলিয়ে দেন, তাহলেও দুটি ঘড়ি একই সময় দেখাবে।
তৃতীয় শর্ত:- যদি ঘড়ি দুটি তৈরির সময় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়, তাহলে কোনো বাহ্যিক সাহায্য ছাড়াই তারা একই সময় নির্দেশ করবে।
লাইবনিজ প্রথম শর্তটি গ্রহণ করেননি, কারণ এতে দেহ ও মনের মধ্যে সরাসরি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক স্বীকার করতে হয়। তিনি দ্বিতীয় শর্তটিও গ্রহণ করেননি, কারণ এতে ঈশ্বরকে বারবার হস্তক্ষেপ করতে হয়, যা ঈশ্বরের পূর্ণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাই লাইবনিজ তৃতীয় শর্তটি গ্রহণ করেন। তাঁর মতে, ঈশ্বর সৃষ্টির সময় মনার্ডগুলিকে এমন নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন যে তারা নিজেদের নিয়মে চললেও তাদের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় থাকে। ঠিক তেমনি দেহ ও মনও পূর্ব নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে চলে।
পূর্ব প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাবাদের বৈশিষ্ট্য:-
১) দেহ ও মন পরস্পরকে সরাসরি প্রভাবিত করে না।
২) দেহ ও মনের মধ্যে সামঞ্জস্য ঈশ্বরের পূর্ব পরিকল্পনার ফল।
৩) ঈশ্বর সৃষ্টির সময়ই এই শৃঙ্খলা স্থাপন করেছেন।
৪) দেহ ও মন স্বাধীনভাবে কাজ করলেও তাদের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় থাকে।
৫) এই মতবাদ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াবাদ ও উপলক্ষবাদের ত্রুটি দূর করার চেষ্টা করে।

সমালোচনা:- লাইবনিজের পূর্ব প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাবাদ বিভিন্ন দার্শনিকের সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে।
প্রথমত, লাইবনিজ দেহ ও মনের মধ্যে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার জন্য যে ঘড়ির উপমা ব্যবহার করেছেন তা সম্পূর্ণ সন্তোষজনক নয়। কারণ তৃতীয় শর্তেও ঈশ্বরের হস্তক্ষেপের কথা স্বীকার করতে হয়। ফলে উপলক্ষবাদের মতো এখানেও ঈশ্বরের ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, লাইবনিজ মনার্ডকে স্বাধীন ও স্বনির্ভর বলেছেন, আবার একই সঙ্গে বলেছেন যে তাদের কার্যকলাপ ঈশ্বরের দ্বারা পূর্ব নির্ধারিত। এর ফলে স্বাধীনতা ও পূর্বনির্ধারণের মধ্যে একটি অস্পষ্টতা দেখা যায়।
তৃতীয়ত, এই মতবাদে দেহ ও মনের মধ্যে প্রকৃত সম্পর্কের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। শুধু পূর্ব নির্ধারিত সামঞ্জস্যের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এই সামঞ্জস্য কীভাবে সম্ভব হয় তা স্পষ্ট নয়।
উপসংহার:- পরিশেষে বলা যায়, লাইবনিজের পূর্ব প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাবাদ দেহ ও মনের সম্পর্ক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ। যদিও এই মতবাদ নানা সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে, তবুও এটি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াবাদ ও উপলক্ষবাদের সমস্যার সমাধানের একটি উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা। আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনে দেহ ও মনের সম্পর্কের
সংশয়বাদ কাকে বলে? হিউমের সংশয়বাদ আলোচনা কর।
মানুষ সাধারণত জগৎ সম্পর্কে যে জ্ঞান অর্জন করেছে বলে দাবি করে সেই জ্ঞানের ক্ষেত্রে ভ্রান্ত ও অভ্রান্তের সন্দেহ পোষণ করার প্রবণতাকেই সংশয়বাদ বলে। সংশয়বাদীরা অপরের উক্তির ওপর নির্ভর করে কোন কিছু বিশ্বাস করতে রাজি হয় না। সমগ্র জগত এবং জগতের অংশ বিশেষ সম্বন্ধে শক্তিশালী যুক্তির সমর্থন থাকলেও সংশয়বাদীরা তাকে সংশয় মুক্ত মনে করেন না। যৌক্তিকভাবে যা কিছুকে সংশয় করা যায় এমন সমস্ত বিষয়কে সংশয়বাদীরা সংশয় করে থাকেন।
সংশয়বাদ (Skepticism) হলো পাশ্চাত্য দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানতাত্ত্বিক মতবাদ। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের জ্ঞানের প্রকৃতি, সীমা এবং নির্ভরযোগ্যতা বিচার করা। সংশয়বাদীরা মনে করেন যে, মানুষ যে সমস্ত বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছে বলে মনে করে, সেগুলির সবকিছুই সমানভাবে নিশ্চিত নয়। তাই কোনো বিষয়কে সত্য বলে গ্রহণ করার আগে তার যথাযথ প্রমাণ ও যুক্তি থাকা প্রয়োজন।
সংশয়বাদ শব্দটি গ্রিক ‘Skepsis’ শব্দ থেকে উৎপন্ন হয়েছে, যার অর্থ হলো অনুসন্ধান, বিচার বা পরীক্ষা। অর্থাৎ সংশয়বাদ অন্ধ অবিশ্বাস নয়; বরং সত্য অনুসন্ধানের একটি বিশেষ পদ্ধতি। কোনো বক্তব্য বা মতবাদকে গ্রহণ করার আগে তার যথার্থতা বিচার করাই সংশয়বাদের মূল বৈশিষ্ট্য।
সংশয়বাদীদের মতে, মানুষের ইন্দ্রিয় সীমাবদ্ধ এবং মানুষের যুক্তিশক্তিও সবসময় নির্ভুল নয়। তাই মানুষের অর্জিত জ্ঞানের মধ্যে ভুল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এই কারণে সংশয়বাদীরা জ্ঞানের দাবিগুলিকে পরীক্ষা করে দেখতে চান এবং যে বিষয়ের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই, সেটিকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন।
পাশ্চাত্য দর্শনে সর্বপ্রথম ডেকার্তই সংশয় দিয়ে দর্শন শুরু করেছিলেন। পরবর্তীকালে হিউমও মনে করেন যে সংশয়বাদ হলো সকল দার্শনিক আলোচনার অনিবার্য সূত্রপাত। যদিও হিউম একজন অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক তবুও তিনি জড়, মন বা আত্মাকে যুক্তি দ্বারা মেনে নেন। তিনি লকের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে অবশেষে সংশয়বাদে উপনীত হয়েছেন।
পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে সংশয়বাদের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। প্রাচীন গ্রিক দর্শনে পাইরো (Pyrrho)-এর মাধ্যমে সংশয়বাদ বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। পরবর্তীকালে আধুনিক দর্শনে ডেকার্ত সংশয়কে একটি পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি মনে করেছিলেন যে, সমস্ত সন্দেহজনক বিষয়কে বাদ দিয়ে এমন একটি সত্য খুঁজে বের করতে হবে যা কোনোভাবেই সন্দেহ করা যায় না। তাঁর বিখ্যাত উক্তি— “আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি” (Cogito Ergo Sum)—এই পদ্ধতিগত সংশয়ের ফল।
কিন্তু হিউমের সংশয়বাদ ডেকার্তের সংশয়বাদ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ডেকার্ত সংশয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত জ্ঞানের সন্ধান করেছিলেন, কিন্তু হিউম মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দেখানোর জন্য সংশয়বাদ ব্যবহার করেন। তাঁর মতে, মানুষের জ্ঞান মূলত অভিজ্ঞতানির্ভর এবং অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
হিউম ছিলেন অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক। তিনি লকের অভিজ্ঞতাবাদকে আরও কঠোরভাবে বিশ্লেষণ করেন। লক বলেছিলেন, মানুষের মন জন্মের সময় শূন্য থাকে এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করে। হিউম এই ধারণাকে গ্রহণ করে বলেন যে, মানুষের সমস্ত জ্ঞান অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে যেসব বিষয়ের কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই, সেসব বিষয়ে নিশ্চিত জ্ঞান দাবি করা যায় না।
হিউম মানুষের মনের বিষয়বস্তুকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছেন— Impressions (প্রত্যক্ষ অনুভূতি) এবং Ideas (ধারণা)। তাঁর মতে, Impressions হলো প্রত্যক্ষ, জীবন্ত ও শক্তিশালী অনুভূতি, যেমন—দেখা, শোনা, স্পর্শ করা ইত্যাদি। আর Ideas হলো সেই অনুভূতিগুলির দুর্বল প্রতিচ্ছবি বা স্মৃতি।
হিউমের মতে, প্রত্যেকটি ধারণার উৎস কোনো না কোনো প্রত্যক্ষ অনুভূতি। অর্থাৎ যে ধারণার পিছনে কোনো Impression নেই, সেই ধারণার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। এই নীতির ভিত্তিতে তিনি বহু প্রচলিত দার্শনিক ধারণার সমালোচনা করেন।
উদাহরণস্বরূপ, আমরা ‘ঈশ্বর’, ‘আত্মা’ বা ‘অপরিবর্তনীয় সত্তা’ সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা রাখি। কিন্তু এই ধারণাগুলির পেছনে কোনো প্রত্যক্ষ অনুভূতি আছে কিনা, তা হিউম প্রশ্ন করেন। তাঁর মতে, যেসব বিষয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রমাণ করা যায় না, সেগুলির সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান দাবি করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
হিউমের মতে মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হল বাহ্যজগতকে সত্য বলে মনে করা। হিউম বলেন বাহ্য বস্তুর অস্তিত্ব মনের ধারণা ছাড়া আর কিছু নয়। তাই বাহ্যবস্তুর অস্তিত্ব সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়।
হিউমের মতে, মানুষ সাধারণত বিশ্বাস করে যে আমাদের মনের বাইরে একটি স্বাধীন বাহ্যজগৎ রয়েছে। আমরা মনে করি যে, টেবিল, চেয়ার, গাছ, পাহাড় ইত্যাদি বস্তু আমাদের মনের বাইরে স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল। কিন্তু হিউম বলেন, আমরা সরাসরি কোনো বাহ্যবস্তুকে জানতে পারি না; আমরা কেবল আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত অনুভূতিগুলিকেই জানতে পারি।

যখন আমরা কোনো বস্তুকে দেখি, তখন আমরা তার রং, আকৃতি, গন্ধ বা স্পর্শ অনুভব করি। কিন্তু এই অনুভূতিগুলির বাইরে বস্তুটির স্বাধীন অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা প্রত্যক্ষ কোনো প্রমাণ পাই না। তাই বাহ্যজগতের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস থাকলেও তা দার্শনিকভাবে সম্পূর্ণ নিশ্চিত নয়।
তবে হিউম বাস্তব জীবনে বাহ্যজগতের অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি। তিনি স্বীকার করেন যে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য বাহ্যজগতের প্রতি বিশ্বাস অপরিহার্য। কিন্তু দার্শনিক বিচারের ক্ষেত্রে তিনি বলেন যে, এই বিশ্বাসের পক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ দেওয়া সম্ভব নয়।
তিনি আরো বলেন এমন অনেক ক্ষেত্র আছে যেখানে মনের ধারণা থাকলেও বাহ্যবস্তু বলে কিছু থাকে না। আবার কোন বস্তুর প্রমাণের সময় ঈশ্বরের ওপর নির্ভর করা যায় না কারণ ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণযোগ্য নয়। সুতরাং হিউম বলেন ইন্দ্রিয় লগ্ধ জ্ঞানে সংশয়বাদ অনিবার্য।
হিউমের মতে, মানুষের মন বিভিন্ন ধারণা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু সেই ধারণার সঙ্গে বাস্তব বস্তুর অস্তিত্ব সবসময় যুক্ত থাকে না। যেমন—মানুষ কল্পনার মাধ্যমে বিভিন্ন কাল্পনিক বিষয় সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে পারে। তাই শুধুমাত্র মনের মধ্যে কোনো ধারণা থাকার অর্থ এই নয় যে তার বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে।
ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কেও হিউম সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ঈশ্বরের অস্তিত্ব ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করা যায় না। তাই ঈশ্বরের অস্তিত্বকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করার ক্ষেত্রে মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ। তবে তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্বকে সরাসরি অস্বীকার করেননি; বরং বলেছেন যে, এটি বিশ্বাসের বিষয়, নিশ্চিত জ্ঞানের বিষয় নয়।
হিউমের সংশয়বাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কার্য-কারণ সম্পর্কের সমালোচনা। মানুষের সাধারণ ধারণা হলো, প্রত্যেক ঘটনার পেছনে একটি কারণ থাকে। কিন্তু হিউম বলেন, আমরা কখনোই কারণের কোনো বিশেষ শক্তিকে প্রত্যক্ষ করি না। আমরা শুধু দেখি যে একটি ঘটনার পরে আরেকটি ঘটনা নিয়মিতভাবে ঘটে।
যেমন, আগুনের সংস্পর্শে এলে কাপড় পুড়ে যায়। আমরা বারবার এই ঘটনা দেখতে দেখতে মনে করি যে আগুনই পোড়ার কারণ। কিন্তু আগুনের মধ্যে ‘পোড়ানোর শক্তি’ নামক কোনো বিষয়কে আমরা প্রত্যক্ষ করি না। তাই কার্য-কারণ সম্পর্ক যুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং অভ্যাস বা পুনরাবৃত্ত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এইভাবে হিউম দেখিয়েছেন যে মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ এবং অনেক প্রচলিত বিশ্বাসের ভিত্তি যুক্তিগত নিশ্চয়তা নয়, বরং অভ্যাস ও অভিজ্ঞতা। তাঁর সংশয়বাদ মানুষের জ্ঞানের সীমা নির্ধারণে এবং আধুনিক দর্শনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
সংশয়বাদের প্রকারভেদ:- পাশ্চাত্য দর্শনের সংশয়বাদকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে যথা- চরম সংশয়বাদ ও লঘু সংশয়বাদ। অর্থাৎ হিউম চরম সংশয়বাদ সমর্থন করেন না। তার মতে চরম সংশয়বাদ আমাদের সমাজে ও দৈনন্দিন জীবনে কোন উপকার করে না বরং বিলুপ্তি ঘটায়। অন্যদিকে লঘু সংশয়বাদ হলো এমন এক বিচক্ষণ দার্শনিকদের মতবাদ যেখানে সমাজের উন্নতি ঘটে। লঘু সংশয়বাদে এমন কতকগুলি গুন আছে যেগুলি যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত লাভে সাহায্য করে। গুনগুলি হল স্বাধীনতা, সংশয় এবং বিনয় দান। হিউমের মতে এই লঘু ও সংযত সংশয়বাদ আমাদের নির্দেশ দেয় যে মানুষের জ্ঞান সীমিত এবং সেই সীমা নির্ধারণ করা আমাদের উচিত।
সংশয়বাদের প্রকৃতি ও মাত্রার উপর ভিত্তি করে একে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়— চরম সংশয়বাদ (Extreme Skepticism) এবং লঘু বা সংযত সংশয়বাদ (Moderate Skepticism)। এই দুই ধরনের সংশয়বাদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো মানুষের জ্ঞানের সম্ভাবনা সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি।
চরম সংশয়বাদীরা মনে করেন যে মানুষের পক্ষে কোনো বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়। তারা সমস্ত ধরনের জ্ঞান, বিশ্বাস এবং সিদ্ধান্তের সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তাদের মতে, মানুষের ইন্দ্রিয় যেমন সীমাবদ্ধ, তেমনি যুক্তিশক্তিও সীমাবদ্ধ; তাই কোনো জ্ঞানকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
চরম সংশয়বাদের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের অহংকারপূর্ণ জ্ঞান-দাবিকে প্রশ্ন করা। মানুষ অনেক সময় মনে করে যে সে কোনো বিষয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ সত্য জানে, কিন্তু চরম সংশয়বাদীরা দেখান যে সেই জ্ঞানের মধ্যেও ভুলের সম্ভাবনা থাকতে পারে।
তবে চরম সংশয়বাদের একটি বড় সমস্যা হলো—যদি সব জ্ঞানকেই অস্বীকার করা হয়, তাহলে সংশয়বাদের নিজস্ব বক্তব্যও প্রশ্নের মুখে পড়ে। কারণ “কোনো জ্ঞান নিশ্চিত নয়”—এই বক্তব্যটিও যদি নিশ্চিতভাবে গ্রহণ করা না যায়, তাহলে চরম সংশয়বাদ নিজের ভিত্তিকেই দুর্বল করে ফেলে।
এই কারণেই হিউম চরম সংশয়বাদ গ্রহণ করেননি। তিনি মনে করেন, সম্পূর্ণ সংশয়বাদ মানুষের বাস্তব জীবন ও সামাজিক কার্যকলাপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মানুষকে দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, বিজ্ঞানচর্চা করতে হয় এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কাজ করতে হয়। চরম সংশয়বাদ গ্রহণ করলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
হিউমের মতে, মানুষের উচিত এমন একটি সংশয়বাদ গ্রহণ করা যা যুক্তিসঙ্গত, সংযত এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই সংশয়বাদকে বলা হয় লঘু সংশয়বাদ বা সংযত সংশয়বাদ।
লঘু সংশয়বাদ হলো এমন এক বিচক্ষণ দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে মানুষ কোনো বিষয়কে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে যুক্তি ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিচার করে। এই সংশয়বাদ মানুষের চিন্তাকে স্বাধীন করে এবং তাকে কুসংস্কার ও অযৌক্তিক বিশ্বাস থেকে মুক্ত করতে সাহায্য করে।
হিউমের মতে, লঘু সংশয়বাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে—
১. স্বাধীন চিন্তা (Freedom of Thought) : লঘু সংশয়বাদ মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখায়। কোনো ব্যক্তি, ধর্মীয় মতবাদ বা প্রচলিত বিশ্বাসকে শুধুমাত্র প্রথার কারণে গ্রহণ করা উচিত নয়। প্রত্যেকটি বিষয়কে যুক্তি ও অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করা উচিত।
২. যুক্তিসঙ্গত সংশয় (Reasonable Doubt) : লঘু সংশয়বাদ অযথা সন্দেহ করতে শেখায় না। বরং যেখানে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই, সেখানে সতর্ক থাকতে শেখায়। অর্থাৎ এটি ধ্বংসাত্মক সংশয় নয়; বরং সত্য অনুসন্ধানের একটি মাধ্যম।
৩. বিনয় (Humility) : হিউমের মতে, লঘু সংশয়বাদ মানুষের মধ্যে বৌদ্ধিক বিনয় সৃষ্টি করে। মানুষ বুঝতে শেখে যে তার জ্ঞান সীমিত এবং সবকিছু সম্পর্কে তার সম্পূর্ণ ধারণা নাও থাকতে পারে। এই বিনয় মানুষকে আরও অনুসন্ধিৎসু করে তোলে।
৪. অভিজ্ঞতার গুরুত্ব স্বীকার : লঘু সংশয়বাদ অভিজ্ঞতাকে জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে। হিউমের মতে, মানুষের জ্ঞান অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
হিউমের সংযত সংশয়বাদ মূলত মানুষের জ্ঞানের সীমা নির্ধারণের চেষ্টা করে। তিনি বলতে চান না যে মানুষ কোনো জ্ঞানই লাভ করতে পারে না। বরং তিনি দেখাতে চান যে মানুষের জ্ঞানের একটি নির্দিষ্ট পরিসর রয়েছে এবং সেই সীমার মধ্যেই আমাদের চিন্তা করা উচিত।
এই কারণে হিউমের সংশয়বাদকে অনেক দার্শনিক সমালোচনামূলক অভিজ্ঞতাবাদ (Critical Empiricism) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কারণ তিনি একদিকে যেমন অভিজ্ঞতাকে জ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন, অন্যদিকে তেমনি অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতাও দেখিয়েছেন।
হিউমের সংশয়বাদ বিশেষভাবে কার্য-কারণ সম্পর্ক, আত্মার ধারণা এবং অধিবিদ্যাগত জ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, মানুষের উচিত এমন কোনো দাবি গ্রহণ না করা, যার পেছনে যথেষ্ট অভিজ্ঞতালব্ধ প্রমাণ নেই।
উদাহরণস্বরূপ, মানুষ মনে করে ভবিষ্যৎ অতীতের মতোই হবে। কারণ আমরা অতীতে কোনো ঘটনা যেভাবে ঘটতে দেখেছি, ভবিষ্যতেও তা একইভাবে ঘটবে বলে আশা করি। কিন্তু হিউম বলেন, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এই বিশ্বাসের কোনো যৌক্তিক নিশ্চয়তা নেই; এটি কেবল অতীত অভিজ্ঞতার অভ্যাস থেকে সৃষ্টি হয়েছে।
এইভাবে হিউমের সংযত সংশয়বাদ মানুষের চিন্তাকে আরও যুক্তিনির্ভর ও সতর্ক করে তোলে। এটি মানুষকে অন্ধ বিশ্বাস থেকে দূরে রাখে এবং প্রতিটি জ্ঞানকে প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করতে শেখায়।
হিউমের মতে এই লঘু ও সংযত সংশয়বাদ আমাদের নির্দেশ দেয় যে মানুষের জ্ঞান সীমিত এবং সেই সীমা নির্ধারণ করা আমাদের উচিত।
অর্থাৎ হিউমের সংশয়বাদের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের জ্ঞানকে ধ্বংস করা নয়, বরং জ্ঞানের প্রকৃত সীমা নির্ধারণ করা। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে মানুষ তার অভিজ্ঞতার সীমার মধ্যে থেকেই জ্ঞান অর্জন করতে পারে এবং অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে চূড়ান্ত সত্য দাবি করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
এই কারণে হিউমের সংশয়বাদ আধুনিক দর্শনে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এটি একদিকে যেমন মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে তেমনি যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও স্বাধীন চিন্তার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
হিউমের সংশয়বাদের সমালোচনা:- হিউম একজন সংশয়বাদী দার্শনিক তাই তিনি সুনিশ্চিত জ্ঞানে বিশ্বাসী নন। তার মতে সব জ্ঞানই সম্ভাব্য। কিন্তু অনেকে আপত্তি জানিয়ে বলেছেন সংশয়বাদকে কোনমতেই সমর্থন করা যায় না। কারণ শুনিশ্চিত জ্ঞান যদি সম্ভব না হয় তাহলে হিউমের মতবাদ ও সুনিশ্চিত না হয়ে সম্ভাব্য হয়ে পড়বে।
হিউমের সংশয়বাদ পাশ্চাত্য দর্শনে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করলেও এটি বিভিন্ন দার্শনিকের কঠোর সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। সমালোচকদের মতে, হিউম মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছেন, ততটা জ্ঞানের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেননি। ফলে তাঁর সংশয়বাদ অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণ বলে মনে হয়েছে।
প্রথমত, হিউমের সংশয়বাদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হলো—এটি জ্ঞানের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। যদি মানুষের কোনো জ্ঞানই নিশ্চিত না হয় এবং সমস্ত জ্ঞান শুধুমাত্র সম্ভাব্য হয়, তাহলে বিজ্ঞান, দর্শন এবং সাধারণ জীবনের বহু বিশ্বাসের ভিত্তি নষ্ট হয়ে যায়। কারণ বিজ্ঞান বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, হিউমের সংশয়বাদ অনুযায়ী সেগুলিও সম্পূর্ণ নিশ্চিত নয়।
দ্বিতীয়ত, সমালোচকরা বলেন, হিউম কার্য-কারণ সম্পর্ককে শুধুমাত্র অভ্যাসের ফল বলেছেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ বিজ্ঞানের মূল ভিত্তিই হলো কার্য-কারণ সম্পর্ক। যদি কোনো ঘটনার সঙ্গে অন্য ঘটনার প্রকৃত সম্পর্ক না থাকে, তাহলে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও অসম্ভব হয়ে পড়বে।
যেমন—সূর্যের উদয় এবং পৃথিবীর আবর্তনের মধ্যে আমরা নিয়মিত সম্পর্ক দেখতে পাই। বিজ্ঞান এই ধরনের নিয়মিত সম্পর্কের ভিত্তিতেই বিভিন্ন ভবিষ্যৎ ঘটনা সম্পর্কে পূর্বাভাস দেয়। তাই কার্য-কারণ সম্পর্ককে শুধুমাত্র মানসিক অভ্যাস বলে ব্যাখ্যা করলে বিজ্ঞানের বাস্তব ভিত্তি প্রশ্নের মুখে পড়ে।
তৃতীয়ত, হিউম আত্মার অস্তিত্ব সম্পর্কে যে সংশয় প্রকাশ করেছেন, তারও সমালোচনা করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, আত্মাকে ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রত্যক্ষ করা যায় না বলেই তার অস্তিত্ব অস্বীকার করা যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যেগুলি সরাসরি প্রত্যক্ষ করা যায় না, কিন্তু তাদের অস্তিত্ব আমরা যুক্তির মাধ্যমে গ্রহণ করি।
চতুর্থত, ঈশ্বর সম্পর্কে হিউমের সংশয়বাদ নিয়েও সমালোচনা করা হয়েছে। অনেক দার্শনিকের মতে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব কেবল ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার বিষয় নয়; এটি যুক্তি, নৈতিকতা এবং অধিবিদ্যার বিষয়। তাই শুধুমাত্র অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিচার করা সঠিক নয়।
রাসেল হিউমের সংশয়বাদ সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে হিউমকে আন্তরিক সংশয়বাদ নয় বলে উল্লেখ করেছেন। এই বিষয়ে রাসেল বলেন সংশয়বাদের অনুশীলন করতে এগিয়ে হুম আন্তরিকতা বজায় রাখতে পারেননি। কেননা তিনি সমস্ত কিছুকে সংশয় করেছেন।
দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল হিউমের সংশয়বাদ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, হিউম প্রকৃত অর্থে একজন সম্পূর্ণ সংশয়বাদী ছিলেন না। কারণ বাস্তব জীবনে হিউম নিজেও বিভিন্ন বিশ্বাস ও অভ্যাসের উপর নির্ভর করতেন।
রাসেলের মতে, যদি হিউম তাঁর সংশয়বাদকে সম্পূর্ণভাবে জীবনে প্রয়োগ করতেন, তাহলে কোনো কাজ করাই সম্ভব হতো না। কারণ দৈনন্দিন জীবনে মানুষকে বিভিন্ন বিষয় বিশ্বাস করেই চলতে হয়। যেমন—আগামীকাল সূর্য উঠবে, অন্য মানুষদের অস্তিত্ব আছে, প্রকৃতির নিয়ম একই থাকবে—এই ধরনের বহু বিশ্বাসের উপর নির্ভর করেই মানুষ জীবন পরিচালনা করে।
তবে রাসেলের এই সমালোচনা সত্ত্বেও হিউমের সংশয়বাদের গুরুত্ব কমে যায় না। কারণ হিউমের উদ্দেশ্য মানুষের সমস্ত বিশ্বাস ধ্বংস করা ছিল না; বরং তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে মানুষের জ্ঞানের ভিত্তি ও সীমা সম্পর্কে আমাদের সচেতন থাকা উচিত।
হিউমের সংশয়বাদের মূল্যায়ন:- হিউমের সংশয়বাদকে শুধুমাত্র নেতিবাচক মতবাদ হিসেবে বিচার করা সঠিক নয়। তাঁর সংশয়বাদ আধুনিক দর্শনের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি দেখিয়েছেন যে মানুষের জ্ঞান সীমাহীন নয় এবং প্রতিটি জ্ঞানের দাবিকে যুক্তি ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিচার করা প্রয়োজন।
হিউমের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তিনি জ্ঞানের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে মানুষের চিন্তা ও ধারণার মূল উৎস হলো অভিজ্ঞতা। এর ফলে আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হয়।
হিউমের কার্য-কারণ সম্পর্কের বিশ্লেষণও দর্শনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও তাঁর ব্যাখ্যার সমালোচনা করা হয়েছে, তবুও তিনি প্রথম দেখিয়েছেন যে কার্য-কারণ সম্পর্ক সম্পর্কে মানুষের বিশ্বাসের ভিত্তি কীভাবে গঠিত হয়। এই বিশ্লেষণ পরবর্তীকালে ইমানুয়েল কান্টের দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
কান্ট স্বীকার করেছিলেন যে হিউমের সংশয়বাদ তাঁকে গভীরভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করেছিল। হিউমের প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার জন্যই কান্ট তাঁর সমালোচনামূলক দর্শন (Critical Philosophy) প্রতিষ্ঠা করেন।
হিউমের সংশয়বাদ মানুষের মধ্যে বৌদ্ধিক সতর্কতা সৃষ্টি করে। এটি শেখায় যে কোনো বিষয়কে শুধুমাত্র প্রচলিত বিশ্বাসের কারণে গ্রহণ করা উচিত নয়; বরং তার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ ও যুক্তি থাকা দরকার।
উপসংহার:- সবশেষে বলা যায়, হিউমের সংশয়বাদ পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী মতবাদ। তিনি মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে দেখিয়েছেন যে অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে কোনো নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়।
যদিও তাঁর সংশয়বাদ বিভিন্ন সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে, তবুও জ্ঞানতত্ত্ব, অভিজ্ঞতাবাদ এবং আধুনিক দর্শনের বিকাশে তাঁর অবদান অপরিসীম। হিউম মানুষের চিন্তাকে অন্ধ বিশ্বাস থেকে মুক্ত করে যুক্তি, অভিজ্ঞতা এবং সতর্ক বিচারের পথে পরিচালিত করেছেন।
তাই বলা যায়, হিউমের সংশয়বাদ কোনো ধ্বংসাত্মক সন্দেহের মতবাদ নয়; বরং এটি মানুষের জ্ঞানের সীমা নির্ধারণ এবং সত্য অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রচেষ্টা।
হিউমের মতে অনুষঙ্গের নিয়মগুলি আলোচনা কর।
উত্তর:- অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক হিউম তাঁর “An Enquiry Concerning Human Understanding” গ্রন্থে ধারণার অনুষঙ্গের নিয়মের উল্লেখ করেছেন। অনুষঙ্গের নিয়ম অনুসারে অভিজ্ঞতার প্রতিরূপগুলি মনের মধ্যে অনুষঙ্গবদ্ধভাবে থাকে। অর্থাৎ একটি প্রতিরূপের সঙ্গে অন্য একটি প্রতিরূপের সংযোগ স্থাপিত হয়। হিউমের জ্ঞানতত্ত্বে বলা হয়েছে, ধারণা (Idea) এবং মুদ্রণ (Impression) অনুষঙ্গের দ্বারা সংবদ্ধ হলে তবেই জ্ঞানের উদ্ভব হয়। হিউমের মতে, অনুষঙ্গের তিনটি নিয়ম আছে, যথা— সাদৃশ্য, সান্নিধ্য এবং কার্য-কারণ সম্পর্ক।
ডেভিড হিউম ছিলেন আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের একজন বিশিষ্ট অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক। তাঁর মতে মানুষের সমস্ত জ্ঞানের মূল উৎস হলো অভিজ্ঞতা। মানুষের মন জন্মের সময় কোনো সহজাত ধারণা নিয়ে আসে না; বরং ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিভিন্ন অনুভূতি বা মুদ্রণ (Impression) লাভ করে এবং সেই মুদ্রণের ভিত্তিতে ধারণা (Idea) তৈরি হয়।
হিউম মনে করেন, মানুষের মন শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন ধারণার সমষ্টি নয়। বিভিন্ন ধারণার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সম্পর্ক বা সংযোগ রয়েছে। এই সংযোগের কারণেই মানুষের চিন্তা একটি ধারাবাহিক রূপ লাভ করে। একটি ধারণা মনের মধ্যে উপস্থিত হলে তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত অন্য ধারণাও স্বাভাবিকভাবে মনে উপস্থিত হয়। এই ধারণাগুলির মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের নিয়মগুলিকেই হিউম অনুষঙ্গের নিয়ম বলেছেন।
🔷 এই তিন প্রকার নিয়মকে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো—
🟪 সাদৃশ্য অনুষঙ্গের নিয়ম:- যখন দুই বা ততোধিক বস্তুর মধ্যে আকারগত বা গুণগত সাদৃশ্য থাকে, তখন একটির প্রতিরূপ অন্যটির জ্ঞাতিরূপের কথা মনে জাগিয়ে তোলে। যেমন— কোনো প্রতিকৃতি স্বাভাবিকভাবে আমাদের মূল বস্তুর কথা মনে করিয়ে দেয়।
সাদৃশ্যের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের মধ্যে বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ মিল থাকার কারণে তাদের ধারণার মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। মানুষের মন স্বাভাবিকভাবেই পরিচিত কোনো বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এমন অন্য বস্তুর কথা স্মরণ করে।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তির ছবি দেখলে আমরা সেই ব্যক্তির কথা মনে করি। কারণ ছবির সঙ্গে ব্যক্তির মুখমণ্ডলের সাদৃশ্য রয়েছে। একইভাবে কোনো দেশের মানচিত্র দেখলে সেই দেশের প্রকৃত অবস্থানের কথা আমাদের মনে পড়ে।
এই নিয়ম মানুষের স্মৃতি ও কল্পনার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ সাদৃশ্যের মাধ্যমে একটি ধারণা অন্য একটি ধারণাকে সহজেই মনে জাগিয়ে তোলে।
🟪 সান্নিধ্য অনুষঙ্গের নিয়ম:- অতীতে যে সমস্ত বস্তু স্থান ও কালের দিক থেকে কাছাকাছি অবস্থান করেছে, সেগুলি সান্নিধ্য অনুষঙ্গের নিয়ম অনুসারে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং একটি প্রতিরূপ অপরটির প্রতিরূপের কথা মনে জাগিয়ে তোলে। যেমন— বিদ্যুতের চমক বজ্রধ্বনির কথা মনে করিয়ে দেয়। আবার রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়লে শান্তিনিকেতনের কথা মনে পড়ে।
সান্নিধ্য অনুষঙ্গের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের মধ্যে স্থানগত বা কালগত নৈকট্য থাকে। কোনো দুটি ঘটনা যদি একই সময়ে বা একই স্থানে সংঘটিত হয়, তাহলে পরবর্তীকালে একটি বিষয়ের স্মৃতি অন্য বিষয়ের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে।
যেমন— বিদ্যালয়ের কথা মনে পড়লে শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক এবং সহপাঠীদের কথা মনে আসে। কারণ এই সমস্ত বিষয় একই স্থান ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত।
হিউমের মতে, মানুষের দৈনন্দিন চিন্তা ও স্মৃতির ক্ষেত্রে সান্নিধ্য অনুষঙ্গের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতাগুলি এই নিয়মের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
🟪 কার্য-কারণ অনুষঙ্গের নিয়ম:- এই নিয়ম অনুসারে কারণ থেকে কার্যের এবং কার্য থেকে কারণের কথা মনে পড়ে। যেমন— যখন আমরা কোনো আঘাতের কথা চিন্তা করি, তখন সেই আঘাত থেকে যে বেদনার উদ্ভব হয়, তাকে আমরা চিন্তা না করে পারি না। কারণ আঘাত ও বেদনা কার্য-কারণ সম্পর্কের অনুষঙ্গের নিয়ম অনুসারেই সংবদ্ধ হয়।
কার্য-কারণ অনুষঙ্গ হিউমের অনুষঙ্গ তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম। মানুষের অভিজ্ঞতায় যখন দুটি ঘটনা নিয়মিতভাবে একসঙ্গে ঘটে, তখন মানুষের মনে তাদের মধ্যে একটি সম্পর্কের ধারণা সৃষ্টি হয়।
যেমন— ধোঁয়া দেখলে আগুনের কথা মনে পড়ে। কারণ আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতায় ধোঁয়া ও আগুনকে একসঙ্গে দেখতে পেয়েছি। তবে হিউমের মতে, আমরা কারণের কোনো অন্তর্নিহিত শক্তিকে প্রত্যক্ষ করি না; বরং নিয়মিত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমাদের মনে কারণ ও কার্যের সম্পর্কের ধারণা তৈরি হয়।
এই কার্য-কারণ অনুষঙ্গ মানুষের জ্ঞান ও দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের অনেক প্রত্যাশা অতীত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
হিউমের অনুষঙ্গ তত্ত্বের গুরুত্ব:- হিউমের অনুষঙ্গের নিয়ম মানুষের চিন্তার প্রকৃতি ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে মানুষের চিন্তা এলোমেলো নয়; বরং নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

এই তত্ত্ব শুধু দর্শনের ক্ষেত্রেই নয়, পরবর্তীকালে মনোবিজ্ঞানেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। মানুষের স্মৃতি, কল্পনা এবং চিন্তার প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে হিউমের অনুষঙ্গ তত্ত্ব বিশেষ সহায়ক হয়েছে।
তবে অনেক দার্শনিক মনে করেন, মানুষের সমস্ত চিন্তাকে শুধুমাত্র সাদৃশ্য, সান্নিধ্য ও কার্য-কারণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। মানুষের যুক্তিশক্তি, সৃজনশীলতা এবং বিচার ক্ষমতারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
উপসংহার:- সবশেষে বলা যায়, হিউমের অনুষঙ্গের নিয়ম তাঁর অভিজ্ঞতাবাদী দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি দেখিয়েছেন যে মানুষের ধারণাগুলি কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং কীভাবে সেই সম্পর্কের মাধ্যমে জ্ঞানের বিকাশ ঘটে।
যদিও হিউমের অনুষঙ্গ তত্ত্ব বিভিন্ন সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে,
প্রশ্ন:- হিউমের মতে ধারণা ও মুদ্রণের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর।
অথবা, “যেখানে মুদ্রণ নেই সেখানে কোন ধারণা নেই”- এই মতটি ব্যাখ্যা কর।
🔷উত্তর:- যদিও হিউম একজন অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক তবুও জ্ঞান গঠনের ক্ষেত্রে তিনি লকের থেকে একটু ভিন্ন মতবাদ পোষণ করেছেন। লকের মতে আমাদের জ্ঞানের উপকরণ হলো ধারণা কিন্তু হিউম এই মতবাদের বিরোধিতা করে বলেছেন জ্ঞানের উপকরণ ধারণা নয়, প্রত্যক্ষণ। হিউম সমস্ত প্রত্যক্ষণকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন, যথা- ইন্দ্রিয়জ বা মুদ্রণ এবং ধারণা।
হিউমের জ্ঞানতত্ত্বকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে প্রথমেই তাঁর ‘প্রত্যক্ষণ’ (Perception) ধারণাটি বুঝতে হয়। হিউমের মতে, মানুষের মনের মধ্যে যা কিছু উপস্থিত হয়, তা প্রত্যক্ষণের অন্তর্ভুক্ত। এই প্রত্যক্ষণকে তিনি প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করেছেন—মুদ্রণ (Impression) এবং ধারণা (Idea)। মুদ্রণ হলো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফলে সৃষ্ট শক্তিশালী ও জীবন্ত অনুভূতি এবং ধারণা হলো সেই মুদ্রণের অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিরূপ।
হিউমের এই বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝা যায় যে মানুষের জ্ঞান কোনো জন্মগত বা অভিজ্ঞতাবহির্ভূত বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই জ্ঞানের প্রাথমিক উপাদান পাওয়া যায়। পরে সেই অভিজ্ঞতার স্মৃতি, কল্পনা বা চিন্তার মাধ্যমে ধারণার সৃষ্টি হয়।
এই দুই প্রকার জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য আলোচনা করা হলো–
1️⃣ প্রথমত:-
যে সকল প্রত্যক্ষণ সব থেকে বেশি শক্তি ও বেশি তীব্রতা নিয়ে আমাদের মনে প্রবেশ করে তাদের আমরা ইন্দ্রিয়জ বা মুদ্রণ বলি। অন্যদিকে যখন এই ইন্দ্রিয়জ গুলি অস্পষ্ট ও খিন আকারে আমাদের মনে উপস্থিত হয় তখন তাকে ধারণা বলি।
অর্থাৎ মুদ্রণ এবং ধারণার মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো তাদের শক্তি ও তীব্রতার পার্থক্য। মুদ্রণ আমাদের মনে প্রত্যক্ষভাবে এবং প্রবলভাবে উপস্থিত হয়। যেমন—আমরা যখন সরাসরি আগুন দেখি, আগুনের তাপ অনুভব করি অথবা কোনো ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনি, তখন যে প্রত্যক্ষ অনুভূতি হয় তা হলো মুদ্রণ।
অন্যদিকে, সেই আগুনের কথা পরে মনে করলে বা সেই ব্যক্তির কণ্ঠস্বরের কথা স্মরণ করলে যে মানসিক প্রতিরূপ আমাদের মনে তৈরি হয়, তা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। এই দুর্বল মানসিক প্রতিরূপই হলো ধারণা।
তাই বলা যায়, মুদ্রণ হলো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার জীবন্ত অনুভূতি এবং ধারণা হলো সেই অভিজ্ঞতার অপেক্ষাকৃত দুর্বল মানসিক প্রতিচ্ছবি।
2️⃣ দ্বিতীয়ত:-
আমরা প্রথমে লাভ করি মুদ্রন এবং পরে লাভ করি ধারণা। তাই হিউম বলেন মুদ্রণ না হলে ধারণা হয় না।
এর দ্বারা হিউম বোঝাতে চেয়েছেন যে মুদ্রণ ধারণার পূর্ববর্তী। মানুষ প্রথমে কোনো বিষয়কে প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করে এবং পরে সেই অনুভূতির স্মৃতি বা মানসিক প্রতিরূপ থেকে ধারণা লাভ করে। যেমন, একটি গোলাপকে প্রথমবার দেখার সময় তার রং, আকার ও গন্ধ সম্পর্কে যে প্রত্যক্ষ অনুভূতি হয় তা মুদ্রণ। পরে গোলাপটি সামনে না থাকলেও তার রং বা গন্ধ সম্পর্কে যখন আমরা মনে মনে চিন্তা করি, তখন সেটি ধারণা।
এই কারণে হিউমের মতে, ধারণা স্বাধীনভাবে উৎপন্ন হয় না; তার পেছনে কোনো না কোনো পূর্ববর্তী মুদ্রণ থাকে। মুদ্রণ ছাড়া ধারণার উৎপত্তি সম্ভব নয়।
3️⃣ তৃতীয়ত:-
হিউমের মতে ইন্দ্রিয়জ বা মুদ্রণ বেশি সজীব এবং অন্যদিকে ধারণা মুদ্রনের তুলনায় কম সজীব।
মুদ্রণ ও ধারণা উভয়ই মনের প্রত্যক্ষণ হলেও তাদের মধ্যে সজীবতার পার্থক্য রয়েছে। মুদ্রণ প্রত্যক্ষভাবে অনুভূত হয় বলে তার মধ্যে বেশি প্রাণবন্ততা ও শক্তি থাকে। কিন্তু ধারণা প্রত্যক্ষ অনুভূতির পুনরাবৃত্তি বা স্মৃতির মাধ্যমে মনের মধ্যে উপস্থিত হয় বলে তা অপেক্ষাকৃত কম সজীব।
যেমন, আমরা যখন সরাসরি কোনো মিষ্টি খাই, তখন তার স্বাদ সম্পর্কে যে অনুভূতি হয় তা অত্যন্ত তীব্র। কিন্তু পরে সেই মিষ্টির স্বাদ মনে করার সময় যে অনুভূতি হয় তা আগের মতো তীব্র হয় না। প্রথমটি মুদ্রণ এবং দ্বিতীয়টি ধারণা।
এই পার্থক্য থেকেই হিউম মুদ্রণকে ধারণার তুলনায় অধিক শক্তিশালী ও জীবন্ত বলে মনে করেছেন।
4️⃣ চতুর্থত:-
হিউমের মতে যেখানে মুদ্রণ নেই, সেখানে কোনো ধারণা থাকতে পারে না। এক কথায় মুদ্রার না হলে ধারণা হয় না, কিন্তু ধারণা না হলেও মুদ্রণ সম্ভব।

এই বক্তব্যটি হিউমের জ্ঞানতত্ত্বের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি। তাঁর মতে, কোনো ধারণার উৎস অনুসন্ধান করলে শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কোনো মুদ্রণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। অর্থাৎ যে ধারণার পেছনে কোনো অভিজ্ঞতালব্ধ মুদ্রণ নেই, সেই ধারণার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।
এই নীতির সাহায্যে হিউম বিভিন্ন দার্শনিক ধারণার সত্যতা বিচার করতে চেয়েছেন। কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো ধারণার কথা বলেন যার কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতালব্ধ উৎস নেই, তাহলে হিউম সেই ধারণার উৎপত্তি ও বৈধতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলবেন।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—মুদ্রণ ধারণার কারণ হলেও ধারণা মুদ্রণের কারণ নয়। কারণ আমরা প্রথমে প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করি, তারপর সেই অনুভূতির স্মৃতি বা মানসিক প্রতিরূপ হিসেবে ধারণা লাভ করি।
5️⃣ পঞ্চমত, মুদ্রণ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু ধারণা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার পরবর্তী মানসিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ মুদ্রণ হলো অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ ফল এবং ধারণা হলো সেই অভিজ্ঞতার স্মৃতি বা চিন্তাজাত প্রতিরূপ।
6️⃣ ষষ্ঠত, মুদ্রণ সাধারণত বর্তমান অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো বস্তু এখন আমাদের সামনে থাকলে আমরা তাকে প্রত্যক্ষ করি এবং তার সম্পর্কে একটি শক্তিশালী অনুভূতি লাভ করি। কিন্তু ধারণা বর্তমান অভিজ্ঞতার অনুপস্থিতিতেও মনে থাকতে পারে। আমরা কোনো বস্তুকে সামনে না দেখেও তার সম্পর্কে চিন্তা করতে পারি।
7️⃣ সপ্তমত, মুদ্রণ ও ধারণার মধ্যে একটি অনুকরণ বা Copy-এর সম্পর্ক রয়েছে। হিউমের মতে, ধারণা হলো মুদ্রণের অপেক্ষাকৃত দুর্বল অনুলিপি। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার যে শক্তিশালী ছাপ আমাদের মনে পড়ে, পরবর্তীকালে তার দুর্বল প্রতিরূপ হিসেবে ধারণা উপস্থিত হয়। এই কারণে হিউমের মতবাদকে অনেক সময় Copy Principle-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
8️⃣ অষ্টমত, মুদ্রণ সরাসরি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভূত হওয়ায় তার মধ্যে বাস্তব অভিজ্ঞতার শক্তি বেশি থাকে। ধারণা সেই অভিজ্ঞতার উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তার মধ্যে প্রত্যক্ষতার মাত্রা কম। তাই ধারণার তুলনায় মুদ্রণকে বেশি জীবন্ত বলা হয়।
9️⃣ নবমত, মুদ্রণ থেকেই সরল ধারণার সৃষ্টি হয়। যেমন—লাল রং দেখা, মিষ্টি স্বাদ অনুভব করা, গরম অনুভব করা ইত্যাদি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা মুদ্রণ। পরে এই অভিজ্ঞতাগুলির মানসিক প্রতিরূপ থেকে লাল, মিষ্টি বা গরম সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। আবার একাধিক সরল ধারণাকে মন যুক্ত করে জটিল ধারণাও গঠন করতে পারে।
🔟 দশমত, হিউমের এই মতবাদ অভিজ্ঞতাবাদের মূল নীতিকে আরও সুস্পষ্ট করে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে মানুষের জ্ঞানের ভিত্তি কোনো কাল্পনিক বা জন্মগত ধারণা নয়; বরং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। তাই কোনো ধারণাকে গ্রহণ করার আগে তার অভিজ্ঞতালব্ধ উৎস অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
এইভাবে হিউম মুদ্রণ ও ধারণার পার্থক্যের মাধ্যমে মানুষের জ্ঞানের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, মুদ্রণ হলো জ্ঞানের প্রাথমিক ও শক্তিশালী উপাদান এবং ধারণা হলো সেই মুদ্রণের অপেক্ষাকৃত দুর্বল মানসিক প্রতিরূপ। মুদ্রণ ছাড়া ধারণার অস্তিত্ব সম্ভব নয়—এই বক্তব্যই তাঁর অভিজ্ঞতাবাদী জ্ঞানতত্ত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা যখন কোনো সুন্দর ফুল দেখি, তখন ফুলটির রং, আকার ও গন্ধ সম্পর্কে যে প্রত্যক্ষ অনুভূতি লাভ করি সেটি মুদ্রণ। পরে ফুলটি সামনে না থাকলেও তার রং, আকার বা গন্ধ সম্পর্কে মনে যে চিন্তা তৈরি হয় সেটি ধারণা। একইভাবে, আনন্দ, দুঃখ, ভয়, রাগ ইত্যাদির প্রত্যক্ষ অনুভূতিও মুদ্রণের অন্তর্ভুক্ত; পরে এগুলির স্মৃতি বা চিন্তা ধারণা হিসেবে মনে উপস্থিত হয়।
হিউমের এই মতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো—মানুষের সমস্ত ধারণার উৎস অনুসন্ধান করা সম্ভব। কোনো ধারণার উৎস হিসেবে যদি কোনো মুদ্রণ খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে সেই ধারণা সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এই নীতির মাধ্যমে হিউম বহু প্রচলিত অধিবিদ্যাগত ধারণার সমালোচনা করেছিলেন।
পরিশেষে বলা যায়, হিউমের মতে মুদ্রণ ও ধারণা একই ধরনের মানসিক প্রত্যক্ষণ হলেও তাদের মধ্যে শক্তি, তীব্রতা, সজীবতা এবং উৎপত্তির দিক থেকে পার্থক্য রয়েছে। মুদ্রণ হলো প্রত্যক্ষ, শক্তিশালী ও জীবন্ত অনুভূতি; আর ধারণা হলো সেই মুদ্রণের অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিরূপ। তাই হিউমের বিখ্যাত বক্তব্য—“যেখানে মুদ্রণ নেই, সেখানে কোনো ধারণা নেই”—তাঁর অভিজ্ঞতাবাদী জ্ঞানতত্ত্বের মূল বক্তব্যকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।
হেগেলের বস্তুগত ভাববাদ কী? হেগেলের বস্তুগত ভাববাদ বা পরমবস্তুবাদ আলোচনা কর।
উত্তর:- হেগেলের বস্তুগত ভাববাদে বা পরমব্রহ্মবাদে পাশ্চাত্য ভাববাদী দর্শনের চরম পরিণতি ঘটে। হেগেলের মতে, পরম আত্মা বিশ্বের চরম তত্ত্ব। এই পরম আত্মা হল—পরম ধীশক্তি। হেগেলের পরম আত্মা ফিকটের পরম আত্মার মতো নির্গুণ বা কেবলাদ্বৈত নয়, এ হল বিশিষ্টাদ্বৈত। এককথায়, হেগেলের পরম আত্মা শাশ্বত সামান্য ধারণাসমূহের এক সুসংহত ধারণা-সমষ্টি।
হেগেলের পরমবস্তুবাদ বুঝতে হলে প্রথমেই জানতে হবে যে, তাঁর মতে বাস্তবতা কোনো বিচ্ছিন্ন ও স্থির বিষয়ের সমষ্টি নয়। বাস্তবতা একটি সামগ্রিক, যুক্তিসংগত এবং বিকাশশীল ঐক্য। এই সমগ্র বাস্তবতার মূল ভিত্তি হল পরম সত্তা বা পরম আত্মা। পরম আত্মা নিজের মধ্যে সম্পূর্ণ হলেও তা নিষ্ক্রিয় নয়; বরং তার মধ্যে আত্মবিকাশের প্রবণতা রয়েছে। এই আত্মবিকাশের মধ্য দিয়েই পরম আত্মা নিজেকে প্রকৃতি, মানবচেতনা, সমাজ, ইতিহাস, ধর্ম, শিল্প এবং দর্শনের বিভিন্ন স্তরে প্রকাশ করে।
হেগেলের বস্তুগত ভাববাদ বা পরম ব্রহ্মবাদ অনুসারে, পরমাত্মা, ঈশ্বর ও জগৎ পরস্পর সাপেক্ষ। জগৎ যে কেবলমাত্র ঈশ্বরের ধারণা, তা নয়; তা ঈশ্বরের অপরিহার্য বাস্তব রূপ বা শক্তিক্রিয়ার বাস্তব পরিণতি। জগৎ যেমন ঈশ্বরের চৈতন্য ছাড়া থাকতে পারে না, তেমনি ঈশ্বরও তাঁর অপরিহার্য বিষয়রূপে জগৎকে ছাড়া থাকতে পারেন না। বার্কলে শুধু বলেছেন যে জগৎ ঈশ্বরের ধারণা মাত্র, ঈশ্বর জগতের নিষ্ক্রিয় স্রষ্টা। তাই বার্কলের মতবাদ মূলত আত্মগত ভাববাদ বা কেবল বিজ্ঞানবাদ। কিন্তু হেগেলের মতে, জগৎ ঈশ্বরের স্বপ্রকাশিত বাস্তব রূপ। পরমাত্মা ঈশ্বরের মনগত ধারণা নয়; কেননা যদি পরমাত্মা শুধু ঈশ্বরের ধারণা হতো, তাহলে এত বৈচিত্র্য থাকত না। তাই হেগেল বলেন, জগৎ হল পরম আত্মার আত্মপ্রকাশিত শক্তিক্রিয়ার পরিণতি।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে হেগেল জগৎকে অবাস্তব বা নিছক মনের ধারণা হিসেবে গ্রহণ করেননি। তাঁর মতে, জগৎ পরমের আত্মপ্রকাশের একটি অপরিহার্য স্তর। পরম সত্তা নিজের প্রকৃত স্বরূপকে উপলব্ধি করার জন্য নিজেকে বহির্জগতে প্রকাশ করে। তাই প্রকৃতি ও জগৎকে পরমের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। আবার জগতের বৈচিত্র্যের মধ্যেও একটি মৌলিক ঐক্য রয়েছে, কারণ এই বৈচিত্র্যের অন্তর্নিহিত ভিত্তি হল একই পরম সত্তা।
হেগেলের এই মতবাদ বার্কলের আত্মগত ভাববাদ থেকে পৃথক। বার্কলের মতে, জাগতিক বস্তুর অস্তিত্ব মূলত ঈশ্বরের দ্বারা প্রত্যক্ষিত হওয়ার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু হেগেলের কাছে জগৎ শুধু কোনো ব্যক্তিগত চেতনার ধারণা নয়। জগৎ হল পরম আত্মার আত্মবিকাশের বাস্তব প্রকাশ। তাই হেগেলের ভাববাদকে নিছক ব্যক্তিগত বা আত্মগত ভাববাদ বলা যায় না।
উক্ত বিষয়টি বোঝার জন্য হেগেলের দ্বন্দ্বমূলক বিকাশের ধারণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হেগেলের মতে, পরম সত্তা নিজেকে এক ধাপে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করে না। তার মধ্যে একটি ক্রমবিকাশের ধারা রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট অবস্থা বা ধারণার মধ্যে যখন অন্তর্নিহিত বিরোধ দেখা দেয়, তখন সেই বিরোধের মধ্য দিয়ে একটি নতুন ও উন্নততর অবস্থার সৃষ্টি হয়। এইভাবে বাস্তবতা ক্রমাগত পরিবর্তিত ও বিকশিত হতে থাকে। এই দ্বন্দ্বমূলক বিকাশের মধ্য দিয়েই পরম আত্মা নিজের সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হয়ে ওঠে।
হেগেলের দর্শনে দ্বন্দ্ব কোনো নিছক ধ্বংসাত্মক বিরোধ নয়। দ্বন্দ্বই বিকাশের প্রধান চালিকাশক্তি। একটি ধারণা তার নিজস্ব সীমাবদ্ধতার কারণে বিপরীত ধারণার জন্ম দেয় এবং পরবর্তীতে উভয়ের মধ্যে উচ্চতর সমন্বয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে বিকাশের প্রতিটি নতুন স্তর পূর্ববর্তী স্তরকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার না করে তার সত্য অংশকে ধারণ করে আরও উন্নত রূপ লাভ করে। এই কারণে হেগেলের দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিকে বাস্তবতার গতিশীল বিকাশের পদ্ধতি বলা হয়।
হেগেলের মতে, পরমের আত্মবিকাশের বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে। প্রথমে পরম নিজেকে বিশুদ্ধ ভাব বা ধারণার ক্ষেত্রে প্রকাশ করে। এরপর তা প্রকৃতির রূপ ধারণ করে এবং সর্বশেষে আত্মা বা Spirit-এর মধ্যে নিজের সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। অর্থাৎ পরম ভাবের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হল—ভাব, প্রকৃতি এবং আত্মা। আত্মার মধ্যে পরম সত্তা নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে আত্মসচেতনতা লাভ করে।
প্রকৃতির ক্ষেত্রে পরম সত্তা নিজের বহির্মুখী রূপ প্রকাশ করে। প্রকৃতিতে আমরা স্থান, কাল, বস্তু, পরিবর্তন ইত্যাদির বৈচিত্র্য দেখতে পাই। কিন্তু প্রকৃতি নিজে নিজের প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে সচেতন নয়। মানুষের চেতনার মধ্যে এসে পরম সত্তা নিজের সম্পর্কে সচেতন হতে শুরু করে। তাই হেগেলের দর্শনে মানবচেতনা বা আত্মার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
ব্যক্তি-আত্মা থেকে পরম আত্মার বিকাশ সমাজ ও ইতিহাসের মধ্য দিয়েও ঘটে। মানুষের চিন্তা, কর্ম, নৈতিকতা এবং সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে আত্মসচেতনতা ক্রমশ বিকশিত হয়। পরিবার, নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রের মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যক্তি তার স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে পারে। এই কারণে হেগেলের দর্শনে ব্যক্তি ও সমাজকে পরস্পর বিচ্ছিন্নভাবে বিচার করা হয় না।
ইতিহাস সম্পর্কেও হেগেলের একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তাঁর মতে, ইতিহাস কোনো এলোমেলো ঘটনা-প্রবাহ নয়। ইতিহাসের মধ্যে একটি যুক্তিসংগত বিকাশের ধারা রয়েছে। মানবসমাজের ইতিহাসে স্বাধীনতা ও আত্মসচেতনতার ক্রমবিকাশ ঘটে এবং এর মধ্য দিয়ে পরম আত্মা নিজেকে আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। তাই হেগেলের দর্শনে ইতিহাস হল পরমের আত্মবিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
উক্ত আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, হেগেল জ্ঞানতত্ত্বমূলক ভাববাদ এবং তত্ত্ববিদ্যামূলক ভাববাদ—এই উভয়বিধ ভাববাদের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্বীকার করেছেন। হেগেল জ্ঞানতত্ত্বমূলক ভাববাদ ও তত্ত্বশাস্ত্রসম্মত ভাববাদ—এই দুটির মধ্যে সমন্বয় স্বীকার করেন এবং প্রথমটিকে দ্বিতীয়টির ভিত্তিস্বরূপ গ্রহণ করে বলেছেন—পরম চৈতন্যময় ঈশ্বর বিশ্বের মূল সত্তা এবং জগৎ এই পরম চেতনার বিকাশ। এই বৈচিত্র্যময় জগৎ পরমতত্ত্ব ঈশ্বরের বাস্তব রূপ বা অভিব্যক্তি।
এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, হেগেলের কাছে জ্ঞান ও বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষ যখন বাস্তবতাকে জানে, তখন সে কেবল নিজের মনের কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয়কে জানে না; বরং বাস্তবতার অন্তর্নিহিত যুক্তিসংগত কাঠামোকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। তাই হেগেলের দর্শনে জ্ঞানতত্ত্ব এবং অধিবিদ্যার মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

কিন্তু কান্টের অবভাসগত ভাববাদ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তা মূলত জ্ঞানতত্ত্বমূলক। কান্ট তাঁর জ্ঞানতত্ত্বমূলক ভাববাদকে তত্ত্বশাস্ত্রমূলক ভাববাদে উন্নীত করার পক্ষপাতী নন; কারণ তাঁর মতে, বস্তুর সত্তা বা পারমার্থিক তত্ত্ব আমাদের জ্ঞানের অতীত। বাস্তবিক, হেগেল তাঁর অধিবিদ্যায় বিচার-পদ্ধতি অনুসরণ করে কান্টের ত্রুটি অনেকাংশে সংশোধন করেছেন এবং জ্ঞানতত্ত্বমূলক ও তত্ত্ববিদ্যামূলক উভয় ভাববাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে বস্তুর বাহ্যরূপ ও তার স্বরূপের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তাঁর কাছে তত্ত্ব অর্থাৎ জ্ঞানবিষয়ক বিজ্ঞান ও তত্ত্বদর্শন এক ও অভিন্ন।
কান্ট মনে করেছিলেন যে, আমরা বস্তুকে যেমনভাবে আমাদের কাছে প্রতিভাত হয়, তেমনভাবেই জানতে পারি; কিন্তু বস্তুর অন্তর্নিহিত স্বরূপ বা ‘বস্তুস্বরূপ’ আমাদের জ্ঞানের সীমার বাইরে। হেগেল এই অবস্থান মেনে নেননি। তাঁর মতে, যদি পরম সত্যকে চিরকাল মানুষের জ্ঞানের বাইরে রাখা হয়, তাহলে দর্শনের প্রকৃত উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়। তাই তিনি জ্ঞান ও বাস্তবতার মধ্যে একটি গভীর ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।
হেগেলের মতে, বাস্তবতা নিজেই যুক্তিসংগত এবং মানুষের যুক্তিবোধ সেই বাস্তবতার যুক্তিগত কাঠামোকে উপলব্ধি করতে সক্ষম। এই কারণে তাঁর দর্শনে যুক্তি বা Logic অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তি এখানে শুধু চিন্তা করার নিয়ম নয়; বরং বাস্তবতার অন্তর্নিহিত বিকাশের নিয়মও বটে। তাই হেগেলের যুক্তিবিদ্যা তাঁর অধিবিদ্যার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
এই প্রসঙ্গে হেগেল বলেন, পরম সত্তা জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়ের মধ্যেই অবস্থিত এবং তারা উভয়েই সমভাবে প্রকাশিত হয়। কেননা পরম সত্তা হল আত্মসচেতন পরম ধীশক্তি। এই পরমাত্মা জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়ের এক পূর্ণ ও সুসংহত ঐক্য। এককথায়, এরা স্বয়ং জ্ঞাতা ও স্বয়ং জ্ঞেয় উভয়ই। আবার হেগেল বলেন, বুদ্ধি ও বস্তুর মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। স্বপ্রকাশ চৈতন্যের এরা দুটি দিক মাত্র। ফলে যা যৌক্তিক তাই সৎ এবং যা সৎ তাই যৌক্তিক।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে হেগেল জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়ের মধ্যে যে চরম বিচ্ছেদ রয়েছে বলে মনে করা হয়, তা অস্বীকার করেছেন। জ্ঞানপ্রক্রিয়ায় জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় পরস্পরের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। পরম সত্তার মধ্যেই জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়ের পূর্ণ ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই পরম আত্মা একই সঙ্গে নিজেকে জানে এবং নিজের মধ্যেই নিজেকে প্রকাশ করে।
হেগেলের পরমবস্তুবাদের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এর সামগ্রিকতাবাদ। কোনো বিচ্ছিন্ন বস্তু বা ঘটনা তার পূর্ণ অর্থ বহন করে না; তাকে সমগ্র বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে বিচার করতে হয়। একটি নির্দিষ্ট সত্য বৃহত্তর সত্যের একটি অংশমাত্র। তাই হেগেলের দর্শনে সত্যকে একটি সামগ্রিক ও বিকাশশীল ঐক্য হিসেবে দেখা হয়।
এখানে ‘পরম’ বলতে এমন একটি বাস্তবতাকে বোঝানো হয়, যার বাইরে আর কোনো স্বাধীন ও চূড়ান্ত বাস্তবতা নেই। পরম নিজেই নিজের ভিত্তি এবং নিজের বিকাশের কারণ। জগৎ, প্রকৃতি ও আত্মার বিভিন্ন স্তর পরমের প্রকাশমাত্র। এই কারণে পরমবস্তুবাদে বহুত্বের মধ্যেও ঐক্য এবং পরিবর্তনের মধ্যেও একটি যুক্তিসংগত ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়া যায়।
হেগেলের পরমবস্তুবাদ তাই একদিকে যেমন ভাববাদী, অন্যদিকে তেমনি গতিশীল ও দ্বন্দ্বমূলক। তিনি বাস্তব জগতের অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি; বরং জগতের বাস্তবতাকে পরমের আত্মবিকাশের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর দর্শনে বস্তু ও ভাব, জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়, ব্যক্তি ও সমাজ, প্রকৃতি ও আত্মা—এই সমস্ত দ্বন্দ্বকে একটি বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।
সুতরাং বলা যায়, হেগেলের বস্তুগত ভাববাদ বা পরমবস্তুবাদ পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুসংহত ভাববাদী মতবাদ। তাঁর মতে, পরম আত্মাই সমস্ত বাস্তবতার মূল ভিত্তি এবং জগৎ সেই পরম আত্মার আত্মবিকাশ ও আত্মপ্রকাশের ফল। দ্বন্দ্বমূলক বিকাশের মধ্য দিয়ে পরম সত্তা প্রকৃতি, মানবচেতনা, সমাজ ও ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরে নিজেকে প্রকাশ করে এবং শেষ পর্যন্ত আত্মসচেতনতার পূর্ণতা লাভ করে। এইভাবে হেগেল জ্ঞান, বাস্তবতা, চিন্তা, প্রকৃতি ও ইতিহাসের মধ্যে একটি সামগ্রিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। তাই তাঁর পরমবস্তুবাদ আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের অন্যতম প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক মতবাদ।
মন বিষয়ক কয়টি মতবাদ প্রকাশ করেছেন এবং সেগুলি আলোচনা কর।
উত্তর:- হেগেলের মন বিষয়ক মতবাদ তিনটি পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে। যথা— (i) আত্মগত মন, (ii) বস্তুগত মন এবং (iii) পরম মন। এই তিন প্রকার মন সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল—
হেগেলের মতে, মন বা আত্মা কোনো স্থির ও অপরিবর্তনীয় সত্তা নয়। মন নিজের মধ্যে থাকা সীমাবদ্ধতা ও বিরোধকে অতিক্রম করে ক্রমশ উচ্চতর স্তরে বিকশিত হয়। তাই হেগেলের মনতত্ত্ব মূলত একটি বিকাশমূলক ও দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব। ব্যক্তির অন্তর্গত চেতনা থেকে শুরু করে সামাজিক ও নৈতিক চেতনা এবং সর্বশেষে পরম আত্মসচেতনতার দিকে মনের যে অগ্রগতি ঘটে, হেগেল এই তিনটি পর্যায়ের মাধ্যমে তার ব্যাখ্যা করেছেন।
🔷 আত্মগত মন:- হেগেলের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার বাদ (Thesis) রূপে আত্মগত মনকে গ্রহণ করা হয়েছে। মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত মানসিক অবস্থা বা মনস্তত্ত্ব আত্মগত মনের অন্তর্ভুক্ত। এক কথায়, এই পর্যায়ে ব্যক্তিগত মনকে সামাজিক মন থেকে পৃথকভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তাঁর মতে, মানুষের সারধর্ম হল চেতনা, যাকে মন বা আত্মা বলা হয়। যতক্ষণ মানুষ প্রাকৃতিক অবস্থার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, ততক্ষণ সে প্রধানত জীববৃত্তি দ্বারা চালিত হয়। কিন্তু যখন মানুষ জড় প্রকৃতি থেকে নিজেকে স্বতন্ত্র হিসেবে উপলব্ধি করতে পারে, তখন তার মধ্যে চেতনা বা আত্মসচেতনতার বিকাশ ঘটে এবং সে মন বা আত্মার রূপ পরিগ্রহ করে।
আত্মগত মনের স্তরে মানুষের ব্যক্তিগত চেতনা, অনুভূতি, উপলব্ধি, চিন্তা ও আত্মসচেতনতার বিকাশ ঘটে। মানুষ প্রথমে তার চারপাশের জগতের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং ইন্দ্রিয় ও অনুভূতির মাধ্যমে বাহ্যিক জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। ধীরে ধীরে তার চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটে এবং সে নিজেকে অন্যান্য বস্তু থেকে পৃথক একটি সচেতন সত্তা হিসেবে উপলব্ধি করতে শুরু করে।
এই পর্যায়ে মানুষের মন এখনও মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সে নিজের অনুভূতি, ইচ্ছা ও চিন্তার জগতের মধ্যে নিজের পরিচয় খুঁজে পায়। কিন্তু এই ব্যক্তিগত চেতনা একেবারে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে পারে না। মানুষ যখন অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে এবং সামাজিক জীবনে প্রবেশ করে, তখন তার চেতনা আরও উন্নত স্তরে পৌঁছায়। এখান থেকেই আত্মগত মনের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বস্তুগত মনের দিকে বিকাশ ঘটে।
হেগেলের কাছে আত্মসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কোনো বস্তুকে জানা বা অনুভব করাই চেতনার পূর্ণতা নয়; নিজের সম্পর্কেও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। একজন ব্যক্তি যখন উপলব্ধি করে যে সে একজন স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সত্তা, তখন তার মধ্যে আত্মসচেতনতার বিকাশ ঘটে। এই আত্মসচেতনতাই পরবর্তীতে সামাজিক ও নৈতিক জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।
🔷 বস্তুগত মন:- আত্মগত বা ব্যক্তিগত মনের বিরোধী স্তর হিসেবে হেগেল তাঁর দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় বস্তুগত মনের উল্লেখ করেছেন। এই স্তরে মানুষের মন সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্বাধীনতা, অধিকার ও নৈতিকতার বাস্তব রূপ লাভ করে। ব্যক্তিগত অধিকার ও সামাজিক অধিকারের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে মানুষের স্বাধীনতার বিকাশ ঘটে। বাস্তব অধিকার ও স্বাধীনতার সাধারণ নীতি অনুসারে হেগেল বলেন— “মানুষ হও এবং অন্যদের মানুষ বলে গণ্য করো।” সম্পত্তি, চুক্তি ও অন্যায়ের মধ্য দিয়ে অধিকার ধারণার বিকাশ ঘটে। বস্তুগত মন বিভিন্ন ব্যক্তির স্বাধীন অস্তিত্ব এবং সামাজিক বিধি ও নৈতিক নিয়মকে স্বীকার করে নেয়।
বস্তুগত মনের স্তরে ব্যক্তি আর কেবল নিজের ব্যক্তিগত চেতনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে এবং একটি বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে। এখানেই অধিকার, কর্তব্য, নৈতিকতা, আইন ও স্বাধীনতার মতো ধারণাগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
হেগেলের মতে, ব্যক্তি একা তার স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত করতে পারে না। স্বাধীনতা বাস্তব রূপ পায় সামাজিক জীবনের মধ্য দিয়ে। তাই পরিবার, নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রের মতো প্রতিষ্ঠানগুলি ব্যক্তির নৈতিক ও সামাজিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যক্তি যেমন সমাজের অধিকার ও নিয়মকে স্বীকার করে, তেমনি সমাজকেও ব্যক্তির স্বাধীনতা ও অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হয়।
বস্তুগত মনের স্তরে মানুষের স্বাধীনতা কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিষয় নয়। স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ব ও নৈতিকতার সম্পর্ক রয়েছে। একজন ব্যক্তি যখন অন্য ব্যক্তির স্বাধীনতাকে স্বীকার করে এবং সামাজিক নিয়মের মধ্যে থেকে নিজের স্বাধীনতাকে বাস্তবায়িত করে, তখন স্বাধীনতা একটি বাস্তব ও নৈতিক রূপ লাভ করে।
হেগেলের মতে, অধিকার ধারণার বিকাশের ক্ষেত্রেও বস্তুগত মন গুরুত্বপূর্ণ। সম্পত্তির মাধ্যমে ব্যক্তি তার স্বাধীন ইচ্ছাকে বাহ্যিক জগতে প্রকাশ করে। চুক্তির মাধ্যমে একাধিক ব্যক্তির অধিকার ও ইচ্ছার পারস্পরিক স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। আর অন্যায়ের উদ্ভব হলে সেই অধিকার ও নৈতিকতার ধারণা আরও উচ্চতর স্তরে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। এইভাবে সামাজিক ও নৈতিক জীবনের মধ্য দিয়ে বস্তুগত মনের বিকাশ ঘটে।
পরিবার, নাগরিক সমাজ এবং রাষ্ট্রকে হেগেল বস্তুগত মনের বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ স্তর হিসেবে দেখেছেন। পরিবারে ব্যক্তির মধ্যে ভালোবাসা ও ঐক্যের সম্পর্ক তৈরি হয়। নাগরিক সমাজে ব্যক্তি নিজের স্বার্থ ও অধিকার নিয়ে সক্রিয় হয়। আর রাষ্ট্রের মধ্যে ব্যক্তি বৃহত্তর নৈতিক ও সামাজিক ঐক্যের অংশ হিসেবে নিজের স্বাধীনতাকে উপলব্ধি করে।
🔷 পরম মন:- পরম মন বা পরমাত্মা হল আত্মগত মন এবং বস্তুগত মনের ঐক্য ও সমন্বয়ের উচ্চতর স্তর। হেগেলের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় আত্মগত মন বাদ বা Thesis হিসেবে এবং বস্তুগত মন তার বিরোধী বা Antithesis হিসেবে উপস্থিত হয়ে পরিশেষে পরম মনের মধ্যে তাদের উচ্চতর সমন্বয় সাধিত হয়। পরম মনের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটে কলা, ধর্ম ও দর্শনে। কলাচর্চায় পরম সত্তা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সুন্দর রূপের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ধর্মে পরম সত্তা বিশ্বাস ও ভাবনার মাধ্যমে উপলব্ধ হয়। আর দর্শনে যুক্তি ও বিচারবুদ্ধির মাধ্যমে পরম সত্তার স্বরূপকে সর্বোচ্চভাবে উপলব্ধি করা যায়। তাই হেগেলের মতে, কলা, ধর্ম ও দর্শন হল পরম মনের আত্মপ্রকাশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর এবং দর্শন হল পরম সত্তার আত্মজ্ঞান লাভের সর্বোচ্চ স্তর।
পরম মনের স্তরে আত্মা নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে সর্বোচ্চ আত্মসচেতনতা অর্জন করে। আত্মগত মনের ব্যক্তিগত চেতনা এবং বস্তুগত মনের সামাজিক ও নৈতিক চেতনা পরম মনের মধ্যে একটি উচ্চতর ঐক্যে পৌঁছায়। এখানে ব্যক্তি নিজেকে যেমন উপলব্ধি করে, তেমনি বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গেও নিজের সম্পর্ককে উপলব্ধি করতে পারে।
পরম মনের আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে কলা, ধর্ম ও দর্শনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কলার মাধ্যমে মানুষ সৌন্দর্যের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপে পরম সত্যকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। একটি শিল্পকর্মের মধ্যে ভাব ও সৌন্দর্যের মিলনের মাধ্যমে পরমের একটি বিশেষ প্রকাশ ঘটে। তবে কলার প্রকাশ মূলত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হওয়ায় এটি পরম সত্যের সর্বোচ্চ উপলব্ধি নয়।
ধর্মের স্তরে পরম সত্তা আরও গভীরভাবে উপলব্ধ হয়। এখানে মানুষ বিশ্বাস, প্রতীক, ধর্মীয় চেতনা ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির মাধ্যমে পরমকে উপলব্ধি করে। ধর্ম কলার তুলনায় উচ্চতর হলেও এখানে পরম সত্যকে প্রধানত ভাবগত ও প্রতীকী রূপে প্রকাশ করা হয়।
দর্শনের স্তরে পরম মন তার সর্বোচ্চ আত্মসচেতনতা লাভ করে। দর্শন যুক্তি ও বিচারবুদ্ধির সাহায্যে পরম সত্তার প্রকৃত স্বরূপকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে। তাই হেগেলের মতে, দর্শন হল পরম মনের আত্মজ্ঞান লাভের সর্বোচ্চ স্তর। দর্শনের মাধ্যমে মানুষ শুধু পরম সম্পর্কে চিন্তা করে না; বরং পরম বাস্তবতার যুক্তিসংগত প্রকৃতিকেও উপলব্ধি করতে পারে।
এই তিনটি স্তরকে আলাদা আলাদা ও বিচ্ছিন্ন বিষয় হিসেবে দেখলে হেগেলের মনতত্ত্বের প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যায় না। এগুলি আসলে মনের ক্রমবিকাশের পরস্পর-সম্পর্কিত পর্যায়। আত্মগত মন থেকে বস্তুগত মন এবং বস্তুগত মন থেকে পরম মনের দিকে যে অগ্রগতি ঘটে, তার মধ্য দিয়ে আত্মা ধীরে ধীরে নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে।
হেগেলের মন বিষয়ক মতবাদের মূল উদ্দেশ্য হলো দেখানো যে, মন কেবল ব্যক্তির মাথার মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো মানসিক বিষয় নয়। ব্যক্তিগত চেতনা সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে বিকশিত হয় এবং সামাজিক ও নৈতিক জীবনের মধ্য দিয়ে পরম আত্মসচেতনতার দিকে অগ্রসর হয়। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও পরম সত্তার মধ্যে একটি ধারাবাহিক সম্পর্ক রয়েছে।

সুতরাং বলা যায়, হেগেলের মন বিষয়ক মতবাদে আত্মগত মন, বস্তুগত মন এবং পরম মন—এই তিনটি পর্যায়ের মাধ্যমে আত্মার ক্রমবিকাশকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আত্মগত মনের মধ্যে ব্যক্তিগত চেতনার বিকাশ, বস্তুগত মনের মধ্যে সামাজিক ও নৈতিক চেতনার বিকাশ এবং পরম মনের মধ্যে সর্বোচ্চ আত্মসচেতনতার বিকাশ ঘটে। কলা, ধর্ম ও দর্শনের মাধ্যমে পরম মন নিজেকে প্রকাশ করে এবং দর্শনের মাধ্যমে পরম সত্তার সর্বোচ্চ আত্মজ্ঞান লাভ সম্ভব হয়। এই কারণে হেগেলের মন বিষয়ক মতবাদ পাশ্চাত্য দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও পরীক্ষাভিত্তিক মতবাদ।
হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি আলোচনা কর।
উত্তর:- হেগেলের মতে, আমাদের চিন্তা তার স্বভাব অনুযায়ী সর্বদা বিরুদ্ধ ধারণাকে আকর্ষণ করে। অর্থাৎ, তাঁর মতে চিন্তা স্থির নয়; বরং চিন্তা হল অগ্রগতিমূলক। তাই চিন্তা কোনো একটি ধারণায় আবদ্ধ না থেকে কোনো ধারণা থেকে তার বিরুদ্ধ ধারণাকে নিষ্কাশন করে এবং দুটি পরস্পরবিরোধী ধারণার সমন্বয় সাধনে সচেষ্ট হয়। এই সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে চিন্তা পুনরায় এক উচ্চতর ধারণায় উপনীত হয়। এই চিন্তার অগ্রগতিতে প্রথম আস্তিবাচক ধারণাটি হল বাদ এবং নাস্তিবাচক ধারণাটি হলো প্রতিবাদ। আবার এই বাদ ও প্রতিবাদের সমন্বয় থেকে নিষ্কাশিত তৃতীয় ধারণাটিকে সম্বাদ বা সমন্বয় বলা হয়।
হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো চিন্তা ও বাস্তবতার পরিবর্তন এবং বিকাশের প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করা। হেগেলের মতে, কোনো ধারণা বা অবস্থা সম্পূর্ণ স্থির ও অপরিবর্তনীয় নয়। প্রত্যেক ধারণার মধ্যেই তার নিজস্ব সীমাবদ্ধতা নিহিত থাকে এবং সেই সীমাবদ্ধতা থেকেই তার বিপরীত ধারণার উদ্ভব ঘটে। ফলে একটি ধারণা নিজেকে অতিক্রম করে একটি নতুন ধারণার দিকে এগিয়ে যায়। এই অগ্রগতিই দ্বান্দ্বিক বিকাশের মূল বৈশিষ্ট্য।
হেগেলের মতে, বাদ থেকে প্রতিবাদের নিষ্কাশন খেয়ালখুশিভাবে হয় না; বরং তা হয় যৌক্তিক অনিবার্যতা অনুসারে। পরম চিন্তার মধ্যে যেভাবে ধারণাগুলি বিন্যস্ত থাকে, সেই অনুসারে সেগুলি নিষ্কাশিত হয়। হেগেল বলেন, দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি হলো ত্রিস্তরমূলক। এই ত্রিস্তরের তিনটি সামান্য ধারণা হলো জাতি বা বাদ, বিভেদলক্ষণ বা প্রতিবাদ এবং উপজাতি বা সম্বাদ। তিনি উপজাতিকে ভব বা Becoming বলেছেন।
এখানে ‘বাদ’ বলতে কোনো ধারণা বা অবস্থার প্রাথমিক রূপকে বোঝানো হয়। এই প্রাথমিক অবস্থার মধ্যে যে অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতা থাকে, তার ফলেই তার বিপরীত অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই বিপরীত অবস্থাই প্রতিবাদ। কিন্তু বাদ ও প্রতিবাদ উভয়ই নিজেদের মধ্যে সম্পূর্ণ নয়। তাদের দ্বন্দ্বের ফলে একটি উচ্চতর ধারণার জন্ম হয়, যা পূর্ববর্তী দুই অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দিককে ধারণ করে তাদের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে। এই উচ্চতর ধারণাই সম্বাদ বা সমন্বয়।
উদাহরণ হিসেবে সরলভাবে বলা যায়, যদি কোনো ধারণাকে ‘অস্তিত্ব’ হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তবে তার সম্পূর্ণ বিমূর্ত রূপের মধ্যে এমন কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে যার কারণে ‘অনস্তিত্ব’-এর ধারণা উপস্থিত হয়। অস্তিত্ব ও অনস্তিত্বের এই দ্বন্দ্ব থেকে ‘ভব’ বা Becoming-এর ধারণা উদ্ভূত হয়। অর্থাৎ অস্তিত্ব ও অনস্তিত্বের স্থির বিরোধ একটি গতিশীল নতুন ধারণায় উন্নীত হয়। এর মাধ্যমে হেগেল বোঝাতে চান যে বাস্তবতা কেবল স্থির অস্তিত্ব নয়; বরং তা পরিবর্তন ও বিকাশের প্রক্রিয়া।
হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে ‘বিরোধ’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণভাবে বিরোধকে আমরা কোনো ত্রুটি বা দুর্বলতা হিসেবে মনে করতে পারি। কিন্তু হেগেলের মতে, বিরোধই বিকাশের প্রধান চালিকাশক্তি। কোনো বিষয়ের মধ্যে যদি কোনো বিরোধ না থাকে, তাহলে তার পরিবর্তন ও অগ্রগতির কারণও থাকবে না। তাই বিরোধকে ধ্বংসাত্মক শক্তি হিসেবে না দেখে হেগেল তাকে সৃজনশীল ও বিকাশমূলক শক্তি হিসেবে দেখেছেন।
দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে প্রতিবাদ বাদকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয় না। বরং বাদ ও প্রতিবাদের পারস্পরিক বিরোধের মধ্য দিয়ে একটি নতুন ও উচ্চতর অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই নতুন অবস্থার মধ্যে পূর্ববর্তী অবস্থার কিছু সত্য বা প্রয়োজনীয় উপাদান সংরক্ষিত থাকে। তাই হেগেলের দ্বান্দ্বিক বিকাশকে শুধু ধ্বংস বা অস্বীকারের প্রক্রিয়া বলা যায় না; এটি অতিক্রম ও সংরক্ষণের একটি প্রক্রিয়া।
এই প্রসঙ্গে হেগেলের ‘Aufhebung’ ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। Aufhebung-এর মধ্যে একই সঙ্গে নাকচ করা, অতিক্রম করা এবং সংরক্ষণ করার অর্থ নিহিত রয়েছে। অর্থাৎ সম্বাদ পূর্ববর্তী বাদ ও প্রতিবাদকে একেবারে বিলুপ্ত করে দেয় না; বরং তাদের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে তাদের প্রয়োজনীয় দিককে নিজের মধ্যে ধারণ করে। ফলে প্রতিটি নতুন স্তর পূর্ববর্তী স্তরের তুলনায় অধিকতর উন্নত ও পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠে।

হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি তাই একটি সরলরৈখিক প্রক্রিয়া নয়। এটি ক্রমাগত বিকাশের একটি ধারা। একটি সম্বাদ যখন নতুন অবস্থায় পরিণত হয়, তখন তার মধ্যেও আবার নতুন বিরোধ দেখা দিতে পারে। সেই বিরোধ থেকে আবার নতুন প্রতিবাদ এবং পরবর্তীতে আরও উচ্চতর সমন্বয়ের সৃষ্টি হয়। এইভাবে চিন্তা ও বাস্তবতা ধাপে ধাপে উচ্চতর স্তরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
হেগেলের কাছে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি শুধু চিন্তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; বাস্তবতার ক্ষেত্রেও এর প্রয়োগ রয়েছে। প্রকৃতি, ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস এবং মানবচেতনার বিকাশের মধ্যেও বিরোধ ও অতিক্রমণের ধারা কাজ করে। তাই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির মাধ্যমে হেগেল সমগ্র বাস্তবতাকে একটি গতিশীল ও বিকাশশীল ঐক্য হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন।
মানবসমাজের ক্ষেত্রেও এই দ্বান্দ্বিক বিকাশ দেখা যায়। একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ব্যবস্থা বা রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে যখন নতুন প্রয়োজন ও বিরোধ দেখা দেয়, তখন পুরোনো ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং নতুন সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এই নতুন ব্যবস্থাও আবার সম্পূর্ণ নিখুঁত নয়; তার মধ্যেও নতুন বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। ফলে ইতিহাস ক্রমাগত পরিবর্তন ও বিকাশের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে।
হেগেলের দর্শনে ইতিহাস তাই কোনো এলোমেলো ঘটনাপ্রবাহ নয়। ইতিহাসের মধ্যে একটি যুক্তিসংগত বিকাশের ধারা রয়েছে। মানুষের স্বাধীনতা ও আত্মসচেতনতার ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়ে ইতিহাস এগিয়ে যায়। বিভিন্ন যুগের মধ্যে যে সংঘাত ও পরিবর্তন দেখা যায়, তার মধ্য দিয়েই মানবচেতনা আরও উন্নত স্তরে পৌঁছায়।
হেগেলের পরমবস্তুবাদের সঙ্গেও দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর মতে, পরম ভাব বা পরম আত্মা নিজেকে একবারে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করে না। পরমের মধ্যেও আত্মবিকাশের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রকৃতি, ব্যক্তি-আত্মা, সমাজ, ইতিহাস, ধর্ম, শিল্প ও দর্শনের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে পরম নিজেকে ক্রমশ প্রকাশ করে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে আত্মসচেতনতা লাভ করে।
হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে চিন্তার বিকাশও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ধারণা যখন তার নিজস্ব সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করে, তখন তার মধ্যে থেকে বিপরীত ধারণার উদ্ভব হয়। এই দুই ধারণার দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে চিন্তা আরও সমৃদ্ধ ও গভীর ধারণায় পৌঁছায়। তাই হেগেলের কাছে চিন্তা কোনো স্থির বিষয় নয়; চিন্তা নিজেই একটি বিকাশশীল প্রক্রিয়া।
এই পদ্ধতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর যৌক্তিকতা। হেগেলের মতে, একটি ধারণা থেকে তার বিপরীত ধারণার উদ্ভব কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা বা খেয়ালখুশির ফল নয়। ধারণাগুলির অন্তর্নিহিত যুক্তিগত সম্পর্কের কারণেই এক ধারণা থেকে অন্য ধারণার বিকাশ ঘটে। তাই দ্বান্দ্বিক বিকাশের প্রতিটি পর্যায়ের মধ্যে একটি যৌক্তিক অনিবার্যতা রয়েছে।
পরবর্তীকালে হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিকে সাধারণভাবে Thesis, Antithesis এবং Synthesis—এই তিনটি শব্দের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। Thesis বলতে প্রাথমিক অবস্থান, Antithesis বলতে তার বিরোধী অবস্থান এবং Synthesis বলতে উভয়ের দ্বন্দ্ব অতিক্রম করে গঠিত উচ্চতর অবস্থাকে বোঝানো হয়। তবে মনে রাখতে হবে, হেগেল নিজে তাঁর দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির আনুষ্ঠানিক সূত্র হিসেবে সর্বত্র এই তিনটি শব্দ ব্যবহার করেননি। তবুও শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর দ্বন্দ্বমূলক বিকাশ বোঝানোর জন্য এই কাঠামোটি বহুল ব্যবহৃত।
সুতরাং, হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির মূল বক্তব্য হলো—বাস্তবতা ও চিন্তা স্থির নয়; তারা বিরোধ ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত বিকশিত হয়। একটি অবস্থার মধ্যে তার বিপরীতের সম্ভাবনা নিহিত থাকে এবং সেই বিরোধের মধ্য দিয়ে একটি উচ্চতর অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই উচ্চতর অবস্থাও পরবর্তীতে নতুন বিকাশের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
সবশেষে বলা যায়, হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি হলো বাস্তবতা, চিন্তা ও ইতিহাসের গতিশীল বিকাশকে ব্যাখ্যা করার একটি গভীর দার্শনিক পদ্ধতি। এর মূল উপাদান হলো বাদ, প্রতিবাদ ও সম্বাদ; আর এর অন্তর্নিহিত চালিকাশক্তি হলো বিরোধ। বিরোধকে অতিক্রম করে ক্রমশ উচ্চতর ঐক্য ও পূর্ণতার দিকে অগ্রসর হওয়াই হেগেলের দ্বান্দ্বিক বিকাশের মূল লক্ষ্য। এই কারণে হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী দার্শনিক মতবাদ হিসেবে বিবেচিত হয়।

পাশ্চাত্য দর্শনের মান ২ প্রশ্ন ও উত্তর
১। আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের জনক কে?
উত্তর: ডেকার্তকে আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের জনক বলা হয়।
২। আধুনিক দর্শনের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং যুক্তিনির্ভর চিন্তার বিকাশ আধুনিক দর্শনের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য।
৩। অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক কারা?
উত্তর: লক, বার্কলে ও হিউম অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক।
৪। বুদ্ধিবাদী দার্শনিক কারা?
উত্তর: ডেকার্ত, স্পিনোজা ও লাইবনিজ বুদ্ধিবাদী দার্শনিক।
৫। বিচারবাদী দার্শনিক কে?
উত্তর: কান্ট বিচারবাদী দার্শনিক।
৬। থেলিসের মতে জগতের মূল উপাদান কী?
উত্তর: থেলিসের মতে জগতের মূল উপাদান হল জল।
৭। থেলিসের মতে পৃথিবী কিসের ওপর ভাসমান?
উত্তর: থেলিসের মতে পৃথিবী জলের ওপর ভাসমান।
৮। থেলিসকে পাশ্চাত্য দর্শনের প্রথম দার্শনিক বলা হয় কেন?
উত্তর: কারণ তিনি পৌরাণিক ব্যাখ্যার পরিবর্তে প্রাকৃতিক কারণ ও যুক্তির সাহায্যে বিশ্বজগতের ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।
৯। পারমিনাইডিসের মতে সত্তা কী?
উত্তর: যা অস্তিত্বশীল তাই সত্তা।
১০। পারমিনাইডিসের মতে অসত্তা কী?
উত্তর: যা অস্তিত্বশীল নয় তাই অসত্তা।
১১। পারমিনাইডিসের মতে সত্তার দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: সত্তা এক ও অপরিবর্তনীয়।
১২। পারমিনাইডিসের মতে সত্য জানার উপায় কী?
উত্তর: বিচারবুদ্ধি ও যুক্তির মাধ্যমে সত্য জানা যায়।
১৩। পারমিনাইডিসের জ্ঞানতত্ত্বে দুটি পথ কী?
উত্তর: সত্যের পথ এবং মতামতের পথ।
১৪। প্লেটোর মতে মঙ্গল কী?
উত্তর: মঙ্গল বা উত্তম হলো সর্বোচ্চ ধারণা এবং চরম সত্য।
১৫। প্লেটোর মতে সর্বোচ্চ ধারণা কোনটি?
উত্তর: মঙ্গলের ধারণা বা The Idea of the Good।
১৬। প্লেটো মঙ্গলের ধারণাকে কিসের সঙ্গে তুলনা করেছেন?
উত্তর: প্লেটো মঙ্গলের ধারণাকে সূর্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
১৭। প্লেটোর দ্বিজাগতিক তত্ত্ব কী?
উত্তর: প্লেটোর মতে বাস্তবতা দুটি জগতে বিভক্ত—ধারণার জগৎ এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ।
১৮। ধারণার জগৎ কেমন?
উত্তর: ধারণার জগৎ চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় ও প্রকৃত সত্যের জগৎ।
১৯। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ কেমন?
উত্তর: ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ পরিবর্তনশীল, অনিত্য ও অসম্পূর্ণ।
২০। ধারণার জগৎ কীভাবে জানা যায়?
উত্তর: বুদ্ধি, যুক্তি ও চিন্তার মাধ্যমে ধারণার জগৎ জানা যায়।
২১। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ কীভাবে জানা যায়?
উত্তর: ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ জানা যায়।
২২। প্লেটোর মতে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু কী?
উত্তর: ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু ধারণার জগতের অনুকরণ বা প্রতিচ্ছবি।
২৩। কান্টের মতে দেশ ও কাল কী?
উত্তর: দেশ ও কাল হল ইন্দ্রিয় সংবেদনের পূর্বতঃসিদ্ধ ও অপরিহার্য আকার।
২৪। পূর্বতঃসিদ্ধ জ্ঞান কী?
উত্তর: যে জ্ঞান অভিজ্ঞতা থেকে আসে না, কিন্তু অভিজ্ঞতাকে সম্ভব করে তোলে, তাকে পূর্বতঃসিদ্ধ বা A Priori জ্ঞান বলে।
২৫। পূর্বতঃসিদ্ধ জ্ঞানের দুটি বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: সর্বজনীনতা ও অনিবার্যতা।
২৬। কান্টের মতে দেশ ও কাল কি অভিজ্ঞতাপ্রসূত?
উত্তর: না, দেশ ও কাল অভিজ্ঞতার পূর্বতঃসিদ্ধ আকার।
২৭। লকের মতে সহজাত ধারণা কী?
উত্তর: জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনে বিদ্যমান ধারণাকে সহজাত ধারণা বলা হয়।
২৮। লক কি সহজাত ধারণা স্বীকার করেন?
উত্তর: না, লক সহজাত ধারণার অস্তিত্ব অস্বীকার করেন।
২৯। লকের মতে মানুষের মন জন্মের সময় কেমন থাকে?
উত্তর: লকের মতে মানুষের মন জন্মের সময় Tabula Rasa বা শূন্য পটের মতো থাকে।
৩০। লকের মতে জ্ঞানের উৎস কী?
উত্তর: অভিজ্ঞতা।
৩১। লক অভিজ্ঞতাকে কয় ভাগে ভাগ করেছেন?
উত্তর: দুই ভাগে—Sensation বা ইন্দ্রিয় অনুভূতি এবং Reflection বা আত্মপ্রতিফলন।
৩২। Sensation কী?
উত্তর: বাহ্যিক জগত থেকে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যে ধারণা লাভ হয় তাকে Sensation বলে।
৩৩। Reflection কী?
উত্তর: মনের নিজস্ব ক্রিয়া সম্পর্কে যে ধারণা লাভ হয় তাকে Reflection বলে।
৩৪। লকের মতে দ্রব্য কী?
উত্তর: যে আধারে গুণগুলি থাকে তাই দ্রব্য।
৩৫। লকের মতে দ্রব্যের প্রকৃতি কেমন?
উত্তর: দ্রব্য হল জ্ঞাত গুণের অজ্ঞাত আধার।
৩৬। লক কত প্রকার গুণের কথা বলেছেন?
উত্তর: দুই প্রকার—মুখ্যগুণ ও গৌণগুণ।
৩৭। মুখ্যগুণ কী?
উত্তর: বস্তুর অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্যকে মুখ্যগুণ বলা হয়।
৩৮। মুখ্যগুণের দুটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: আকার ও বিস্তৃতি মুখ্যগুণের উদাহরণ।
৩৯। গৌণগুণ কী?
উত্তর: বস্তুর এমন গুণ, যা আমাদের মনে বিশেষ অনুভূতি সৃষ্টি করে, তাকে গৌণগুণ বলা হয়।
৪০। গৌণগুণের দুটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: রং ও স্বাদ গৌণগুণের উদাহরণ।
৪১। বার্কলে মুখ্যগুণ ও গৌণগুণ সম্পর্কে কী বলেন?
উত্তর: বার্কলে মুখ্যগুণ ও গৌণগুণ উভয়কেই মনের ধারণা হিসেবে গ্রহণ করেন।
৪২। বার্কলের দর্শনের মূল বক্তব্য কী?
উত্তর: বার্কলের মতে বাহ্যিক জগত মূলত মনের ধারণার সমষ্টি।
৪৩। বার্কলের মতে স্বাধীন জড়দ্রব্যের অস্তিত্ব আছে কি?
উত্তর: বার্কলের মতে মনের বাইরে স্বাধীন জড়দ্রব্যের অস্তিত্ব স্বীকার করার প্রয়োজন নেই।
৪৪। বার্কলের মতে ধারণাগুলির পিছনে সক্রিয় সত্তা কে?
উত্তর: ঈশ্বর।
৪৫। হিউম কোন মতবাদের দার্শনিক?
উত্তর: হিউম একজন বিশিষ্ট অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক।
৪৬। হিউমের মতে Impression কী?
উত্তর: প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত অধিক শক্তিশালী ও জীবন্ত অনুভূতিকে Impression বা মুদ্রণ বলে।
৪৭। হিউমের মতে Idea কী?
উত্তর: পূর্ববর্তী মুদ্রণের তুলনামূলকভাবে কম জীবন্ত মানসিক অনুলিপিকে Idea বা ধারণা বলে।
৪৮। মুদ্রণ ও ধারণার মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: মুদ্রণ বেশি শক্তিশালী ও জীবন্ত, আর ধারণা অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী ও কম জীবন্ত।
৪৯। স্পিনোজার মতে দ্রব্য কী?
উত্তর: যা নিজের দ্বারা অস্তিত্বশীল এবং নিজের দ্বারাই ধারণীয়, তাই দ্রব্য।
৫০। স্পিনোজার মতে দ্রব্য কয়টি?
উত্তর: স্পিনোজার মতে দ্রব্য একটিমাত্র।
৫১। “দ্রব্য = ঈশ্বর = প্রকৃতি” কার মতবাদ?
উত্তর: “দ্রব্য = ঈশ্বর = প্রকৃতি” স্পিনোজার মতবাদ।
৫২। স্পিনোজার দর্শন কোন মতবাদ?
উত্তর: স্পিনোজার দর্শন একত্ববাদ বা Monism।
৫৩। স্পিনোজার মতে দ্রব্যের দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: দ্রব্য স্বয়ম্ভূ এবং অসীম।
৫৪। স্পিনোজার মতে Attribute কী?
উত্তর: দ্রব্যের স্বরূপকে প্রকাশ করে এমন মৌলিক ধর্মকে Attribute বা গুণ বলে।
৫৫। স্পিনোজার মতে মানুষের কাছে কতটি Attribute জ্ঞাত?
উত্তর: Thought বা চিন্তা এবং Extension বা বিস্তৃতি—এই দুটি Attribute মানুষের কাছে জ্ঞাত।
৫৬। স্পিনোজার মতে Mode কী?
উত্তর: দ্রব্যের বিশেষ বিশেষ অবস্থা বা প্রকাশকে Mode বা পর্যায় বলে।
৫৭। স্পিনোজার মন-দেহ মতবাদ কী নামে পরিচিত?
উত্তর: মন-দেহ সমান্তরালবাদ বা Parallelism নামে পরিচিত।
৫৮। ডেকার্তের বিখ্যাত উক্তি কী?
উত্তর: “আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি” বা “Cogito, ergo sum।”
৫৯। ডেকার্তের মতে আত্মার প্রধান ধর্ম কী?
উত্তর: চিন্তা করা আত্মার প্রধান ধর্ম।
৬০। ডেকার্তের মতে জড়ের প্রধান ধর্ম কী?
উত্তর: বিস্তৃতি বা Extension জড়ের প্রধান ধর্ম।
৬১। লাইবনিজের মতে মনার্ড কী?
উত্তর: মনার্ড হল সরল, অবিভাজ্য ও স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক সত্তা।
৬২। মনার্ড কি বিভাজ্য?
উত্তর: না, মনার্ড অবিভাজ্য।
৬৩। পূর্ব প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাবাদ কী?
উত্তর: ঈশ্বর সৃষ্টির সময় মনার্ডগুলিকে এমনভাবে নির্ধারণ করেছেন যে তারা নিজেদের নিয়মে চলেও পরস্পরের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখে—এটাই পূর্ব প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাবাদ।
৬৪। লাইবনিজের মতে মন ও দেহের মধ্যে সরাসরি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আছে কি?
উত্তর: না, মন ও দেহের মধ্যে সরাসরি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নেই।
৬৫। অ্যারিস্টটলের আকার ও উপাদান তত্ত্ব কী?
উত্তর: অ্যারিস্টটলের মতে যৌগিক বস্তু আকার (Form) ও উপাদান (Matter)-এর সমন্বয়ে গঠিত।
৬৬। অ্যারিস্টটলের মতে উপাদান কী?
উত্তর: যে উপাদান কোনো বস্তুর গঠনের ভিত্তি প্রদান করে তাকে উপাদান বা Matter বলে।
৬৭। অ্যারিস্টটলের মতে আকার কী?
উত্তর: যে নীতি কোনো উপাদানকে নির্দিষ্ট বস্তুর রূপ প্রদান করে তাকে আকার বা Form বলে।
৬৮। হেগেলের দর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: হেগেলের দর্শন ভাববাদী, গতিশীল ও দ্বান্দ্বিক।
৬৯। হেগেলের মতে পরম কী?
উত্তর: পরম হল এমন চূড়ান্ত বাস্তবতা যার বাইরে কোনো স্বাধীন ও চূড়ান্ত বাস্তবতা নেই।
৭০। হেগেলের মতে আত্মসচেতনতা কী?
উত্তর: ব্যক্তি যখন নিজেকে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে উপলব্ধি করে, তখন আত্মসচেতনতার বিকাশ ঘটে।
৭১। হেগেলের মতে স্বাধীনতা কোথায় বাস্তব রূপ পায়?
উত্তর: সামাজিক জীবনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা বাস্তব রূপ পায়।
৭২। হেগেলের মতে ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক কী?
উত্তর: ব্যক্তি ও সমাজ পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়; সামাজিক জীবনের মধ্য দিয়েই ব্যক্তির নৈতিক ও আত্মসচেতন বিকাশ ঘটে।
৭৩। হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি কী?
উত্তর: বিরোধী অবস্থার পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও অতিক্রমের মাধ্যমে উচ্চতর অবস্থায় বিকাশের পদ্ধতিই হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি।
৭৪। হেগেলের মতে জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়ের সম্পর্ক কী?
উত্তর: পরম সত্তার মধ্যে জ্ঞাতা ও জ্ঞেয়ের পূর্ণ ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
৭৫। হেগেলের মতে কলা, ধর্ম ও দর্শনের গুরুত্ব কী?
উত্তর: কলা, ধর্ম ও দর্শনের মাধ্যমে পরম সত্তার আত্মপ্রকাশ ঘটে।
৭৬। হেগেলের মতে দর্শনের মাধ্যমে কী উপলব্ধি করা যায়?
উত্তর: দর্শনের মাধ্যমে পরম সত্যকে ধারণাগত ও যুক্তিসংগতভাবে উপলব্ধি করা যায়।

পাশ্চাত্য দর্শন এর সকল গুরুত্বপূর্ণ SAQ প্রশ্ন মান – 1
১। পাশ্চাত্য দর্শনের সূচনা কোথায় হয়?
উত্তর: প্রাচীন গ্রিসে।
২। পাশ্চাত্য দর্শনের প্রথম দার্শনিক কে?
উত্তর: থেলিস।
৩। থেলিসের মতে জগতের মূল উপাদান কী?
উত্তর: জল।
৪। থেলিস কোন সম্প্রদায়ের দার্শনিক ছিলেন?
উত্তর: মাইলেশীয় সম্প্রদায়ের।
৫। থেলিসের দর্শনের মূল বিষয় কী?
উত্তর: জগতের আদি কারণ বা মূল উপাদানের অনুসন্ধান।
৬। পারমিনাইডিস কোন যুগের দার্শনিক?
উত্তর: প্রাক্-সক্রেটিস যুগের।
৭। পারমিনাইডিসের দর্শনের মূল বিষয় কী?
উত্তর: সত্তাতত্ত্ব (Ontology)।
৮। পারমিনাইডিসের মতে প্রকৃত সত্য কী?
উত্তর: সত্তা (Being)।
৯। পারমিনাইডিসের মতে সত্তা কেমন?
উত্তর: এক, চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়।
১০। পারমিনাইডিসের মতে অসত্তা কী?
উত্তর: শূন্যতা বা অস্তিত্বহীনতা।
১১। পারমিনাইডিসের মতে সত্যকে জানার উপায় কী?
উত্তর: বিচারবুদ্ধি বা যুক্তি।
১২। প্লেটোর দর্শনের মূল তত্ত্ব কী?
উত্তর: ধারণাতত্ত্ব (Theory of Ideas)।
১৩। প্লেটোর মতে পরম সত্য কী?
উত্তর: ধারণার জগৎ।
১৪। প্লেটোর মতে সর্বোচ্চ ধারণা কোনটি?
উত্তর: মঙ্গলের ধারণা (Idea of the Good)।
১৫। প্লেটোর মতে মঙ্গল কী?
উত্তর: সকল অস্তিত্ব, জ্ঞান ও সত্যের চূড়ান্ত ভিত্তি।
১৬। প্লেটোর দ্বিজাগতিক তত্ত্বে জগৎ কয়টি?
উত্তর: দুটি।
১৭। প্লেটোর দুই জগতের নাম কী?
উত্তর: ধারণার জগৎ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ।
১৮। প্লেটোর মতে ধারণার জগৎ কেমন?
উত্তর: চিরন্তন, অপরিবর্তনীয় ও পূর্ণ সত্যের জগৎ।
১৯। প্লেটোর মতে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ কেমন?
উত্তর: পরিবর্তনশীল ও অসম্পূর্ণ।
২০। প্লেটোর মতে ধারণার জগতের জ্ঞান কীসের মাধ্যমে লাভ করা যায়?
উত্তর: বুদ্ধি ও যুক্তির মাধ্যমে।
২১। প্লেটো মঙ্গলের ধারণাকে কিসের সঙ্গে তুলনা করেছেন?
উত্তর: সূর্যের সঙ্গে।
২২। আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের প্রকৃত জনক কে?
উত্তর: ডেকার্ত।
২৩। আধুনিক দর্শনের অন্যতম প্রবক্তা কারা?
উত্তর: বেকন, নিকোলাস ও ডেকার্ত।
২৪। আধুনিক দর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: যুক্তিনির্ভর ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি।
২৫। আধুনিক যুগে কোন আন্দোলনের ফলে চিন্তাধারায় পরিবর্তন ঘটে?
উত্তর: নবজাগরণ আন্দোলনের ফলে।
২৬। আধুনিক দর্শনে অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে কী গুরুত্ব পায়?
উত্তর: যুক্তি ও বিচারবুদ্ধি।
২৭। বুদ্ধিবাদের প্রধান দার্শনিক কারা?
উত্তর: ডেকার্ত, স্পিনোজা ও লাইবনিজ।
২৮। অভিজ্ঞতাবাদের প্রধান দার্শনিক কারা?
উত্তর: লক, বার্কলে ও হিউম।
২৯। বুদ্ধিবাদীদের মতে জ্ঞানের প্রধান উৎস কী?
উত্তর: বুদ্ধি।
৩০। অভিজ্ঞতাবাদীদের মতে জ্ঞানের প্রধান উৎস কী?
উত্তর: অভিজ্ঞতা।
৩১। কান্ট কোন দুটি মতবাদের সমন্বয় করার চেষ্টা করেন?
উত্তর: বুদ্ধিবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদ।
৩২। কান্টের মতে দেশ ও কাল কী?
উত্তর: সংবেদনের পূর্বতঃসিদ্ধ আকার।
৩৩। কান্টের মতে দেশ ও কালের দুটি বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: সার্বজনীনতা ও অনিবার্যতা।
৩৪। পূর্বতঃসিদ্ধের ইংরেজি কী?
উত্তর: A Priori।
৩৫। হেগেল কোন মতবাদের প্রবক্তা?
উত্তর: পরম ভাববাদ।
৩৬। পাশ্চাত্য দর্শনে অভিজ্ঞতাবাদী হিসেবে কাকে উল্লেখ করা হয়েছে?
উত্তর: জন লক।
৩৭। লকের মতে জ্ঞানের উৎস কী?
উত্তর: অভিজ্ঞতা।
৩৮। লকের অভিজ্ঞতার দুটি উৎস কী?
উত্তর: সংবেদন ও অন্তর্দর্শন।
৩৯। স্পিনোজার মতে দ্রব্য কয়টি?
উত্তর: একটি।
৪০। স্পিনোজার মতে একমাত্র দ্রব্য কী?
উত্তর: ঈশ্বর বা প্রকৃতি।
৪১। হেরাক্লিটাসের দর্শনের মূল কথা কী?
উত্তর: পরিবর্তনই জগতের মূল সত্য।
৪২। হেরাক্লিটাসের মতে জগতের মূল উপাদান কী?
উত্তর: আগুন।
৪৩। পারমিনাইডিসের মতে সত্তা কি পরিবর্তনশীল?
উত্তর: না, সত্তা অপরিবর্তনীয়।
৪৪। পারমিনাইডিসের মতে সত্তার বিপরীত কী?
উত্তর: অসত্তা।
৪৫। প্লেটোর মতে ধারণার জগত কেমন?
উত্তর: চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়।
৪৬। প্লেটোর মতে বিশেষ জগত কী?
উত্তর: ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগত।
৪৭। প্লেটোর মতে সামান্য জগত কী?
উত্তর: ধারণার জগত।
৪৮। প্লেটোর মতে মঙ্গলের ধারণা কী?
উত্তর: সর্বোচ্চ ধারণা।
৪৯। প্লেটোর মঙ্গলের ধারণার উপমা কী?
উত্তর: সূর্য।
৫০। ডেকার্ত কোন যুগের দার্শনিক?
উত্তর: আধুনিক যুগের।
৫১। ডেকার্তের বিখ্যাত উক্তি কী?
উত্তর: “আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি।”
৫২। ডেকার্তের দর্শনের প্রধান পদ্ধতি কী?
উত্তর: পদ্ধতিগত সংশয়।
৫৩। স্পিনোজার মতে দ্রব্য কয়টি?
উত্তর: একটি।
৫৪। স্পিনোজার একমাত্র দ্রব্যের নাম কী?
উত্তর: ঈশ্বর বা প্রকৃতি।
৫৫। লাইবনিজের মতে জগতের মৌলিক সত্তা কী?
উত্তর: মোনাড।
৫৬। লাইবনিজের মতে মোনাড কেমন সত্তা?
উত্তর: সরল ও অবিভাজ্য সত্তা।
৫৭। পূর্ব-প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাবাদের প্রবক্তা কে?
উত্তর: লাইবনিজ।
৫৮। পূর্ব-প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাবাদে দেহ ও মন কি সরাসরি ক্রিয়া করে?
উত্তর: না।
৫৯। লকের মতে অভিজ্ঞতার দুটি উৎস কী?
উত্তর: সংবেদন ও অন্তর্দর্শন।
৬০। লকের মতে মুখ্যগুণ কী?
উত্তর: বস্তুর প্রকৃত ও বাস্তব বৈশিষ্ট্য।
৬১। লকের মতে গৌণগুণ কী?
উত্তর: পর্যবেক্ষকের অনুভূতির উপর নির্ভরশীল গুণ।
৬২। বার্কলের দর্শনের মূল নীতি কী?
উত্তর: অস্তিত্ব মানেই প্রত্যক্ষিত হওয়া।
৬৩। বার্কলের মতে বাহ্যজগৎ কী?
উত্তর: ধারণার সমষ্টি।
৬৪। বার্কলের মতে বাহ্যজগতের ধারণাগুলির কারণ কে?
উত্তর: ঈশ্বর।
৬৫। হিউম মানুষের মনের বিষয়বস্তুকে কয় ভাগে ভাগ করেছেন?
উত্তর: দুই ভাগে।
৬৬। হিউমের মতে মনের বিষয়বস্তুর দুটি ভাগ কী?
উত্তর: Impressions ও Ideas।
৬৭। হিউমের মতে Ideas কী?
উত্তর: Impressions-এর দুর্বল প্রতিচ্ছবি।
৬৮। কান্টের মতে দেশ ও কাল কী?
উত্তর: সংবেদনের পূর্বতঃসিদ্ধ আকার।
৬৯। কান্টের মতে পূর্বতঃসিদ্ধ জ্ঞানের দুটি বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: সার্বজনীনতা ও অনিবার্যতা।
৭০। কান্টের মতে দেশ ও কাল কি অভিজ্ঞতাপ্রসূত?
উত্তর: না, এগুলি পূর্বতঃসিদ্ধ।
৭১। কান্ট অবধারণকে কয় ভাগে ভাগ করেছেন?
উত্তর: দুই ভাগে।
৭২। কান্টের অবধারণের দুটি ভাগ কী?
উত্তর: বিশ্লেষক ও সংশ্লেষক অবধারণ।
৭৩। হেগেলের দর্শনের মূল ধারণা কী?
উত্তর: পরম মন বা পরম সত্তা।
৭৪। হেগেলের মতে দর্শন কী?
উত্তর: পরম মনের আত্মজ্ঞান লাভের সর্বোচ্চ স্তর।
৭৫। হেগেলের মতে ব্যক্তি স্বাধীনতা কোথায় বাস্তব রূপ পায়?
উত্তর: সামাজিক জীবনের মধ্যে।

পাশ্চাত্য দর্শনের সকল গুরুত্বপূর্ণ MCQ প্রশ্ন মান – 1
১. থেলিসের মতে জগতের মূল উপাদান কী?
ক) আগুন
খ) জল
গ) বায়ু
ঘ) মাটি
উত্তর: খ) জল
২. পাশ্চাত্য দর্শনের প্রথম দার্শনিক হিসেবে কাকে গণ্য করা হয়?
ক) সক্রেটিস
খ) প্লেটো
গ) থেলিস
ঘ) অ্যারিস্টটল
উত্তর: গ) থেলিস
৩. থেলিস কোন সম্প্রদায়ের দার্শনিক ছিলেন?
ক) এলিয়াটিক
খ) মাইলেশীয়
গ) স্টোয়িক
ঘ) এপিকিউরীয়
উত্তর: খ) মাইলেশীয়
৪. থেলিসের মতে সমস্ত কিছুর আদি কারণ কী?
ক) বায়ু
খ) আগুন
গ) জল
ঘ) মাটি
উত্তর: গ) জল
৫. থেলিসের মতে পৃথিবী কেমন?
ক) গোলাকার
খ) ত্রিভুজাকার
গ) সমতল থালার মতো
ঘ) ঘনকাকার
উত্তর: গ) সমতল থালার মতো
৬. থেলিসের মতে পৃথিবী কীসের উপর ভাসমান?
ক) বায়ু
খ) আগুন
গ) জল
ঘ) শূন্য
উত্তর: গ) জল
৭. থেলিস বিশ্বজগতের ব্যাখ্যায় কীসের সাহায্য নিয়েছিলেন?
ক) পৌরাণিক কাহিনি
খ) যুক্তি ও পর্যবেক্ষণ
গ) ধর্মীয় বিশ্বাস
ঘ) অলৌকিকতা
উত্তর: খ) যুক্তি ও পর্যবেক্ষণ
৮. থেলিসের প্রধান দার্শনিক অনুসন্ধান কী ছিল?
ক) নৈতিকতা
খ) জগতের আদি কারণ
গ) রাষ্ট্র
ঘ) শিল্প
উত্তর: খ) জগতের আদি কারণ
৯. থেলিসকে কোন চিন্তার পথিকৃৎ বলা হয়?
ক) বৈজ্ঞানিক চিন্তার
খ) ধর্মীয় চিন্তার
গ) রাজনৈতিক চিন্তার
ঘ) নৈতিক চিন্তার
উত্তর: ক) বৈজ্ঞানিক চিন্তার
১০. থেলিসের মতে বিভিন্ন বস্তুর মূলে রয়েছে—
ক) বহু মূল উপাদান
খ) কোনো মূল উপাদান নেই
গ) একটি মূল উপাদান
ঘ) কেবল ঈশ্বর
উত্তর: গ) একটি মূল উপাদান
১১. পারমিনাইডিসের দর্শনের মূল বিষয় কী?
ক) সত্তা
খ) সুখ
গ) সমাজ
ঘ) শিল্প
উত্তর: ক) সত্তা
১২. পারমিনাইডিসের মতে যা অস্তিত্বশীল তাই—
ক) অসত্তা
খ) সত্তা
গ) মায়া
ঘ) ভ্রম
উত্তর: খ) সত্তা
১৩. পারমিনাইডিসের মতে অসত্তা কেমন?
ক) চিন্তনীয়
খ) অচিন্তনীয়
গ) নিত্য
ঘ) পরিবর্তনশীল
উত্তর: খ) অচিন্তনীয়
১৪. পারমিনাইডিসের মতে প্রকৃত সত্য কীভাবে জানা যায়?
ক) ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে
খ) বিচারবুদ্ধির মাধ্যমে
গ) কল্পনার মাধ্যমে
ঘ) বিশ্বাসের মাধ্যমে
উত্তর: খ) বিচারবুদ্ধির মাধ্যমে
১৫. পারমিনাইডিসের মতে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ কী?
ক) চরম সত্য
খ) প্রকৃত সত্তা
গ) ভ্রান্তির অবভাস
ঘ) নিত্য বাস্তবতা
উত্তর: গ) ভ্রান্তির অবভাস
১৬. পারমিনাইডিসের মতে প্রকৃত সত্তা কেমন?
ক) পরিবর্তনশীল
খ) ক্ষণস্থায়ী
গ) অপরিবর্তনীয়
ঘ) ধ্বংসশীল
উত্তর: গ) অপরিবর্তনীয়
১৭. পারমিনাইডিসের মতে সত্তা—
ক) বহু
খ) এক ও অদ্বিতীয়
গ) পরিবর্তনশীল
ঘ) সৃষ্ট
উত্তর: খ) এক ও অদ্বিতীয়
১৮. পারমিনাইডিসের মতে সত্তা কেমন?
ক) চিরন্তন
খ) ক্ষণস্থায়ী
গ) নশ্বর
ঘ) পরিবর্তনশীল
উত্তর: ক) চিরন্তন
১৯. পারমিনাইডিসের মতে সত্যের পথ কোনটি?
ক) ইন্দ্রিয়ের পথ
খ) যুক্তি ও বিচারবুদ্ধির পথ
গ) কল্পনার পথ
ঘ) বিশ্বাসের পথ
উত্তর: খ) যুক্তি ও বিচারবুদ্ধির পথ
২০. পারমিনাইডিসের মতবাদ কার পরিবর্তনবাদের বিপরীত?
ক) প্লেটো
খ) হেরাক্লিটাস
গ) লক
ঘ) হিউম
উত্তর: খ) হেরাক্লিটাস
২১. প্লেটোর দর্শনের মূল ভিত্তি কী?
ক) বস্তুবাদ
খ) ধারণাবাদ
গ) সংশয়বাদ
ঘ) অভিজ্ঞতাবাদ
উত্তর: খ) ধারণাবাদ
২২. প্লেটোর মতে ধারণার জগৎ কেমন?
ক) পরিবর্তনশীল
খ) চিরন্তন
গ) ক্ষণস্থায়ী
ঘ) মিথ্যা
উত্তর: খ) চিরন্তন
২৩. প্লেটোর মতে ধারণার জগৎ কী ধরনের?
ক) ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য
খ) বুদ্ধিগ্রাহ্য
গ) কল্পনাগ্রাহ্য
ঘ) বস্তুগ্রাহ্য
উত্তর: খ) বুদ্ধিগ্রাহ্য
২৪. প্লেটোর মতে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ কেমন?
ক) চিরন্তন
খ) অপরিবর্তনীয়
গ) পরিবর্তনশীল
ঘ) পূর্ণ
উত্তর: গ) পরিবর্তনশীল
২৫. প্লেটোর মতে ধারণার জগৎ কোন কিছুর অতীত?
ক) দেশ ও কালের
খ) জ্ঞানের
গ) বুদ্ধির
ঘ) সত্যের
উত্তর: ক) দেশ ও কালের
২৬. প্লেটোর দ্বিজাগতিক তত্ত্বে জগত কয়টি?
ক) একটি
খ) দুটি
গ) তিনটি
ঘ) চারটি
উত্তর: খ) দুটি
২৭. প্লেটোর দুই জগতের একটি হলো—
ক) সামান্য বা ধারণার জগৎ
খ) কেবল বস্তুজগৎ
গ) কেবল আত্মার জগৎ
ঘ) কেবল ঈশ্বরের জগৎ
উত্তর: ক) সামান্য বা ধারণার জগৎ
২৮. প্লেটোর অন্য জগৎ হলো—
ক) ধারণার জগৎ
খ) বিশেষ বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ
গ) মায়ার জগৎ
ঘ) আত্মার জগৎ
উত্তর: খ) বিশেষ বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ
২৯. প্লেটোর মতে সামান্য জগৎ কীভাবে লাভ করা যায়?
ক) অভিজ্ঞতার মাধ্যমে
খ) বুদ্ধির মাধ্যমে
গ) ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে
ঘ) কল্পনার মাধ্যমে
উত্তর: খ) বুদ্ধির মাধ্যমে
৩০. প্লেটোর মতে বিশেষ জগৎ কীভাবে জানা যায়?
ক) বুদ্ধির মাধ্যমে
খ) অভিজ্ঞতার মাধ্যমে
গ) যুক্তির মাধ্যমে
ঘ) কেবল স্মৃতির মাধ্যমে
উত্তর: খ) অভিজ্ঞতার মাধ্যমে
৩১. সামান্য জগৎ কেমন?
ক) অনিত্য
খ) নিত্য
গ) পরিবর্তনশীল
ঘ) ত্রুটিযুক্ত
উত্তর: খ) নিত্য
৩২. বিশেষ জগৎ কেমন?
ক) নিত্য
খ) অনিত্য
গ) অপরিবর্তনীয়
ঘ) পূর্ণ
উত্তর: খ) অনিত্য
৩৩. সামান্য জগৎ কেমন?
ক) ত্রুটিযুক্ত
খ) ত্রুটিহীন
গ) অসম্পূর্ণ
ঘ) পরিবর্তনশীল
উত্তর: খ) ত্রুটিহীন
৩৪. বিশেষ জগৎ কেমন?
ক) ত্রুটিহীন
খ) ত্রুটিযুক্ত
গ) পূর্ণ
ঘ) চিরন্তন
উত্তর: খ) ত্রুটিযুক্ত
৩৫. প্লেটোর মতে সামান্য জগৎ হলো—
ক) আংশিক সত্য
খ) পূর্ণসত্য
গ) অসত্য
ঘ) ভ্রম
উত্তর: খ) পূর্ণসত্য
৩৬. প্লেটোর মতে বিশেষ জগৎ হলো—
ক) পূর্ণসত্য
খ) আংশিক সত্য
গ) পরম সত্য
ঘ) একমাত্র সত্য
উত্তর: খ) আংশিক সত্য
৩৭. প্লেটোর মতে ধারণাগুলির—
ক) কোনো অস্তিত্ব নেই
খ) স্বাধীন অস্তিত্ব আছে
গ) কেবল মানসিক অস্তিত্ব আছে
ঘ) ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব আছে
উত্তর: খ) স্বাধীন অস্তিত্ব আছে
৩৮. বিশেষ জগতের বস্তুগুলি ধারণার—
ক) কারণ
খ) প্রতিলিপি
গ) নিয়ামক
ঘ) ধ্বংসকারী
উত্তর: খ) প্রতিলিপি
৩৯. প্লেটোর মতে সর্বোচ্চ ধারণা কোনটি?
ক) সত্য
খ) সৌন্দর্য
গ) মঙ্গল
ঘ) ন্যায়
উত্তর: গ) মঙ্গল
৪০. ‘The Idea of the Good’ বলতে কী বোঝায়?
ক) সৌন্দর্যের ধারণা
খ) মঙ্গলের ধারণা
গ) ন্যায়ের ধারণা
ঘ) সত্যের ধারণা
উত্তর: খ) মঙ্গলের ধারণা
৪১. প্লেটোর মতে মঙ্গলের ধারণা কী?
ক) সর্বনিম্ন ধারণা
খ) সর্বোচ্চ ধারণা
গ) বিশেষ ধারণা
ঘ) ইন্দ্রিয় ধারণা
উত্তর: খ) সর্বোচ্চ ধারণা
৪২. প্লেটোর মতে মঙ্গল হলো—
ক) চরম সত্য
খ) মিথ্যা
গ) পরিবর্তনশীল
ঘ) ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য
উত্তর: ক) চরম সত্য
৪৩. প্লেটো মঙ্গলের ধারণার সঙ্গে কিসের তুলনা করেছেন?
ক) চাঁদ
খ) সূর্য
গ) পৃথিবী
ঘ) আকাশ
উত্তর: খ) সূর্য
৪৪. প্লেটোর ‘Republic’ গ্রন্থে মঙ্গলের ধারণাকে কিসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে?
ক) নদী
খ) সূর্য
গ) চাঁদ
ঘ) আগুন
উত্তর: খ) সূর্য
৪৫. সূর্য যেমন দৃশ্যমান জগতের শক্তির উৎস, তেমনি মঙ্গল হলো—
ক) জগতের ধ্বংসের উৎস
খ) জ্ঞান ও সত্যের উৎস
গ) ইন্দ্রিয়ের উৎস
ঘ) ভ্রমের উৎস
উত্তর: খ) জ্ঞান ও সত্যের উৎস
৪৬. আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের সময়কাল কোন শতাব্দী থেকে শুরু হয়েছে বলে দেওয়া হয়েছে?
ক) দশম শতাব্দী
খ) দ্বাদশ শতাব্দী
গ) চতুর্দশ শতাব্দী
ঘ) অষ্টাদশ শতাব্দী
উত্তর: গ) চতুর্দশ শতাব্দী
৪৭. পাশ্চাত্য আধুনিক যুগের প্রবক্তাদের মধ্যে কে ছিলেন?
ক) বেকন
খ) সক্রেটিস
গ) প্লেটো
ঘ) পারমিনাইডিস
উত্তর: ক) বেকন
৪৮. পাশ্চাত্য দর্শনের জনক হিসেবে কাকে উল্লেখ করা হয়েছে?
ক) প্লেটো
খ) ডেকার্ত
গ) হিউম
ঘ) কান্ট
উত্তর: খ) ডেকার্ত
৪৯. আধুনিক যুগের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল?
ক) পৌরাণিক
খ) বৈজ্ঞানিক
গ) অলৌকিক
ঘ) কুসংস্কারপূর্ণ
উত্তর: খ) বৈজ্ঞানিক
৫০. আধুনিক যুগে মানুষ কোন পথ থেকে যুক্তির পথে ফিরে আসে?
ক) বিজ্ঞানের পথ
খ) অন্ধবিশ্বাসের পথ
গ) নৈতিকতার পথ
ঘ) শিল্পের পথ
উত্তর: খ) অন্ধবিশ্বাসের পথ
৫১. আধুনিক দর্শনকে অনেক সময় কী বলা হয়?
ক) বিশ্বাসের যুগ
খ) যুক্তি ও অনুসন্ধানের যুগ
গ) ধর্মের যুগ
ঘ) কল্পনার যুগ
উত্তর: খ) যুক্তি ও অনুসন্ধানের যুগ
৫২. আধুনিক যুগের একটি বৈশিষ্ট্য হলো—
ক) অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ
খ) অন্ধবিশ্বাসের প্রসার
গ) ধর্মীয় কর্তৃত্ব বৃদ্ধি
ঘ) যুক্তির অবসান
উত্তর: ক) অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ
৫৩. প্রচলিত নির্বিচারবাদী রচনার বিরুদ্ধে আধুনিক যুগে কী দেখা যায়?
ক) বিশ্বাস
খ) সংশয় ও সমালোচনা
গ) ভক্তি
ঘ) অন্ধ অনুসরণ
উত্তর: খ) সংশয় ও সমালোচনা
৫৪. আধুনিক যুগে দর্শনের কোন শাখার বিচার ও বিশ্লেষণ বিশেষ গুরুত্ব পায়?
ক) জ্ঞানতত্ত্ব
খ) রসতত্ত্ব
গ) কাব্যতত্ত্ব
ঘ) ভাষাতত্ত্ব
উত্তর: ক) জ্ঞানতত্ত্ব
৫৫. ধর্মীয় আপ্তবাক্যের পরিবর্তে আধুনিক যুগে গুরুত্ব পায়—
ক) আত্মচেতনা
খ) অন্ধবিশ্বাস
গ) কুসংস্কার
ঘ) পৌরাণিকতা
উত্তর: ক) আত্মচেতনা
৫৬. আধুনিক যুগে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়—
ক) ব্যক্তির স্বাধীন যুক্তিচিন্তাকে
খ) ধর্মীয় কর্তৃত্বকে
গ) গির্জার নির্দেশকে
ঘ) অন্ধবিশ্বাসকে
উত্তর: ক) ব্যক্তির স্বাধীন যুক্তিচিন্তাকে
৫৭. আধুনিক যুগে দার্শনিক চিন্তাভাবনা কোন আকারে প্রকাশিত হত?
ক) কাব্য
খ) প্রবন্ধ
গ) নাটক
ঘ) উপন্যাস
উত্তর: খ) প্রবন্ধ
৫৮. বিদ্যালয়ে দর্শনচর্চা প্রথম কোথায় শুরু হয়?
ক) ফ্রান্সে
খ) ইংল্যান্ডে
গ) জার্মানিতে
ঘ) আমেরিকায়
উত্তর: গ) জার্মানিতে
৫৯. জার্মানির পরে কোন দেশে বিদ্যালয়ে দর্শনচর্চা শুরু হয়?
ক) ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স
খ) ভারত ও চীন
গ) গ্রিস ও রোম
ঘ) আমেরিকা ও রাশিয়া
উত্তর: ক) ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স
৬০. আধুনিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য কী?
ক) স্বাধীন চিন্তা
খ) অন্ধ অনুকরণ
গ) ধর্মীয় কর্তৃত্ব
ঘ) কুসংস্কার
উত্তর: ক) স্বাধীন চিন্তা
৬১. লক, বার্কলে ও হিউম কোন মতবাদের দার্শনিক?
ক) বুদ্ধিবাদ
খ) অভিজ্ঞতাবাদ
গ) বিচারবাদ
ঘ) বস্তুবাদ
উত্তর: খ) অভিজ্ঞতাবাদ
৬২. অভিজ্ঞতাবাদীদের মতে জ্ঞান লাভের প্রধান উৎস কী?
ক) বুদ্ধি
খ) ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা
গ) কল্পনা
ঘ) বিশ্বাস
উত্তর: খ) ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা
৬৩. ডেকার্ত, স্পিনোজা ও লাইবনিজ কোন মতবাদের দার্শনিক?
ক) অভিজ্ঞতাবাদ
খ) বুদ্ধিবাদ
গ) বিচারবাদ
ঘ) সংশয়বাদ
উত্তর: খ) বুদ্ধিবাদ
৬৪. বুদ্ধিবাদীদের মতে জ্ঞান লাভের প্রধান উৎস কী?
ক) অভিজ্ঞতা
খ) বুদ্ধি
গ) ইন্দ্রিয়
ঘ) বিশ্বাস
উত্তর: খ) বুদ্ধি
৬৫. বিচারবাদী দার্শনিক হিসেবে কাকে উল্লেখ করা হয়েছে?
ক) লক
খ) হিউম
গ) কান্ট
ঘ) বার্কলে
উত্তর: গ) কান্ট
৬৬. কান্টের মতে যথার্থ জ্ঞানের জন্য প্রয়োজন—
ক) কেবল বুদ্ধি
খ) কেবল অভিজ্ঞতা
গ) অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধি উভয়ই
ঘ) কেবল ইন্দ্রিয়
উত্তর: গ) অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধি উভয়ই
৬৭. লকের মতে দ্রব্য কী?
ক) জ্ঞাত গুণ
খ) জ্ঞাত গুণের অজ্ঞাত আধার
গ) কেবল ধারণা
ঘ) কেবল ইন্দ্রিয়
উত্তর: খ) জ্ঞাত গুণের অজ্ঞাত আধার
৬৮. লকের মতে দ্রব্যকে আমরা কীভাবে জানতে পারি?
ক) প্রত্যক্ষভাবে
খ) সরাসরি জানতে পারি না
গ) কেবল ইন্দ্রিয় দিয়ে
ঘ) কেবল কল্পনার মাধ্যমে
উত্তর: খ) সরাসরি জানতে পারি না
৬৯. লকের দ্রব্যের বিখ্যাত উক্তি কোনটি?
ক) Causa sui
খ) Know-not-what
গ) Cogito
ঘ) Tabula rasa
উত্তর: খ) Know-not-what
৭০. লকের মতে আমরা সরাসরি কী উপলব্ধি করি?
ক) দ্রব্য
খ) গুণ
গ) আত্মা
ঘ) ঈশ্বর
উত্তর: খ) গুণ
৭১. লকের মতে মুখ্যগুণ কোথায় বাস্তবভাবে বিদ্যমান?
ক) কেবল মনে
খ) বস্তুতে
গ) কল্পনায়
ঘ) স্বপ্নে
উত্তর: খ) বস্তুতে
৭২. লকের মতে গৌণগুণ কীসের সঙ্গে সম্পর্কিত?
ক) মানুষের ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে
খ) কেবল বুদ্ধির সঙ্গে
গ) কেবল বস্তুতে
ঘ) ঈশ্বরের সঙ্গে
উত্তর: ক) মানুষের ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে
৭৩. কোনটি গৌণগুণের উদাহরণ?
ক) আকার
খ) বিস্তার
গ) রং
ঘ) গতি
উত্তর: গ) রং
৭৪. রস, গন্ধ ও শব্দ কোন ধরনের গুণ?
ক) মুখ্যগুণ
খ) গৌণগুণ
গ) নিত্যগুণ
ঘ) পরমগুণ
উত্তর: খ) গৌণগুণ
৭৫. মুখ্যগুণ পর্যবেক্ষকের উপর—
ক) নির্ভরশীল
খ) নির্ভরশীল নয়
গ) সম্পূর্ণ নির্ভরশীল
ঘ) কল্পনানির্ভর
উত্তর: খ) নির্ভরশীল নয়
৭৬. বার্কলের মতে বাহ্যিক জগৎ কী?
ক) জড়দ্রব্যের সমষ্টি
খ) ধারণার সমষ্টি
গ) কেবল শূন্যতা
ঘ) কেবল আত্মা
উত্তর: খ) ধারণার সমষ্টি
৭৭. বার্কলের মতে বাহ্যিক জগতের ধারণাগুলির সক্রিয় কারণ কে?
ক) মানুষ
খ) ঈশ্বর
গ) প্রকৃতি
ঘ) আত্মা
উত্তর: খ) ঈশ্বর
৭৮. বার্কলের মতে বাহ্যিক জগতের ধারণাগুলি মানুষের—
ক) ইচ্ছাধীন
খ) ইচ্ছাধীন নয়
গ) কল্পনাধীন
ঘ) স্মৃতিনির্ভর
উত্তর: খ) ইচ্ছাধীন নয়
৭৯. বার্কলের মতে ঈশ্বর কী?
ক) নিষ্ক্রিয় কারণ
খ) সক্রিয় সর্বশক্তিমান কারণ
গ) কেবল ধারণা
ঘ) জড়দ্রব্য
উত্তর: খ) সক্রিয় সর্বশক্তিমান কারণ
৮০. হিউম কোন মতবাদের দার্শনিক?
ক) বুদ্ধিবাদ
খ) অভিজ্ঞতাবাদ
গ) বিচারবাদ
ঘ) পরম ভাববাদ
উত্তর: খ) অভিজ্ঞতাবাদ
৮১. হিউমের মতে মানুষের জ্ঞানের মূল উৎস কী?
ক) বুদ্ধি
খ) অভিজ্ঞতা
গ) ঈশ্বর
ঘ) জন্মগত ধারণা
উত্তর: খ) অভিজ্ঞতা
৮২. হিউম মনের বিষয়বস্তুকে কয় ভাগে ভাগ করেছেন?
ক) দুই ভাগে
খ) তিন ভাগে
গ) চার ভাগে
ঘ) পাঁচ ভাগে
উত্তর: ক) দুই ভাগে
৮৩. হিউমের মতে মানসিক বিষয়বস্তুর দুটি ভাগ কী?
ক) জ্ঞান ও অজ্ঞান
খ) Impression ও Idea
গ) সত্য ও মিথ্যা
ঘ) বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা
উত্তর: খ) Impression ও Idea
৮৪. Impression কী?
ক) দুর্বল অনুভূতি
খ) প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার শক্তিশালী অনুভূতি
গ) কল্পনা
ঘ) স্মৃতি
উত্তর: খ) প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার শক্তিশালী অনুভূতি
৮৫. Idea কী?
ক) Impression-এর দুর্বল প্রতিরূপ
খ) Impression-এর কারণ
গ) বস্তু
ঘ) ঈশ্বর
উত্তর: ক) Impression-এর দুর্বল প্রতিরূপ
৮৬. হিউমের মতে ধারণা কিসের ভিত্তিতে তৈরি হয়?
ক) জন্মগত জ্ঞান
খ) Impression
গ) ঈশ্বর
ঘ) বুদ্ধি
উত্তর: খ) Impression
৮৭. হিউমের মতে প্রত্যেক ধারণার পিছনে থাকা উচিত—
ক) একটি Impression
খ) একটি কল্পনা
গ) একটি বিশ্বাস
ঘ) একটি ধর্মীয় মত
উত্তর: ক) একটি Impression
৮৮. Impression ও Idea-এর মধ্যে কোনটি বেশি জীবন্ত?
ক) Idea
খ) Impression
গ) উভয়ই সমান
ঘ) কোনোটিই নয়
উত্তর: খ) Impression
৮৯. হিউমের মতে মানুষের মন জন্মের সময়—
ক) সহজাত ধারণায় পূর্ণ
খ) কোনো সহজাত ধারণা নিয়ে আসে না
গ) চরম জ্ঞানসম্পন্ন
ঘ) ঈশ্বরের জ্ঞান নিয়ে আসে
উত্তর: খ) কোনো সহজাত ধারণা নিয়ে আসে না
৯০. হিউমের মতে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রথমে কী লাভ হয়?
ক) Idea
খ) Impression
গ) দ্রব্য
ঘ) ঈশ্বর
উত্তর: খ) Impression
৯১. শঙ্করের মতে মায়াকে আর কী বলা হয়?
ক) বিদ্যা
খ) অবিদ্যা বা অজ্ঞান
গ) জ্ঞান
ঘ) আত্মা
উত্তর: খ) অবিদ্যা বা অজ্ঞান
৯২. শঙ্করের মতে মায়ার দুটি শক্তি কী?
ক) জ্ঞান ও অজ্ঞান
খ) আবরণ ও বিক্ষেপ
গ) সৃষ্টি ও ধ্বংস
ঘ) সত্য ও মিথ্যা
উত্তর: খ) আবরণ ও বিক্ষেপ
৯৩. মায়ার আবরণ শক্তির কাজ কী?
ক) সত্যকে প্রকাশ করা
খ) সত্যের স্বরূপকে আবৃত করা
গ) জ্ঞান সৃষ্টি করা
ঘ) জগৎ ধ্বংস করা
উত্তর: খ) সত্যের স্বরূপকে আবৃত করা
৯৪. মায়ার বিক্ষেপ শক্তির কাজ কী?
ক) সত্যের স্থলে মিথ্যাকে প্রকাশ করা
খ) সত্যকে আবৃত করা
গ) জ্ঞান লাভ করানো
ঘ) ব্রহ্মকে প্রকাশ করা
উত্তর: ক) সত্যের স্থলে মিথ্যাকে প্রকাশ করা
৯৫. রজ্জুতে সর্পের ভ্রম কোন শক্তির দ্বারা সৃষ্টি হয়?
ক) আবরণ শক্তি
খ) বিক্ষেপ শক্তি
গ) জ্ঞান শক্তি
ঘ) বিদ্যা শক্তি
উত্তর: খ) বিক্ষেপ শক্তি
৯৬. রজ্জুর জ্ঞান হলে কী অন্তর্হিত হয়?
ক) ব্রহ্মজ্ঞান
খ) সর্পভ্রম
গ) মায়াশক্তি
ঘ) আত্মজ্ঞান
উত্তর: খ) সর্পভ্রম
৯৭. শঙ্করের মতে ব্রহ্ম কেমন?
ক) সসীম
খ) অসীম
গ) পরিবর্তনশীল
ঘ) অংশবিশিষ্ট
উত্তর: খ) অসীম
৯৮. শঙ্করের মতে একমাত্র সদ্বস্তু কী?
ক) জগৎ
খ) ব্রহ্ম
গ) মায়া
ঘ) জীব
উত্তর: খ) ব্রহ্ম
৯৯. শঙ্করের মতে মায়া কেমন?
ক) সৎ
খ) অসৎ
গ) সদসদ্-বিলক্ষণ অনির্বচনীয়
ঘ) সম্পূর্ণ শূন্য
উত্তর: গ) সদসদ্-বিলক্ষণ অনির্বচনীয়
১০০. শঙ্করের মতে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হলে কী হয়?
ক) মায়ার কার্যকারিতা থাকে
খ) মায়া অন্তর্হিত হয়
গ) জগত আরও বাস্তব হয়
ঘ) অজ্ঞান বৃদ্ধি পায়
উত্তর: খ) মায়া অন্তর্হিত হয়
